
বুমরার কোচ কিশোর ত্রিবেদী ইংল্য়ান্ডের বিরুদ্ধে সেমিফাইনালে ২৫৩ রান করেও জেতার ব্যাপারে নিশ্চিত ছিল না টিম ইন্ডিয়া। এক সময় তো মনে হচ্ছিল সাফল্য ছিনিয়ে নেবে ইংরেজবাহিনী। ফাইনালে খেলবে তারাই। তবে সেই আশায় জল ঢেলে দেন জসপ্রীত বুমরা।
ডেথ ওভারে সূর্য ভরসা দেখান বুমরার উপর। ক্যাপ্টেনের কাছ থেকে বল হাতে নিয়েই কামাল দেখান তিনি। প্রমাণ করে দেন, কেন তিনি বিশ্বের সেরা বোলার। নিজের শেষ দুই ওভারে মাত্র ১৪ রান দেন। অন্য সব বোলার মার খেলেও বুমরা কিন্তু ব্যাটারদের খুলে খেলার সুযোগই দেননি। নিখুঁত লাইন-লেন্থে বল করে ইংল্যান্ডের রানের গতি থামিয়ে দেন তিনি। শেষ পর্যন্ত ভারত ম্যাচটি ৭ রানে জিতে ফাইনালে জায়গা পাকা করে নেয় গৌতম গম্ভীরের টিম।
সেমিফাইনালে 'প্লেয়ার অফ দ্য ম্যাচ' সঞ্জু স্যামসনকে করা হলেও তিনি তো বলেই দেন, 'ম্য়াচের সেরা আসলে বুমরা। কারণ, ও না থাকলে এই ম্যাচ জেতা যেত না। সে এই প্রজন্মের সেরা বোলার।'
এই প্রথমবার নয়, প্রতিবার বড় ম্যাচে বুমরা কার্যত ভারতের সারথি হয়ে দাঁড়ান। ম্য়াচের রাশ নিজের হাতে নিয়ে নেন। দলকে জেতান। তবে এই বুমরার উত্থান কিন্তু সহজে, একদিনে হয়নি। আহমেদবাদের ছোট্ট মাঠ থেকে উঠে এসেছেন তিনি। আজকের স্টার বুমরার জীবনযাপন ছিল অত্যন্ত সহজ-সরল। আর পাঁচজন সাধারণ মধ্যবিত্ত পরিবারের সন্তানের মতোই।
আহমেদাবাদের ছোটো মাঠে খেলা শুরু
গুজরাতের আহমেদাবাদের SPIPA কর্পোরেট রোডের কাছের ছোটো ক্রিকেট মাঠ। বড় কোনও অ্যাকাডেমি বা ঝাঁ চকচকে পরিকাঠামো নেই সেখানে। এই মাঠে ৭৯ বছরের কোচ কিশোর ত্রিবেদী কোচিং দেন এখনও। তাঁর হাতেই তৈরি বুমরা। কিশোরের ছেলে সিদ্ধার্থ আইপিএলে রাজস্থানের রয়্যালসের হয়ে খেলেছেন। তবে কিশোরের সেরা আবিস্কার আজকের ক্রিকেট জগতের বেতাজ বাদশা বুমরা।
বুমরার তখন বয়স ১৬। তখনই ত্রিবেদীর সঙ্গে তাঁর প্রথম পরিচয়। আহমেদাবাদের নির্মল হাই স্কুলের পড়ুয়া বুমরার বলের গতি ছোটো থেকেই ভালো ছিল। কিন্তু তার বোলিং অ্যাকশন ছিল একেবারেই অস্বাভাবিক। অনেকেই সেটি বদলানোর পরামর্শ দিয়েছিলেন। কিন্তু ত্রিবেদী সেই পথ মাড়াননি। তিনি বুমরাকে একইভাবে বল করে যেতে বলেন।
