বাংলার ভোটের আগেই হুমকি হিন্দু সংগঠনেরকুবুল আহমেদ: পশ্চিমবঙ্গে বিধানসভা নির্বাচনের মধ্যেই বাবরি মসজিদ তৈরি ঘিরে মুর্শিদাবাদে হাওয়া গরম রয়েছে। বিশেষজ্ঞরা বলছেন, বাংলায় যেভাবে ধর্মীয় মেরুকরণ ঘটেছে তাতে মুর্শিদাবাদে কোন দল কেমন ফলাফল করে, তা দেখার মতো বিষয়। কারণ একসময় কংগ্রেসের গড় হিসেবে পরিচিত মুর্শিদাবাদে ফাটল ধরিয়েছে তৃণমূল কংগ্রেস। কিন্তু এবারে দল থেকে বহিষ্কৃত তৃণমূল কংগ্রেস বিধায়ক হুমায়ুন কবীর নিজের দল গড়ে ভোটে লড়ছেন। তিনি 'কিং মেকার' হিসেবে নিজেকে প্রতিষ্ঠা করতে বদ্ধপরিকর। আর তার এই দল ঘোষণা বা 'কিং মেকার' হওয়ার পিছনে বড় সহায়ক হতে পারে মুর্শিদাবাদের বাবরি মসজিদ তৈরি। দল ঘোষণার আগেই মুর্শিদাবাদের মাটিতে পুনরায় একটি বাবরি মসজিদ তৈরির ঘোষণা করে ভিত্তিপ্রস্তর স্থাপন করেছেন বহিষ্কৃত বিধায়ক।
আর এই বাবরি মসজিদ নিয়েই শোরগোল রয়েছে গোটা দেশে। এবার লখনউ থেকে সরাসরি বাবরি মসজিদ ভেঙে ফেলার হুমকি দেওয়া হয়েছে। হিন্দু সংগঠনগুলি ইতিমধ্যেই প্রতিবাদ করে জানিয়েছে,তারা কোনও পরিস্থিতিতেই মসজিদটি নির্মাণ করতে দেবে না।
লখনউয়ের রাস্তায় চোখে পড়ছে বেশ কয়েকটি পোস্টার। সেই পোস্টারে ১০ ফেব্রুয়ারি বাংলার 'মুর্শিদাবাদ চলো'র ডাক দেওয়া হয়েছে। পোস্টারে লেখা রয়েছে, 'হুমায়ুন, আমরা আসব', 'বাবরি আবার ভেঙে ফেলা হবে', 'মুর্শিদাবাদ চলো'র মতো শ্লোগান।
উল্লেখ্য বিষয় হল, বিশ্ব হিন্দু রক্ষা পরিষদের তরফে লখনউতে এই বিলবোর্ড বসানো হয়েছে। লখনউয়ের ১০৯০ স্কোয়ার, আম্বেদকর স্কোয়ার, হযরতগঞ্জ স্কোয়ার এবং শহরের একাধিক জায়গায় হিন্দুদের মুর্শিদাবাদে পদযাত্রা করার আহ্বান জানিয়ে হোর্ডিং লাগানো হয়েছে।
বিশেষ বিষয় হল, এই পোস্টারেই মমতা বন্দ্য়োপাধ্যায়ের ছবিও ব্যবহার করা হয়েছে। যা একাধিক প্রশ্ন তুলতে শুরু করেছে। তবে কি বাংলায় ধর্মীয় মেরুকরণ বা তোষণ রাজনীতির জন্য মমতা বন্দ্য়োপাধ্যায়কেই দায়ী করছে এই হিন্দু সংগঠন?
মুর্শিদাবাদে ভোটাররা কি বিভক্ত হতে চলেছে?
বিশেষজ্ঞদের একাংশ মনে করছে, যদি ধর্মীয় ভিত্তিতে মুর্শিদাবাদের জনগণ ভোট দিতে শুরু করে, তবে মমতা বন্দ্যোপাধ্যায়ের পক্ষে হিন্দু ও মুসলিম ভোটের মধ্যে রাজনৈতিক ভারসাম্য বজায় রাখা কঠিন হয়ে পড়বে। কারণ হুমায়ুন কবীর যে সংখ্যালঘু ভোট ব্যাঙ্ককে টার্গেট করছে তা আসলে দীর্ঘদিন ধরে তৃণমূলকেই ভোট দিয়ে আসছে। যদি কোনও কারণে সেই ভোট সরে যায় এবং উল্টোদিকে বিজেপি হিন্দুদের ভোট একত্রিত করতে পারে, তবে তা তৃণমূলের জন্য আশঙ্কার কারণ হতে পারে।
তবে শুধুমাত্র মুর্শিদাবাদ নয়, গোটা রাজ্যের ক্ষেত্রেও কিছুটা একই চিত্র। বাংলায় প্রায় ৩০ শতাংশ মুসলিম ভোটার রয়েছে, যারা রাজ্যের ২৯৪টি আসনের মধ্যে প্রায় ১০০টিতে নির্ণায়ক ভূমিকা পালন করে। ২০১০ সাল থেকে মুসলিম ভোটারদের তৃণমূল কংগ্রেসের মূল ভোটব্যাঙ্ক হিসেবে মনে করা হয়। মমতা বন্দ্যোপাধ্যায়ের টানা তিনটি জয়ে মুসলিম ভোটাররা গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা পালন করেছিলেন, কিন্তু বাবরি মসজিদ ইস্যু মুসলিম ভোটকে বিভক্ত করতে পারে। এরমধ্যে আবার মুর্শিদাবাদে বাবরি মসজিদ নির্মাণ বন্ধ করার জন্য হিন্দু সংগঠনগুলির হুমকি ধর্মীয় মেরুকরণের সম্ভাবনা জোরালো করতে পারে। হিন্দু ও মুসলিমদের মধ্যে বিভাজন আরও গভীর হতে পারে, যা সরাসরি তৃণমূলের ভোটে ব্যাঙ্কে ধাক্কা দিতে পারে।
অপর একটি উল্লেখযোগ্য বিষয় হল, গত বিধানসভা নির্বাচনে ৮৭ শতাংশ মুসলিম তৃণমূল কংগ্রেসকে ভোট দিয়েছিলেন। আর ৫৪ শতাংশ হিন্দু বিজেপিকে ভোট দিয়েছিলেন। ২০২৪ সালের লোকসভা নির্বাচনেও এই ধারা অব্যাহত ছিল। ফলে মমতা বন্দ্যোপাধ্যায় যে সংখ্যাগরিষ্ঠ মুসলিম ভোট পাচ্ছেন, তাতে কোনও সন্দেহ নেই। অন্যদিকে, বিজেপি এখন পর্যন্ত ৫০% এরও বেশি হিন্দু ভোট সংগ্রহে সফল হয়েছে। হিন্দুত্ববাদী রাজনীতির মাধ্যমে হিন্দু ভোট অর্জনের জন্য, বিজেপি বাংলাদেশে হিন্দুদের উপর আক্রমণ, অবৈধ অনুপ্রবেশ এবং রোহিঙ্গাদের মতো বিষয়গুলি উত্থাপন করে চলেছে। এবার বাবরি ইস্যুটিও সামনে আনা হয়েছে। ফলে বিশেষজ্ঞরা বলছেন, কোনও কারণে বাংলার ভোটে যদি ধর্মীয় মেরুকরণ ঘটে, তাহলে মমতা বন্দ্যোপাধ্যায়ের পক্ষে দুর্গ ধরে রাখা চ্যালেঞ্জিং হয়ে উঠতে পারে।