scorecardresearch
 

রাজ্যে কিংবা দেশে বিচ্ছিন্নতাবাদী আন্দোলন নতুন নয়-জেনে নেওয়া যাক ইতিহাস

২০২১ বিধানসভা নির্বাচনে পশ্চিমবঙ্গে বিপুল ব্যবধানে জিতেছে তৃণমূল। তবে গতির বিপরীতে হেঁটে উত্তরবঙ্গে বিজেপি ভাল ফল করেছে। এর পিছনে রাজবংশী ভোট অন্যতম ফ্যাক্টর হয়েছে কি না, তা নিয়ে শুরু হয়েছে চুলচেরা বিশ্লেষণ। তবে এরপরই রাজ্যের সঙ্গে উত্তরবঙ্গের মতের মিল নেই বলে নতুন করে বিচ্ছিন্নতাবাদী আন্দোলন মাথাচাড়া দিচ্ছে। একদল বিষয়টিকে উসকে দিয়ে অশান্তি ছড়ানোর চেষ্টা করছে।

ভারতীয় পতাকা ভারতীয় পতাকা
হাইলাইটস
  • নতুন করে আন্দোলনে ইন্ধন বিচ্ছিন্নতাবাদীদের
  • এর আগেও হয়েছে একাধিক আন্দোলন
  • সব দাবি মানলে রাজ্যের সংখ্যা হবে প্রায় ৫০

২০২১ বিধানসভা নির্বাচনে পশ্চিমবঙ্গে বিপুল ব্যবধানে জিতেছে তৃণমূল। তবে গতির বিপরীতে হেঁটে উত্তরবঙ্গে বিজেপি ভাল ফল করেছে। এর পিছনে রাজবংশী ভোট অন্যতম ফ্যাক্টর হয়েছে কি না, তা নিয়ে শুরু হয়েছে চুলচেরা বিশ্লেষণ। তবে এরপরই রাজ্যের সঙ্গে উত্তরবঙ্গের মতের মিল নেই বলে নতুন করে বিচ্ছিন্নতাবাদী আন্দোলন মাথাচাড়া দিচ্ছে। একদল বিষয়টিকে উসকে দিয়ে অশান্তি ছড়ানোর চেষ্টা করছে। উত্তরবঙ্গে গ্রেটার কোচবিহার, কামতাপুর ও গোর্খাল্যান্ডের দাবির মতো আন্দোলন আগে থেকেই রয়েছে। এই ইন্ধনে নতুন করে তাতে আগুন লাগার আশঙ্কা করছেন অনেকে।

এর আগে কোন কোন দাবিতে উত্তাল হয়েছে রাজ্য তা দেখে নেওয়া যাক

কামতাপুর রাজ্যের দাবি

১৯৬৯ থেকে পৃথক কামতাপুর রাজ্যের দাবিতে আন্দোলন শুরু হয়েছে। ১৯৯৬ সালে কামতাপুর পিপলস পার্টি তৈরি হয়। ২০০৪ সালে তা ভেঙে তৈরি হয় প্রোগ্রেসিভ পার্টি। এই দুটি দল মালদহ থেকে অসম সীমানা অবধি কামতাপুর রাজ্যের জন্য আন্দোলন করছে। তবে অসমের অল কোচ রাজবংশি স্টুডেন্ট অ্যাসোসিয়েশন নাম্নি অসম থেকে মালদহ পর্যন্ত এলাকা প্রস্তাবিত কামতাপুর রাজ্যের মধ্যে রাখার দাবি তুলেছে।

