
বাংলাদেশ ক্রিকেটে ভারতের অবদানবাংলাদেশ নামক দেশটির আজকের অকৃতজ্ঞতা দেখলে মায়া হয়! পাকিস্তানের সঙ্গে বন্ধুত্ব করতে গিয়ে অতীতের সবকিছু কীভাবে ভুলে গিয়েছে, তার আরও এক নজির হল বাংলাদেশ ক্রিকেট। T20 বিশ্বকাপে ভারতের মাটিতে ম্যাচ খেলতে চাইছে না বাংলাদেশ। প্রথমে অজুহাত দিল, প্লেয়ার, দর্শক ও সাংবাদিকদের নিরাপত্তার স্বার্থে। এখন বলছে, অপমানিত বোধ করছে, তাই খেলবে না। বাংলাদেশের ক্রীড়া মন্ত্রকের উপদেষ্টা আসিফ নজরুল মুস্তাফিজুর রহমানের প্রসঙ্গ টেনে বলছেন, 'BCCI নিজেরাই বলছে, আমাদের প্লেয়ারদের নিরাপত্তার দায়িত্ব নেবেন না, যে কারণে একজন প্লেয়ারকে টিম থেকেই সরিয়ে দিল।' মোদ্দা বিষয়, পাকিস্তানের মতোই বাংলাদেশও চাইছে, ভারতের সঙ্গে একেবারে শত্রুতা করতে। পাকিস্তানের মার খেয়ে ১৯৭১ সালে স্বাধীনতা পাওয়া বাংলাদেশ, এখন পাকিস্তানকে 'দোস্ত' বানিয়েছে।
ত্রাতার ভূমিকায় অবতীর্ণ হলেন জগমোহন ডালমিয়া
বাংলাদেশের এহেন দম্ভকে চূর্ণ করতে একটু অতীতে ফেরা যাক। ১৯৯৯ সালে ক্রিকেট বিশ্বকাপ তখন সদ্য খেলেছে বাংলাদেশ। কিন্তু ক্রিকেট বিশ্বের কুলীন সমাজে ঠাঁই হয়নি। কুলীন সমাজ বলতে, টেস্ট ম্যাচ। টেস্ট খেলার যোগ্যতা তখনও অর্জন করতে পারেনি বাংলাদেশ। ত্রাতার ভূমিকায় অবতীর্ণ হলেন তত্কালীন ICC চেয়ারম্যান ও প্রাক্তন বিসিসিআই প্রেসিডেন্ট জগমোহন ডালমিয়া। তিনি সিদ্ধান্ত নিলেন, টেস্ট ক্রিকেটে ১০তম দেশ হিসেবে বাংলাদেশও খেলবে। ICC-তে ভোট হল। ডালমিয়া মরিয়া চেষ্টা করলেন, যাতে বাংলাদেশ টেস্ট ক্রিকেট খেলা দেশের তালিকায় চলে আসে।
কোনও দলই বাংলাদেশের বিরুদ্ধে টেস্ট খেলতে রাজি হচ্ছিল না
এবার গোল বাঁধল, প্রথম টেস্ট কোন টিমের সঙ্গে খেলবে বাংলাদেশ, সেই নিয়ে। কারণ কোনও দলই বাংলাদেশের বিরুদ্ধে টেস্ট খেলতে রাজি হচ্ছিল না। সেখানেও ত্রাতা ভারত। ২০০০ সালের ১০ নভেম্বর। ভারতের বিরুদ্ধে প্রথম টেস্ট ম্যাচ খেলতে নামল বাংলাদেশ। তখন বাংলাদেশ টিমের ক্যাপ্টেন ছিলেন নইমুর রহমান। এদিকে ভারতের অধিনায়ক সৌরভ গঙ্গোপাধ্যায়। দুই বাঙালির লড়াই। ৯ উইকেটে ভারতের কাছে ৯ উইকেটে হেরেছিল। বাংলাদেশের আনিমুল ইসলাম প্রথম বাংলাদেশি ক্রিকেটার হিসেবে টেস্টে শতরান করেছিলেন। ৩৮০ বলে ১৪৫ রানের ইনিংস।

বাংলাদেশের ক্রিকেটারদের সেদিন চোখে জল এসে গিয়েছিল
বাংলাদেশ ক্রিকেট বোর্ড তখন বলেছিল, ভারতে কাছে তারা ঋণী হয়ে থাকল। বাংলাদেশের ক্রিকেটারদের সেদিন চোখে জল এসে গিয়েছিল। বাংলাদেশের সংবাদমাধ্যম ডেইলি স্টার-কে দেওয়া এক সাক্ষাত্কারে নইমুল ইসলাম স্মরণ করেছিলেন সেই দিন। বলেন, 'আমার এখনও মনে আছে, যেদিন আমরা টেস্ট স্টেটাস পেলাম। দুপুর ১১টা বা ১২টার দিকে, আমি লর্ডসের মিটিং রুমের বাইরে দাঁড়িয়ে আছি। মহম্মদ আসরাফুল ভাই কাঁদছে। চোখ মুছতে মুছতে আমাকে জড়িয়ে ধরল। বলল, বুলবুল, আমরা ভোটে জিতে গেছি রে। টেস্ট খেলতে পারব। আমরা পেরেছি।'

ভারতের সঙ্গে প্রথম টেস্ট খেলার পরে ১৫টি টেস্ট সিরিজ হারে বাংলাদেশ। ৩১টির মধ্যে ২৮টি টেস্ট ম্যাচে হার। ৫ বছর পর প্রথম সিরিজ জয় পেল বাংলাদেশ। ২০০৫ সালে জিম্বাবোয়ের বিরুদ্ধে দুই ম্যাচের টেস্ট সিরিজ জিতে যায় বাংলাদেশ। এর পর আরও ৪ বছরের অপেক্ষা। ওয়েস্ট ইন্ডিজকে হারিয়ে টেস্ট সিরিজ জেতে বাংলাদেশ। ওটাই ছিল বিদেশের মাটিতে বাংলাদেশের প্রথম টেস্ট সিরিজ জয়।
২০১৫ সালে প্রয়াত হন জগমোহন ডালমিয়া। তখনও তিনি ছিলেন বিসিসিআই-এর অন্তর্বর্তীকালীন প্রেসিডেন্ট। ডালমিয়ার প্রয়াণের পরে BCB-র তত্কালীন মিডিয়া ম্যানেজার রাবিদ ইমাম বলেছিলেন, 'বাংলাদেশ ক্রিকেটের সঙ্গে ডালমিয়ার সম্পর্ক শুধুমাত্র কাজের মধ্যেই সীমাবদ্ধ ছিল না। ডালমিয়া সর্বদা বাংলাদেশ ক্রিকেটের উন্নতি চাইতেন। ডালমিয়া চেয়েছিলেন, বাংলাদেশের প্রথম টেস্ট ম্যাচ ভারতের সঙ্গে ইডেনে হোক। যখই বাংলাদেশ ইডেনে ম্যাচ খেলবে, ডালমিয়ার অবদান মনে পড়বে।'
বর্তমানে মনে পড়ছে বাংলাদেশ? নাকি পাকিস্তানের বন্ধুত্বে মশগুল হয়ে সব ভুলে গেলেন? মুক্তিযুদ্ধ থেকেই শুরু করা যাক!