
স্বাধীনতার পর থেকে পশ্চিমবঙ্গের রাজনীতির ওপর দিয়ে অনেক জলই বয়ে গিয়েছে। কংগ্রেস থেকে বামেদের পালাবদল। এরপর তৎকালীন বিরোধী দলনেত্রী মমতা বন্দ্যোপাধ্যায়ের নেতৃত্বে তৃণমূলের উত্থান। ২০১১ সালে বামেদের ৩৪ বছর শাসনের লাল দুর্গ গুঁড়িয়ে বাংলার ক্ষমতা দখল নিয়ে মুখ্যমন্ত্রীর আসনে আসীন হন মমতা বন্দ্যোপাধ্যায়।

১৯৪৭ সালে স্বাধীনতার পর থেকে ১৯৭৭ সাল পর্যন্ত বাংলায় কংগ্রেসের একচ্ছত্র শাসন ছিল। যার মধ্যে ড. বিধানচন্দ্র রায়, প্রফুল্ল চন্দ্র সেন, অজয় মুখোপাধ্যায় এবং সিদ্ধার্থ শঙ্কর রায়ের মতো মুখ্যমন্ত্রীরা ছিলেন। ১৯৭৭ সালে জরুরি অবস্থার পর বামেদের কাছে ক্ষমতা হারায় কংগ্রেস। এরপর তারা বিরোধী দলে পরিণত হয়। পরবর্তীতে তৃণমূল কংগ্রেসের উত্থানে কংগ্রেসের প্রভাব ক্রমশ ম্লান হতে থাকে। স্বাধীনতার পর থেকে বাংলার মসনদে কবে, কার দখলে ছিল? দেখুন তালিকা।

পশ্চিমবঙ্গের প্রথম মুখ্যমন্ত্রী ছিলেন ভারতীয় জাতীয় কংগ্রেসের ডঃ প্রফুল্লচন্দ্র ঘোষ। তিনি ১৯৪৭ সালের ১৫ অগাস্ট স্বাধীন ভারতের পশ্চিমবঙ্গের প্রথম মুখ্যমন্ত্রী হিসেবে দায়িত্ব গ্রহণ করেন। ১৯৪৭ সালের অগাস্ট থেকে ১৯৪৮ সালের জানুয়ারি পর্যন্ত এই পদে ছিলেন। পরবর্তীতে ডঃ বিধানচন্দ্র রায় পশ্চিমবঙ্গের দ্বিতীয় মুখ্যমন্ত্রী হন। তিনি দীর্ঘ সময় মুখ্যমন্ত্রী হিসেবে দায়িত্ব পালন করেন। ১৯৪৮ থেকে জানুয়ারির ১৯৫০, এরপর ১৯৫০-১৯৫২ মার্চ, ১৯৫২-১৯৫৭, ১৯৫৭-১৯৬২ সালের জুলাই পর্যন্ত তাঁর শাসনামল ছিল।

এরপর ৪ বছর, ২৩৪ দিনের জন্য ক্ষমতায় আসেন ভারতীয় জাতীয় কংগ্রেসের প্রফুল্লচন্দ্র সেন। ১৯৬২ সাল থেকে ১৯৬৭ সাল পর্যন্ত তাঁর শাসনকাল চলেছে।

বিধানচন্দ্র রায়ের নেতৃত্বে বাংলায় ব্যাপক শিল্পায়ন ঘটে। সেই সঙ্গে দুর্গাপুর ও কল্যাণীকে ঢেলে সাজানো হয় নগর রূপে। তিনি উদ্বাস্তু পুনর্বাসনের মতো বড় চ্যালেঞ্জগুলিও মোকাবিলা করেন। তবে এই সময়কালে কংগ্রেসের অভ্যন্তরে বিভাজন তৈরি হয়। এরপর বাংলা কংগ্রেসের উত্থান হয়। গঠিত হয় যুক্তফ্রন্ট সরকার। কংগ্রেসের শাসনের জন্য বড় ধাক্কা হয়ে ওঠে বাংলা কংগ্রেস (যুক্তফ্রন্ট)।

এরপর ২৬৫ দিনের জন্য অজয়কুমার মুখোপাধ্যায় ক্ষমতায় আসেন। তিনি ছিলেন বাংলা কংগ্রেস (যুক্তফ্রন্ট)-র নেতা। তিনি ছিলেন ভারতীয় বাঙালি স্বাধীনতা সংগ্রামী তথা পশ্চিমবঙ্গের চতুর্থ মুখ্যমন্ত্রী। ১৯৬৩ সালে প্রথম বিধানসভা সদস্য ও সেচমন্ত্রী হন তিনি। মন্ত্রীত্ব ত্যাগ করে কংগ্রেস সংগঠন গড়ে তোলার কাজ করেন। ১৯৬৪ সালে প্রদেশ কংগ্রেস সভাপতি হন। জাতীয় কংগ্রেসের সঙ্গে যুক্ত থাকলেও পরে কংগ্রেস ত্যাগ করে বাংলা কংগ্রেস গঠন করেন নলিনাক্ষ সান্যাল এর সঙ্গে এবং সিপিআই(এম)-এর সহযোগিতায় দু'বার যুক্তফ্রন্ট সরকার পরিচালনা করেন। ১৫ মার্চ ১৯৬৭ থেকে ২ নভেম্বর ১৯৬৭ ও ২৫ ফেব্রুয়ারি ১৯৬৯ থেকে ১৯ মার্চ ১৯৭০ পর্যন্ত তিনি যুক্তফ্রন্টের মুখ্যমন্ত্রী পদে আসীন ছিলেন।

