কলকাতা হাইকোর্টের আইনজীবী দ্বারকানাথ চট্টোপাধ্যায় চিরদিনের মতো বেঁকে গিয়েছে পিঠ। অকেজো মেরুদণ্ড। কুঁজো হয়ে হাঁটা ছাড়া উপায় নেই। এহেন শারীরিক প্রতিবন্ধকতা সত্ত্বেও মনের জোর এক চিলতে কমেনি আইনজীবী দ্বারকানাথ চট্টোপাধ্যায়ের। যন্ত্রণাদায়ক ও বিরল মেরুদণ্ডের রোগ নিয়ে কলকাতা হাইকোর্টে বছরের পর বছর ধরে আইনচর্চা করে চলেছেন তিনি। রাজ্যের শীর্ষ আদালতে যাঁদের নিয়মিত যাতায়াত, তাঁরা কোনও না কোনও সময়ে দেখেছেন ন্যুব্জ হয়ে সিঁড়ি ভেঙে ওঠা এই আইনজীবীকে। আচমকাই তিনি ভাইরাল হয়েছেন সোশ্যাল মিডিয়ায়।
স্টোরিটেলার আরাধনা চট্টোপাধ্যায় সম্প্রতি ইনস্টাগ্রামে একটি ভিডিও শেয়ার করেছিলেন। সেই ভিডিওর মাধ্যমেই নেটিজেনরা পরিচিত হন দ্বারকানাথ চট্টোপাধ্যায়ের সঙ্গে। কলকাতা হাইকোর্ট চত্বরে শুট করা সেই ভিডিওতে দেখা গিয়েছে, প্রবীণ এই আইনজীবীর পিঠ সম্পূর্ণ কুঁজো হয়ে গিয়েছেন। কেবলমাত্র মনর জোরেই তিনি হেঁটে চলেছেন। শরীর নুইয়ে পড়লেও মন চাঙ্গা। নিঁখুত ভাবে পরেছেন আইনজীবীর কালো পোশাক। শারীরিক দুর্বলতা আর মানসিক দৃঢ়তার এই তীব্র বৈপরীত্যই আরাধনা তাঁর ভিডিওতে গল্প আকারে তুলে ধরেন।
দ্বারকানাথ চট্টোপাধ্যায় গত ২৭ বছর ধরে কলকাতা হাইকোর্টে আইনজীবী হিসেবে প্র্যাকটিস করছেন। আদালতের বাইরেও তিনি একাধিক খ্যাতনামা আইন জার্নালের যুগ্ম সম্পাদক এবং বেশ কয়েকটি আইন বিষয়ক বইয়ের সহ-লেখক। তবে গত এক দশক ধরে তাঁর জীবন গভীরভাবে প্রভাবিত হয়েছে অ্যানকাইলোজিং স্পন্ডিলাইটিস নামক এক বিরল দীর্ঘস্থায়ী রোগে। এর ফলে তাঁর মেরুদণ্ডে তীব্র যন্ত্রণা ও ক্রমশ শক্ত হয়ে যাওয়ার সমস্যা দেখা দিয়েছে। এর জেরে তাঁর পিঠে স্পষ্ট কুঁজ তৈরি হয়েছে এবং সারাক্ষণই ব্যথা সঙ্গী।
২০১৬ সালে তাঁর একটি বড় অস্ত্রোপচার হয়। আজও তাঁকে প্রতিদিন ১০টির বেশি ওষুধ খেতে হয়। আয়ের একটি বড় অঁশই চলে যায় চিকিৎসার খরচে।
তবুও ব্যথা পুরোপুরি কমে না, সামান্য নড়াচড়াও তাঁর জন্য কষ্টকর। কিন্তু এসবের মাঝেও প্রতিদিন একা ভিড়ঠাসা সরকারি বাসে চেপে তিনি আদালতে পৌঁছন। নিজের শারীরিক অবস্থাকে জীবনের উদ্দেশ্য ঠিক করে দিতে দেন না।
ভিডিওতে আরাধনা জানান, দ্বারকানাথ চট্টোপাধ্যায়ের লড়াই শুধু একটি দুরারোগ্য রোগের বিরুদ্ধে নয়, তিনি অন্যায় ও দুর্নীতির বিরুদ্ধেও সরব হয়েছেন, সংগ্রাম করেছেন। আবেগাপ্লুত আরাধনা বলেন. 'এই দৃঢ় সংকল্প নিয়েই দ্বারকানাথ চট্টোপাধ্যায় প্রতিদিন আদালতে হাজির হন।' তিনি ভিডিওর ক্যাপশনে লেখেন, 'কখনও কখনও শক্তির অর্থ হল, হাল না ছাড়া, হার না মানা।'
২০২৫ সালের ডিসেম্বর মাসে পোস্ট হওয়া এই ভিডিওটি দ্রুত ভাইরাল হয়ে যায় এবং সারা দেশের মানুষের হৃদয় ছুঁয়ে ফেলে। অনেকেই মন্তব্য করেন, কলকাতা হাইকোর্ট চত্বরে এই আইনজীবীকে দেখেছেন। কেউ কেউ তাঁর সঙ্গে কথা বলার সুযোগ হয়েছে বলেও আপ্লুত বোধ করেন। অনেকেই জানিয়েছেন, দ্বারকানাথের অধ্যাবসায়ে তাঁরা অনুপ্রাণিত হয়েছেন। বহু মানুষ জানতে চেয়েছেন, কীভাবে সাহায্য করা যেতে পারে দ্বারকানাথকে।
দর্শকদের চাহিদাতেই আরাধনা আরও একটি ভিডিও করেন। যেখানে অচেনা মানুষের দেওয়া প্রায় ২৫ হাজার টাকা অনুগান সংগ্রহের কথা ডানান। দ্বারকানাথ চট্টোপাধ্যায়ের ওষুধ ও চিকিৎসার খরচের জন্য এই টাকা ব্যবহার করা হবে। কেউ কেউ আবার অস্ত্রোপচারের পরামর্শ দিলেও আরাধনা জানান, ঝুঁকি অত্যন্ত বেশি হওয়ায় দ্বারকানাথ সে পথে হাঁটেননি।
দ্বিতীয় এই ভিডিওতে ছিল কৃতজ্ঞতার বার্তা। সোশ্যাল মিডিয়া কনটেন্ট ক্রিয়েটর এবং আইনজীবী, দু'জনেই নেটিজেনদের ধন্যবাদ জানান। যত্ন ও মানবিকতার স্পর্শে সোশ্যাল মিডিয়ার মাধ্যমে কেমন চমৎকার হতে পারে, তা যেন চোখে আঙুল দিয়ে দেখিয়ে দিল ভাইরাল হওয়া এই ভিডিও।
নেটিজেনদের একের পর এক মন্তব্যে দ্বারকানাথ চট্টোপাধ্যায়ের অদম্য ইচ্ছাশক্তির তারিফ এই ভাইরাল ভিডিওকে আর শুধু একটি কাহিনির মধ্যে সীমাবদ্ধ রাখেনি। এই ভিডিও হয়ে উঠেছে অধ্যাবসায়, দৃঢ় সংকল্প, মর্যাদা এবং কখনও হার না মানার একটি জীবন্ত উদাহরণ।