কয়েকদিন নেটে খুঁটিয়ে কিশোর বুঝতে পারেন, বুমরার হাতে থাকা ‘হাইপারএক্সটেনশন’ বলকে আলাদা কোণ থেকে ছাড়তে সাহায্য করে। ফলে ব্যাটারদের পক্ষে বলের লাইন বোঝা কঠিন হয়ে যায়। তিনি বলেছিলেন, 'এই অ্যাকশনেই কোনও সমস্যা নেই, এটিকে বদলানোর প্রয়োজন নেই। পরবর্তীতে সেটাই বুমরাহর সবচেয়ে বড় শক্তি হয়ে ওঠে।'

শৃঙ্খলাপরায়ণ করেছিলেন বুমরাকে
তবে তখন বুমরা ক্রিকেটে সম্পূর্ণভাবে মনোযোগী ছিলেন না। কখনও অনুশীলনে আসতেন, আবার কয়েকদিন উধাও হয়ে যেতেন। বন্ধুদের সঙ্গে সময় কাটাতেই বেশি পছন্দ করতেন। তখন কোচ ত্রিবেদী কঠোর মনোভাব দেখিয়েছিলেন তাঁর প্রতি। তিনি এই নিয়ে বুমরার মায়ের সঙ্গে আলাদাভাবে কথা বলেছিলেন।
এরপরই বদলে যায় বুমরার রুটিন। অনুশীলনে অনুপস্থিত থাকলে পরদিন পুরো সময় তাঁকে নেটের পিছনে দাঁড় করিয়ে রাখতেন কিশোর। এভাবে বুমরাও ধীরে ধীরে বুঝতে পারেন নিয়মিত পরিশ্রম ছাড়া বড় ক্রিকেটার হওয়া সম্ভব নয়।
শুধু গতি নয়, কৌশলও
ত্রিবেদী খুব দ্রুত বুঝেছিলেন, বুমরার সাফল্য শুধু গতির উপর নির্ভরশীল করিয়ে রাখলে চলবে না। তাই তিনি তাঁকে ইয়র্কার, বাউন্সার, কাটারসহ বিভিন্ন ধরনের ডেলিভারি শেখান। সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ ছিল ব্যাটারের মন পড়ে বল করার কৌশল।
ইংল্যান্ডের বিরুদ্ধে সেমিফাইনালেও তার প্রমাণ মিলেছে। বুমরা প্রথম বলেই ইংল্যান্ড অধিনায়ক হ্যারি ব্রুককতে আউট করেন। দ্রুতগতির বলের বদলে কাটার করে তিনি ব্রুককে ভুল শট খেলতে বাধ্য করেন।
ছোট একাডেমি থেকে বিশ্বসেরা
ত্রিবেদীর তত্ত্বাবধানে বুমরা গুজরাতের হয়ে সৈয়দ মুজতবা আলি ট্রফি খেলেন। সেখানেই তাঁর দিকে নজর যায় মুম্বই ইন্ডিয়ান্সের স্কাউট ও প্রাক্তন ভারতীয় কোচ জন রাইটের। এরপর আইপিএল এবং ভারতীয় দলে তাঁর পথ খুলে যায়।
আজ বুমরা বিশ্বের অন্যতম ভয়ঙ্কর পেসার। ম্যাচ শেষে ইংল্যান্ড অধিনায়ক হ্যারি ব্রুকও বলেন, 'এই মুহূর্তে বুমরাহ সম্ভবত বিশ্বের সেরা বোলার।'
কোচের ছোট্ট ইচ্ছে
কোচ কিশোর ত্রিবেদী এখনও প্রতিদিন মাঠে এসে তরুণ পেসারদের প্রশিক্ষণ দেন। বুমরার সাফল্যে তিনি গর্বিত। তবে তাঁর একটি ছোট ইচ্ছে আছে। তিনি বলেন, 'ইচ্ছে করে, বুমরা যদি মাঝে মাঝে এখানে এসে ছেলেদের সঙ্গে একটু সময় কাটাত।'