এর মধ্যবর্তী সময়ে প্রফুল্লচন্দ্র ঘোষ নির্দল (প্রগতিশীল গণতান্ত্রিক ফ্রন্ট) থেকে ৯০ দিনের জন্য মুখ্যমন্ত্রীর আসন পান। এরপর বাংলায় রাষ্ট্রপতি শাসন জারি হয়। এক বছরের একটু বেশি সময় বাংলায় রাষ্ট্রপতি শাসন ছিল। ১৯৭১ সালে এরপর ফের অজয়কুমার মুখোপাধ্যায় ৮৭ দিনের জন্য মুখ্যমন্ত্রীর আসনে আসীন হন। এরপর ফের ২৬৫ দিনের জন্য রাষ্ট্রপতি শাসন জারি করা হয়।

শুরু হয় সিদ্ধার্থ শঙ্কর রায়ের আমলে (১৯৭২-১৯৭৭)। ব্যাপক জনসমর্থন নিয়ে ক্ষমতায় ফিরলেও, এই সময়ে রাজ্যে চরম রাজনৈতিক হিংসা (নকশাল আন্দোলন দমন) এবং পরে জরুরি অবস্থা জারি করা হয়, যা ১৯৭৭ সালের পরাজয়ের মূল কারণ ছিল। ১৯৭৭ সালের পর কংগ্রেস আর ক্ষমতায় আসতে পারেনি। ১৯৯৮ সালে মমতা বন্দ্যোপাধ্যায় কংগ্রেস ত্যাগ করে তৃণমূল কংগ্রেস গঠন করেন। একসময়ের শাসক দলের আজ বাংলায় অস্তিত্ব টিকিয়ে রাখাই চ্যালেঞ্জিং হয়ে দাঁড়িয়েছে।

এরপরই শুরু হয় বামেদের লাল দুর্গ গঠন। পশ্চিমবঙ্গে সিপিআই(এম) নেতৃত্বাধীন বামফ্রন্ট ১৯৭৭ থেকে ২০১১ সাল পর্যন্ত টানা ৩৪ বছর শাসন করে। জ্যোতি বসু হন বামেদের প্রথম মুখ্যমন্ত্রী। এখনও পর্যন্ত বিশ্বে গণতান্ত্রিকভাবে নির্বাচিত দীর্ঘতম কমিউনিস্ট সরকার ছিল সিপিআই (এম)। জ্যোতি বসু (১৯৭৭-২০০০) এবং বুদ্ধদেব ভট্টাচার্য (২০০০-২০১১) ছিলেন তৎকালীন সময়ের মুখ্যমন্ত্রী।

জ্যোতি বসু টানা ৫ বার এবং বুদ্ধদেব ভট্টাচার্য ২ বার মুখ্যমন্ত্রী হন। বামেদের এই দীর্ঘ শাসনকাল পশ্চিমবঙ্গের রাজনৈতিক ও সামাজিক ইতিহাসে এক যুগান্তকারী অধ্যায়। গ্রামীণ ক্ষমতায়নের জন্য ব্যাপক উত্থান হলেও, পরে শিল্পায়ন ও প্রশাসনিক ব্যর্থতার অভিযোগে ক্ষমতা হারাতে হয় বামেদের। সিঙ্গুর ও নন্দীগ্রাম এবং কৃষিজমি অধিগ্রহণ ঘিরে বিতর্কের জেরে ২০১১ সালে ক্ষমতার পতন হয়।

রাজ্যে পালাবদল ঘটিয়ে বামফ্রন্ট শাসনের অবসান ঘটিয়ে মুখ্যমন্ত্রী হন মমতা বন্দ্যোপাধ্যায়। ২০১১, ২০১৬, এবং ২০২১ সালের পশ্চিমবঙ্গ বিধানসভা নির্বাচনে জয়লাভ করে মমতা বন্দ্যোপাধ্যায় মুখ্যমন্ত্রী হিসেবে দায়িত্ব পালন করছেন। বর্তমানে কংগ্রেস ও সিপিআই (এম) দলটি ভোটের লড়াইয়ে কার্যত নিশ্চিহ্ন হয়ে গেছে। বিরোধী দল হিসেবে উঠে এসেছে বিজেপি।