গোর্খাল্যান্ডের দাবি

দার্জিলিংয়ের জন্য পৃথক প্রশাসনিক অঞ্চলের দাবি ১৯০৭ সাল থেকে। যখন নিন্টো-মর্লি সংস্কার কমিটির কাছে দার্জিলিংয়ের পাহাড়ি মানুষের অ্যাসোসিয়েশন পৃথক প্রশাসনিক ব্যবস্থার জন্য স্মারকলিপি প্রদান করে। ১৯১৭ সালে পাহাড়ি জনগোষ্ঠী অ্যাসোসিয়েশন গভর্নর অভ বেঙ্গল, দ্যা সেক্রেটারি অভ স্টেট অভ ইন্ডিয়া এবং ভাইসরয়ের কাছে দার্জিলিং জেলা ও সংলগ্ন জলপাইগুড়ি জেলাকে নিয়ে পৃথক প্রশাসনিক ইউনিট গঠনের জন্য স্মারকলিপি পেশ করে। ১৯২৯ সালে সাইমন কমিশনের কাছে পাহাড়ি মানুষ পূনরায় একই দাবি পেশ করে। ১৯৩০ সালে পাহাড়ি মানুষের অ্য়াসোসিয়েশন, গোর্খা অফিসার্স এসোসিয়েশন এবং কার্শিয়ং গোর্খা লাইব্রেরি যৌথভাবে স্টেট অব ইন্ডিয়ার সেক্রেটারি স্যামুয়েল হোয়ারের কাছে বাংলা থেকে পৃথক করার পিটিশন জমা দেয়। ১৯৪১ সালে রূপ নারায়ন সিনহার নেতৃত্বে হিলম্যানস এসোসিয়েশন স্টেট অভ ইন্ডিয়ার সেক্রেটারি লর্ড পেথিক লরেন্সের প্রতি বাংলা প্রদেশ থেকে দার্জিলিংকে পৃথক করে প্রধান কমিশনারের রাজ্য হিসেবে তৈরী করার আহবান জানান।১৯৪৭ সালে অবিভক্ত ভারতের কমিউনিস্ট পার্টি (সিপিআই) সাংবিধানিক কমিটির কাছে দার্জিলিং জেলা, সিকিম ও নেপালের সমন্বয়ে গোর্খাস্থান গঠনের দাবিতে একটি স্মারকলিপি পেশ করে যার কপি দেওয়া হয় অন্তর্বর্তীকালীন সরকারের উপ-রাষ্ট্রপতি জওহরলাল নেহেরু এবং অর্থ মন্ত্রী লিয়াকত আলি খানকে।স্বাধীন ভারতে এই অঞ্চলে অখিল ভারতীয় গোর্খা লিগ প্রথম রাজনৈতিক দল হিসেবে আত্মপ্রকাশ করে যারা এই সম্প্রদায়ের অর্থনৈতিক স্বাধীনতা এবং নৃতাত্ত্বিক পরিচয়ের দাবিকে সমর্থন করে। ১৯৫২ সালে এন.বি. গুরুং এর নেতৃত্বে দলটি ভারতের তৎকালীন প্রধানমন্ত্রী জওহরলাল নেহেরুর সাথে কালিম্পংয়ে সাক্ষাৎ করে এবং বাংলা থেকে পৃথক হওয়ার দাবী জানায়। ১৯৮০ সালে ইন্দ্র বাহাদুর রাইয়ের নেতৃত্বে দার্জিলিংয়ের প্রান্ত পরিষদ তৎকালীন ভারতের প্রধানমন্ত্রী ইন্দিরা গান্ধীকে দার্জিলিংয়ে নতুন রাজ্য প্রতিষ্ঠার প্রয়োজনীয়তা লিখে পাঠায়।১৯৮৬ সালে গোর্খাল্যান্ডের জন্য পৃথক রাষ্ট্র প্রতিষ্ঠার দাবীতে সুভাষ ঘিসিং এর নেতৃত্বে গোর্খা ন্যাশনাল লিবারেশন ফ্রন্ট সহিংস আন্দোলন শুরু করেছিল। যার ফলে ১৯৮৮ সালে দার্জিলিং জেলার নির্দিষ্ট এলাকা শাসনের জন্য দার্জিলিং গোর্খা হিল কাউন্সিল নামে একটি আধা স্বায়ত্বশাসিত প্রতিষ্ঠান গঠন করা হয়। তবে ২০০৭ সালে একটি নতুন দল গোর্খা জনমুক্তি মোর্চা পুনরায় গোর্খাল্যান্ডের জন্য পৃথক রাষ্ট্রের দাবি উত্থাপন করে। ২০১১ সালে জিজেএম রাজ্য ও কেন্দ্রীয় সরকারের সংগে একটি চুক্তিতে স্বাক্ষর করে যার অধীনে হিল কাউন্সিলের পরিবর্তে গোর্খাল্যান্ড আঞ্চলিক প্রশাসন নামে একটি আধাস্বায়ত্বশাসিত প্রতিষ্ঠান গঠিত হবে।

