
ইরান, ইজরায়েল ও আমেরিকার যুদ্ধ কি শেষ হয়ে গেল? এই প্রশ্ন ঘিরে এখন বিস্তর ধোঁয়াশা। কারণ, পরিস্থিতি যেদিকে যাচ্ছে, তাতে এখনই হ্যাঁ, বা না, উত্তর দেওয়ার মতো সময় আসেনি। কারণ, যখন রাশিয়ার প্রেসিডেন্ট ভ্লাদিমির পুতিনের সঙ্গে ১ ঘণ্টা ধরে ফোনে কথা বললেন ট্রাম্প, এবং ফ্লোরিডায় প্রেস কনফারেন্সে ধোঁয়াশাপূর্ণ উত্তর দিচ্ছেন, তখন যুদ্ধের ইতি নিয়ে সংশয় থেকেই যাচ্ছে। ট্রাম্প বললেন, যুদ্ধ প্রায় শেষ হয়েই এসেছে। আবার পরক্ষণেই বললেন, এখনও পুরোপুরি শেষ হয়নি।

ট্রাম্পের এহেন খামখেয়ালি মন্তব্যে ইরান পাল্টা সোজাসুজি দাবি করল, যুদ্ধ কবে থামবে, তা ইরান ঠিক করবে। আমেরিকা নয়। এই প্রতিবেদন যখন লেখা হচ্ছে, তখনই খবর এল, ট্রাম্প প্রশাসন নির্দেশ দিয়েছে, মধ্যপ্রাচ্যের দেশগুলিতে নিযুক্ত মার্কিন রাষ্ট্রদূত ও কূটনৈতিক কর্মীদের ফিরে আসতে হবে। সৌদি আরবেও মার্কিন দূতাবাস কর্মীদের একই নির্দেশ দেওয়া হয় সোমবার। যার নির্যাস, যুদ্ধ আরও ভয়াবহ আকার নিতে চলেছে বলেই মনে করা হচ্ছে।

শনিবারই ইরানের রাষ্ট্রপতি জানিয়েছিলেন, তেহরান আর মধ্যপ্রাচ্যের দেশগুলিতে হামলা চালাবে না। কিন্তু পরিস্থিতি ঘুরে গেল একদিনের মধ্যেই। ইরানের সর্বোচ্চ নেতার পদে বসেছেন খামেনেই পুত্র মোজতাবা খামেনেই। জানা যাচ্ছে, ইনি খামেনেইয়ের থেকেও বেশি দাপুটে শাসক ও চরম আমেরিকা বিরোধী।

ইরানের সরকারি সংবাদমাধ্যমের খবর অনুযায়ী, ইসলামিক রেভোলিউশনারি গার্ডের মুখপাত্র ট্রাম্পের মন্তব্যকে 'ননসেন্স' আখ্যা দিয়েছে। একই সঙ্গে হুঁশিয়ারি দিয়েছে, যদি আমেরিকা ও ইজরায়েল হামলা বন্ধ না করে, তাহলে তারা এক লিটার তেলও রফতানি করবে না কোনও দেশে।

IRGC-র বক্তব্য, 'হয় সবাই তেল পাবে। না হলে কেউ তেল পাবে না।' অর্থাত্ হরমুজ বন্দর বন্ধ রাখার পথেই অনড় ইরান। ট্রাম্প এর আগে হুমকি দিয়েছিলেন, হরমুজ দিয়ে তেল রফতানি যদি বন্ধ রেখে দেয় ইরান, তাহলে ২০ গুন বেশি হামলা চালানো হবে। ট্রাম্পের ব্যক্তিগত সোশ্যাল মিডিয়া The Truth-এ ট্রাম্প লিখেছিলেন, 'আমার আশা ও প্রার্থনা, আরও মৃত্যু, ধ্বংস যাতে না হয়।'

মার্কিন প্রেসিডেন্ট সোমবার জানিয়েছেন, ইরানে মার্কিন সেনাবাহিনীর সামরিক অভিযান নির্ধারিত সময়ের চেয়েও অনেক দ্রুত এগিয়ে চলছে এবং ইতিমধ্যেই এটি সফল অভিযান হিসেবে ধরা যেতে পারে।

তবে সামরিক অভিযান এখনও চলবে। ট্রাম্পের দাবি, মার্কিন বাহিনী ইতিমধ্যেই ইরানের ড্রোন তৈরির ঘাঁটি লক্ষ্য করে হামলা শুরু করেছে। এই হামলার ফলে ইরান থেকে ড্রোন ছোড়ার সংখ্যা ৮৩ শতাংশ পর্যন্ত কমে গিয়েছে।

এদিকে মার্কিন যুক্তরাষ্ট্র ও ইজরায়েলের যৌথ হামলায় ইরানের জ্বালানি পরিকাঠামোর বড় ক্ষতি হয়েছে। ইরানের দাবি, শনিবার গভীর রাতে তেহরান এবং পাশের আলবুর্জ প্রদেশে অন্তত পাঁচটি তেল ডিপোতে হামলা হয়। এতে বড় আগুন লাগে এবং ঘন ধোঁয়া রবিবার পর্যন্ত রাজধানীর আকাশ ঢেকে রাখে।

ধোঁয়ার কারণে তেহরানে দৃশ্যমানতা কমে যায়। শহরের বিভিন্ন জায়গায় বিস্ফোরণের শব্দও শুনতে পাওয়ার কথা জানান স্থানীয় বাসিন্দারা, যদিও কর্তৃপক্ষ তাৎক্ষণিকভাবে সব জায়গার অবস্থান নিশ্চিত করতে পারেনি। প্রশাসন জানিয়েছে, জ্বলন্ত তেল ডিপো থেকে নির্গত দূষণ শহরে ছড়িয়ে পড়েছে।

ইরানে ইতিমধ্যেই অ্যাসিড বৃষ্টির সতর্কতাও জারি করা হয়েছে। বলা হয়েছে, আগুন থেকে নির্গত বিষাক্ত রাসায়নিক পদার্থ বৃষ্টির সঙ্গে মিশে বিপজ্জনক অ্যাসিড বৃষ্টি তৈরি করতে পারে। পরিবেশ দফতর নাগরিকদের অপ্রয়োজনে বাইরে না বেরোনোর এবং প্রয়োজনীয় সতর্কতা নেওয়ার পরামর্শ দিয়েছে। হামলার ফলে তেহরানের কিছু সময়ের জন্য জ্বালানি সরবরাহ ব্যাহত। তবে প্রশাসনের দাবি, দুই থেকে তিন দিনের মধ্যেই স্বাভাবিক সরবরাহ ফের শুরু হতে পারে।

ইরানের পক্ষ থেকে জানানো হয়েছে, দীর্ঘমেয়াদি যুদ্ধের জন্য তারা প্রস্তুত। IRGC–র এক মুখপাত্র বলেছেন, ইরানের কাছে বিপুল পরিমাণ ব্যালিস্টিক ও ক্রুজ ক্ষেপণাস্ত্র, ড্রোন এবং আক্রমণকারী নৌযান মজুত রয়েছে।

প্রয়োজন হলে অন্তত ৬ মাস ধরে উচ্চ মাত্রার যুদ্ধ চালিয়ে যাওয়ার ক্ষমতা তাদের আছে। তিনি আরও জানান, আগামী কয়েক দিনের মধ্যেই ইরান নতুন কৌশল ব্যবহার করবে এবং আরও দূরপাল্লার উন্নত ক্ষেপণাস্ত্র মোতায়েন করতে পারে।