
নেপালে চারদিকে শুধু লাশ পড়ে রয়েছে। এই প্রতিবেদন যখন লেখা হচ্ছে, তখন ৪৬৯ জনের দেহ উদ্ধার হয়েছে। প্রায় ১৬০০ জন এখনও নিখোঁজ। ফলে মৃতের সংখ্যা আরও বাড়তে পারে বলেই আশঙ্কা।

নেপালের হড়পা বানে বিশ্বের ৩০টি দেশের নাগরিক নিখোঁজ। ভারত, আমেরিকা, ব্রিটেন, কানাডা, ইউক্রেন, অস্ট্রেলিয়া সহ বহু দেশ। কয়েকশো মানুষকে হেলিকপ্টারে উদ্ধার করা গিয়েছে। কিন্তু কত যে এখনও নিখোঁজ, তার কোনও নির্দিষ্ট সংখ্যা সরকারও বলতে পারছে না। শুধু ভারতেরই প্রায় ৩০০ নাগরিকের কোনও খোঁজ মিলছে না। যোগাযোগও করা যাচ্ছে না।

এ হেন বিপদের মধ্যেই আরও একটি ভয়াবহ বান আসার সতর্কতা জারি করা হয়েছে নেপালে। বর্তমানে নেপালের যা অবস্থা, তাতে আরও একটি বান এলে দেশটির কোনও অস্তিত্বই থাকবে না।

আজ অর্থাত্ শুক্রবার সকাল ৭টা পর্যন্ত সে দেশে ৪৬৯ জনের মৃত্যু হয়েছে বলে জানিয়েছে নেপাল পুলিশ। হড়পা বানে নেপালের মতো ক্ষতিগ্রস্ত হয়েছে সীমান্তের ও পারে থাকা চিনের তিব্বতও। দুই দেশ মিলিয়ে এখনও পর্যন্ত ১৪৭০ জনের কোনও খোঁজ মেলেনি। নিখোঁজদের মধ্যে ৫১৭ জন বিভিন্ন দেশের নাগরিক।

নেপাল-তিব্বত সীমান্তের কাছে হিমবাহ ধসে বরফ ও পাথরের ধস নামার পরই ভয়াবহ বন্যার সৃষ্টি হয়। সেই বন্যার জলের সঙ্গে কাদা ও ধ্বংসাবশেষ মিশে মধ্য নেপালের বিস্তীর্ণ এলাকায় হু হু করে নেমে আসে। শহর ও গ্রামগুলির উপর দিয়ে বয়ে যায় সেই স্রোত। ভেসে যায় ঘরবাড়ি, গাড়ি, রাস্তা ও সেতু।

রাসুয়া ও নুওয়াকোটের একাধিক জনপদ কার্যত কাদা ও ধ্বংসস্তূপের নিচে চাপা পড়ে যায়। অন্যদিকে, ভোটকোশি নদী ব্যবস্থার মাধ্যমে বন্যার জল নীচের দিকে এগিয়ে যাওয়ায় একাধিক জলবিদ্যুৎ প্রকল্পও ক্ষতিগ্রস্ত হয়েছে।

নেপালের প্রধানমন্ত্রী বালেন শাহের সঙ্গে ফোনে কথা বলেছেন ভারতের প্রধানমন্ত্রী নরেন্দ্র মোদী। মোদী আশ্বস্ত করেছেন, ভারত সব রকমের সহযোগিতার জন্য প্রস্তুত। নেপালে এখনও পর্যন্ত ৮৪ জন ভারতীয় নাগরিককে জীবিত অবস্থায় উদ্ধার করা গিয়েছে।