দেশের অন্যান্য় এলাকায় পৃথক রাজ্যের দাবি

এ ছাড়াও গোটা দেশ বিভিন্ন সময় একাধিক আন্দোলনের আগুনে পুড়েছে। পৃথক কার্বিল্যান্ডের দাবিতে জ্বলেছে কার্বি আংলংও। এই মুহূর্তে কুড়িটিরও বেশি নতুন রাজ্য গঠনের আবেদন জমা রয়েছে কেন্দ্রীয় স্বরাষ্ট্র মন্ত্রকের কাছে। এক কর্তা জানান, বিগত কয়েক বছর ধরে বিভিন্ন সংগঠনের তরফে ওই আবেদনগুলি জমা পড়েছে। যার মধ্যে রয়েছে পশ্চিম ভারতে মহারাষ্ট্র ভেঙে বিদর্ভ, গুজরাত ভেঙে সৌরাষ্ট্রের মতো রাজ্য গড়ার দাবি। পূর্ব ভারতে পশ্চিমবঙ্গ থেকে নতুন তিনটি রাজ্য গঠনের দাবির সঙ্গে রয়েছে বিহার-ঝাড়খণ্ডের এলাকা নিয়ে মিথিলাঞ্চল, বিহার-উত্তরপ্রদেশ-ছত্তীসগঢ়ের এলাকা নিয়ে ভোজপুর, ওড়িশা-ঝাড়খণ্ড-ছত্তিসগড়ের এলাকা নিয়ে কোশল রাজ্য গড়ার দাবি। উত্তর-পূর্বে বড়োল্যান্ড, কার্বিল্যান্ড, পূর্ব নাগাল্যান্ড, কুকিল্যান্ডের মতো বেশ কিছু রাজ্যের দাবি রয়েছে। অজস্র ছোট ছোট রাজ্যের দাবি দক্ষিণ ভারতেও। তামিলনাড়ু-কেরল-কর্নাটকের এলাকা নিয়ে কঙ্গুনাড়ু, কর্নাটক-কেরলের এলাকা নিয়ে তুলুনাড়ু, কর্নাটক ভেঙে আলাদা কুর্গ রাজ্যের দাবি তার অন্যতম। উত্তরপ্রদেশ-মধ্যপ্রদেশ-রাজস্থানের এলাকা নিয়ে ব্রজপ্রদেশ গঠনের দাবি রয়েছে। এ প্রসঙ্গে উল্লেখ্য, মায়াবতীর জমানায় একমাত্র উত্তরপ্রদেশ সরকারই নিজে থেকে রাজ্য ভাগ করার (চার ভাগে) প্রস্তাব দিয়েছিল। এছাড়া পঞ্জাবে খলিস্তানের দাবিতে একসময় দেশ উত্তাল হয়েছিল। তেলেঙ্গানা বাদ দিয়ে এখন রয়েছে ২৮টি রাজ্য। সরকারি সূত্র অনুযায়ী, সব ক’টি নতুন রাজ্যের দাবি বা প্রস্তাব মানা হলে রাজ্যের সংখ্যা দাঁড়াবে অন্তত ৫০।