
ফাইনালে মুখোমুখি হবেন মেসি ও ইয়ামাল এ যেন এক চিত্রনাট্য। ছোটো ইয়ামাল বসে আছে বাথটবে। আর তাকে স্নান করাচ্ছেন মেসি। ২০০৭ সালের ডিসেম্বরের সেই ঘটনা এখন ভাইরাল। অথচ তাঁরা এখন প্রতিপক্ষ। সেদিন দুই তারকার কেউ বুঝতে পারেননি, ২০২৬ সালের বিশ্বকাপ ফাইনালে প্রতিপক্ষ হিসেবে মুখোমুখি হতে চলেছেন।
যে ছবিটি সামনে এসেছে সেখানে দেখা যাচ্ছে, ২০ বছরের লাজুক মেসি একটি নীল প্লাস্টিকের বাথটাবে শুয়ে থাকা পাঁচ মাসের ইয়ামালের দিকে তাকিয়ে আছেন। তাকে কীভাবে কোলে নিতে হবে,সেটিও জানতেন না তিনি। অপরদিকে সেই শিশুও জানতেন না, যে তার হাত ধরে আছে সে একদিন ফুটবলের সংজ্ঞা বদলে দেবেন।
সেই ফটোশুটটি করেছিলেন আলোকচিত্রী জোয়ান মনফোর্ত। স্পেনের Diario Sport এবং UNICEF-এর একটি চ্যারিটি ক্যালেন্ডারের জন্য এই ছবি তোলা হয়েছিল। বার্সেলোনার রোকাফোন্ডা থেকে লটারিতে জিতে ওই শিশুর পরিবার শুটে অংশ নেওয়ার সুযোগ পেয়েছিল। তখন কেউ কল্পনাও করতে পারেনি, এই সাধারণ মুহূর্ত একদিন ফুটবল ইতিহাসের অন্যতম প্রতীকী ছবিতে পরিণত হবে।
১৯ বছর পরে...
আজ সেই শিশুই স্পেনের তারকা লামিন ইয়ামাল। আর ২০২৬ বিশ্বকাপের ফাইনালে নিউ জার্সির মেটলাইফ স্টেডিয়ামে তিনি মাঠে নামবেন মেসির আর্জেন্টিনার বিপক্ষে।
বিশ্ব ক্রীড়া ইতিহাসে এমন কাকতালীয় ঘটনা খুব কমই দেখা যায়। ইয়ামালের বাবা যখন বহু বছর পরে সেই পুরনো ছবিটি প্রকাশ্যে আনেন, তখন সেটি সোশ্যাল মিডিয়ায় একটি মজার তথ্য হিসেবেই ছড়িয়ে পড়েছিল। কিন্তু এখন, বিশ্বকাপ ফাইনালের আগে, সেই ছবিটিই যেন এক ঐতিহাসিক ভূমিকা—এক প্রজন্ম থেকে আরেক প্রজন্মের হাতে মশাল তুলে দেওয়ার প্রতীক।
একদিকে আছেন ফুটবল ইতিহাসের অন্যতম সেরা খেলোয়াড় মেসি। কাতার বিশ্বকাপ জয়ের পরও তিনি থামেননি। ২০২৬ বিশ্বকাপেও নিজের জাদু দেখিয়ে চলেছেন। ইংল্যান্ডের বিরুদ্ধে সেমিফাইনালে তাঁর দুটি অসাধারণ অ্যাসিস্ট আর্জেন্টিনাকে ফাইনালে তুলেছে। এই বিশ্বকাপে ইতিমধ্যেই তাঁর ঝুলিতে রয়েছে ৮টি গোল।

অন্যদিকে রয়েছেন মাত্র ১৮ বছরের লামিন ইয়ামাল, যিনি অল্প বয়সেই ফুটবল বিশ্বকে মুগ্ধ করেছেন। ফ্রান্সের বিরুদ্ধে সেমিফাইনালে তাঁর আগ্রাসী প্রেসিং থেকেই স্পেন প্রথম পেনাল্টি আদায় করে এবং ২-০ ব্যবধানে জিতে ফাইনালে ওঠে। বড় টুর্নামেন্টে স্পেনের হয়ে তাঁর ১২টি ম্যাচের প্রতিটিতেই জয় এসেছে।
একই ফুটবল পাঠশালা
এই লড়াইকে আরও বিশেষ করে তুলেছে একটি বিষয়—মেসি ও ইয়ামাল দু'জনেই বার্সেলোনার বিখ্যাত লা মাসিয়া অ্যাকাডেমির ছাত্র। সেখানেই মেসির ফুটবল প্রতিভা বিকশিত হয়েছিল, আর বহু বছর পরে একই জায়গায় গড়ে উঠেছেন ইয়ামাল। ফলে এটি শুধু আর্জেন্টিনা বনাম স্পেন নয়, বার্সেলোনার ফুটবল দর্শনেরও এক মহারণ।
অনেকেই এই ম্যাচকে দেখছেন ‘গুরু বনাম উত্তরসূরি’-র লড়াই হিসেবে। স্প্যানিশ সংবাদমাধ্যমে এমনও মজা করে বলা হচ্ছে, UNICEF-এর সেই ফটোশুটের সময় বাথটাবে থাকা শিশুর গায়ে হাত দিয়েই নাকি মেসি নিজের প্রতিভার আশীর্বাদ দিয়ে গিয়েছিলেন!
তবে রোম্যান্টিকতার আড়ালে রয়েছে আরও বড় বাস্তবতা। ফুটবল খুব কম ক্ষেত্রেই এমন নিখুঁত প্রজন্মের সংঘর্ষের সুযোগ দেয়। পেলে কখনও মারাদোনার বিরুদ্ধে খেলেননি, মারাদোনাও প্রতিযোগিতামূলক বড় মঞ্চে মেসির মুখোমুখি হননি। কিন্তু এবার ফুটবলের এক যুগের শেষ আলো আর নতুন যুগের সূর্যোদয় একই মাঠে, একই ট্রফির জন্য লড়াই করবে।
ইয়ামালের কাছে এই ম্যাচ কুড়ি বছর পূর্ণ হওয়ার আগেই অমরত্ব পাওয়ার সুযোগ। আর মেসির কাছে এটি তাঁর ফুটবল সাম্রাজ্যের শেষ বড় রক্ষা-কবচ।
ম্যাচ শুরু হলে অবশ্য আবেগের জায়গা থাকবে না। কৌশল, চাপ আর জয়ের লড়াই সবকিছুকে ছাপিয়ে যাবে। কিন্তু ফল যাই হোক, গল্পটা ইতিমধ্যেই ইতিহাস হয়ে গেছে।