কেন্দ্রীয় মন্ত্রী শিবরাজ সিং চৌহান বলেছেন, ভারত নেপালকে সম্ভাব্য সব ধরনের সাহায্য করবে এবং প্রধানমন্ত্রী নরেন্দ্র মোদী স্বয়ং নেপালের নেতৃত্বের সঙ্গে কথা বলেছেন ও কর্মকর্তাদের ত্রাণ সামগ্রী পাঠানোর নির্দেশ দিয়েছেন। মার্কিন যুক্তরাষ্ট্র নেপালে ক্ষতিগ্রস্তদের জন্য পাঁচ লক্ষ ডলারের একটি সহায়তা প্যাকেজ ঘোষণা করেছে। এই দুর্ঘটনায় প্রায় ৩৩ জন ব্রিটিশ নাগরিক নিখোঁজ হওয়ায় ব্রিটেন ৫০ লক্ষ পাউন্ড অনুদান এবং জরুরি ত্রাণ দল পাঠানোর ঘোষণা দিয়েছে। শ্রীলঙ্কাও ১০ লক্ষ মার্কিন ডলার আর্থিক সহায়তা দেওয়ার প্রতিশ্রুতি দিয়েছে।

গত বুধবার নেপাল-চিন সীমান্তের কাছে লাংটাং লিরুং পর্বতমালার একটি হিমবাহের বিশাল অংশ হঠাৎ ভেঙে পড়ে, যার ফলে পর্বতটিতে ফাটল ধরে এবং বিপুল পরিমাণ বরফ, পাথর ও ধ্বংসাবশেষ নিচের উপত্যকায় নেমে আসে।

ধ্বংসাবশেষ প্রথমে লেন্দে নদীতে পড়ে এর প্রবাহ সাময়িকভাবে থামিয়ে দেয়। তবে এই সাময়িক প্রতিবন্ধকতা ভেঙে যেতেই জল ও ধ্বংসাবশেষের এক বিশাল বন্যা ভটেকোশী ও ত্রিশূলী নদী প্রণালী দিয়ে বয়ে গিয়ে মধ্য নেপালের বহু অঞ্চলে ব্যাপক ধ্বংসযজ্ঞ চালায়।

তদন্তের পর ইউএস জিওলজিক্যাল সার্ভে (ইউএসজিএস) নির্ধারণ করেছে, প্রাথমিকভাবে যেটিকে ৪.৪ মাত্রার ভূমিকম্প বলে মনে করা হয়েছিল, সেটি আসলে কোনও ভূমিকম্প ছিল না, বরং এটি ছিল একটি হিমবাহের ভাঙন এবং ভূমিধসের অভিঘাত। বিজ্ঞানীরা বলছেন, শুধু হিমবাহটিই নয়, বরং পাহাড়ের নিচের শিলার একটি অংশও ভেঙে পড়ে এমন ব্যাপক ধ্বংসযজ্ঞ ঘটায়।

কানাডার ক্যালগারি বিশ্ববিদ্যালয়ের ভূতত্ত্ববিদ ড্যান শুগার বলছেন, স্যাটেলাইট চিত্রগুলি দেখার পর এটি স্পষ্ট, পাহাড়ের একটি বিশাল শিলাখণ্ড হিমবাহের সঙ্গে মিলে উপত্যকাটিকে ধ্বংস করেছে। বিজ্ঞানীরা আরও জানাচ্ছেন, এই ঘটনাকে সরাসরি জলবায়ু পরিবর্তনের সঙ্গে যুক্ত করাটা তড়িঘড়ি হবে, কিন্তু আবহাওয়া উষ্ণ হওয়ার কারণে পাহাড়ের পারমাফ্রস্ট স্তর দুর্বল হয়ে পড়ছে, যা ভবিষ্যতে এই ধরনের আরও ঘটনার কারণ হতে পারে।

নেপালের দুর্যোগ ব্যবস্থাপনা সংস্থার মতে, শুধু নেপালেই ৯১০ জন নিখোঁজ রয়েছেন। এদের মধ্যে রয়েছেন ১১৩ জন নেপালি পর্যটক, ৮৫ জন সেনা ও পুলিশ সদস্য এবং রাসুয়া জেলার ১৬১ জন স্থানীয় বাসিন্দা। অন্যদিকে, চিনের রাষ্ট্রীয় গণমাধ্যমের খবরে বলা হয়েছে, তিব্বত অঞ্চলে ৫৫৮ জন নিখোঁজ রয়েছেন, যাদের মধ্যে ২৬০ জন বিদেশি নাগরিক।

ভারতের বিদেশমন্ত্রকের তথ্য অনুযায়ী, প্রায় ৩০০ ভারতীয় নাগরিক এখনও নিখোঁজ রয়েছেন। এদের মধ্যে ৭৩ জন একটি জলবিদ্যুৎ প্রকল্পে কর্মরত ছিলেন এবং আরও অনেকে কৈলাস মানস সরোবর যাত্রায় ছিলেন। মার্কিন বিদেশ দফতর জানিয়েছে, তাদের ৯০ জন নাগরিক নিখোঁজ রয়েছেন, যদিও কোনও মার্কিন নাগরিকের মৃত্যুর খবর নিশ্চিত করা হয়নি এবং তিনজনকে উদ্ধার করা হয়েছে।

মালয়েশিয়ার ৫১ জন, ইউক্রেনের ৫৫ জন, অস্ট্রেলিয়ার ৩৯ জন এবং ব্রিটেনের ৩৩ জন নাগরিক নিখোঁজ হয়েছেন বলে জানা গেছে। এছাড়াও, কানাডার ২৫ জন, দক্ষিণ কোরিয়ার ৯ জন, সিঙ্গাপুর ও জার্মানির ৮ জন করে, রাশিয়ার ৮ জন, দক্ষিণ আফ্রিকা ও লাটভিয়ার ৬ জন করে, জাপান ও নিউজিল্যান্ডের ৫ জন করে, ফ্রান্সের ৪ জন এবং বেলজিয়াম ও স্পেনের ৩ জন করে নাগরিকও নিখোঁজ রয়েছেন।

এই তালিকায় ইতালি, কাজাখস্তান, পর্তুগাল, আয়ারল্যান্ড এবং নেদারল্যান্ডসের দুজন করে নাগরিকও রয়েছেন, অন্যদিকে বেলারুশ, ফিনল্যান্ড, হাঙ্গেরি, ইজরায়েল, লিথুয়ানিয়া, ফিলিপিন্স, বুলগেরিয়া, সুইজারল্যান্ড, সার্বিয়া এবং সুইডেনের একজন করে নাগরিক নিখোঁজ বলে জানা গেছে।

এই ধ্বংসযজ্ঞ একটি নতুন উদ্বেগেরও জন্ম দিয়েছে। ভোটেকোশি নদীর উজানে, চোচেন খোলা ও পুরপেউ সাংপো নদীর সঙ্গমস্থলে আবর্জনা জমে একটি নতুন হ্রদ তৈরি হয়েছে। চিনা কর্মকর্তাদের মতে, বৃহস্পতিবার সকাল নাগাদ হ্রদটিতে প্রায় ২০ লক্ষ ঘনমিটার জল জমেছে এবং আগামী তিন দিনে আরও ৩০ লক্ষ ঘনমিটার জল আসতে পারে।

এই প্রাকৃতিক বাঁধটি ভেঙে গেলে ভাটির এলাকাগুলিতে আরেকটি বড় বন্যা হতে পারে। নেপালের জলবিজ্ঞান বিভাগ জনগণকে নদীর তীর থেকে দূরে এবং নিরাপদ স্থানে সরে যেতে আহ্বান জানিয়েছে।

এই বিপর্যয়ে নেপালের পর্যটন শিল্পের বিরাট ক্ষতি। পর্যটন ব্যবসায়ীরা জানাচ্ছেন, গতবার Gen Z আন্দোলনের জেরে পর্যটকের হার কম ছিল। এবারে হড়পা বানে সব তছনছ হয়ে গেল।

ভারতে উত্সবের মরসুম শুরু হচ্ছে। বহু মানুষের গন্তব্য থাকে নেপাল। কিন্তু পরিস্থিতি যা, তাতে একের পর এক বুকিং বাতিলের হিড়িক চলছে।