
অনন্ত মহারাজকে বঙ্গবিভূষণ সম্মান রাজ্য সরকারেরউত্তরবঙ্গে তৃণমূল কংগ্রেস ২০২৬ সালের বিধানসভা নির্বাচনেই বাজিমাত করবে? ২০১৯ সালের আগে থেকেই শাসকদলের মাথাব্যথার কারণ উত্তরবঙ্গ। দক্ষিণবঙ্গে তৃণমূল মজবুত সংগঠনে জয় পেলেও, উত্তরবঙ্গের মানুষ ভরসা রেখেছেন বিজেপি-তেই।
২০২১ সালের ভোটের আগে উত্তরবঙ্গের জেলাগুলিতে সভায় বারবার মমতা বন্দ্যোপাধ্যায়কে বলতে শোনা গিয়েছে, 'আপনারা গতবার আমাদের ভোট দেননি। এবারে দেবেন তো?' না। উত্তরবঙ্গ তারপরেও বিজেপি-র উপরেই আস্থা রেখেছে। ২০২১ সালে বিজেপি যে ৭৭টি আসন পেয়েছিল, তার মধ্যে সিংহভাগ অবদান ছিল উত্তরবঙ্গের। এমনকী ২০২৪ সালের লোকসভা নির্বাচনেও দেখা গেল, উত্তরবঙ্গের ৮টি লোকসভা কেন্দ্রের ৬টি পেল বিজেপি।
অনন্ত মহারাজকে বঙ্গবিভূষণ সম্মান
কিন্তু একাধিক আসনে জয়ের ব্যবধান বেশ কম। এখানেই বলা যেতে পারে খেলা ঘোরার শুরু। তৃণমূল কংগ্রেসের উত্তরবঙ্গ অভিযানে আশার আলো বলাই যায়। এহেন পরিস্থিতিতে এবার অনন্ত মহারাজকে বঙ্গবিভূষণ সম্মান দিল পশ্চিমবঙ্গ সরকার। সেই অনন্ত মহারাজ, যিনি পৃথক কামতাপুর রাজ্য বা গ্রেটার কোচবিহারের পক্ষে বারবার সওয়াল করেন। সেই অনন্ত মহারাজ, বঙ্গ সফরে যাঁর সঙ্গে আলাদা করে বৈঠক করেছিলেন খোদ কেন্দ্রীয় স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী অমিত শাহ। পরবর্তীকালে বিজেপি অনন্ত মহারাজকে রাজ্যসভার সাংসদ করে।

খেলা ঘুরতে শুরু করল চব্বিশের লোকসভা ভোটের পর
রাজনৈতিক প্রেক্ষাপট ঘুরতে শুরু করল ২০২৪ সালের লোকসভা ভোটের পর থেকে। নির্বাচনের পরেই জুন মাসে উত্তরবঙ্গে গেলেন মমতা বন্দ্যোপাধ্যায়। সেই সফরের ফাঁকেই অনন্ত মহারাজের প্রাসাদে গিয়েছিলেন তিনি। কিছু ক্ষণ কথা হয় তাঁদের মধ্যে। ওই সাক্ষাত্কে সেই সময় অনেকেই কোচবিহার জেলার রাজনীতিতে নতুন সমীকরণের ইঙ্গিত হিসাবে দেখতে শুরু করেছিলেন। অনেকে এও বলতে শুরু করেন, বিজেপি ছেড়ে তৃণমূলে যোগ দেবেন অনন্ত। তবে এখনও পর্যন্ত তা ঘটেনি।

তৃণমূল কংগ্রেসের কী লাভ হবে?
এবার মূল প্রশ্নে আসা যাক। অনন্ত মহারাজ যদি তৃণমূল কংগ্রেসে যোগ দেন, তাহলে কি কোচ-রাজবংশী ভোটব্যাঙ্ক তৃণমূলের দিকে যাবে? সর্বোপরি, অনন্ত মহারাজের সমর্থন পেলে তৃণমূলের কী লাভ হতে পারে?
পশ্চিমবঙ্গের উত্তরাংশে রাজবংশী ভোট বড় ফ্যাক্টর। উত্তরবঙ্গের প্রায় ৩২টি আসনে রাজবংশী সম্প্রদায়ের ভোটারদের বড় ভূমিকা রয়েছে। ২০ থেকে ৩০ শতাংশ ভোটব্যাঙ্ক। উত্তরবঙ্গের কোচবিহার, জলপাইগুড়ি, আলিপুরদুয়ার, উত্তর দিনাজপুর এবং দক্ষিণ দিনাজপুরের মতো জেলাগুলিতে রাজবংশী সম্প্রদায়ের মানুষের বসবাস বেশি। সবচেয়ে বেশি হল কোচবিহারে। এখানে ৫০ শতাংশের বেশি রাজবংশী ভোটার। অতএব রাজবংশী ভোটব্যাঙ্ক তৃণমূলের দিকে গেলে উত্তরবঙ্গেও বিজেপি-র ক্ষমতা খর্ব হয়ে যাবে।
রাজবংশী ভোট পেতে বিজেপি যেমন অনন্ত মহারাজকে রাজ্যসভায় পাঠিয়েছে, তেমনই মমতার সরকার 'রাজবংশী ভাষা অ্যাকাডেমি' এবং 'রাজবংশী ডেভেলপমেন্ট বোর্ড' গঠন করেছে। নবীনতম সংযোজন হল, অনন্ত মহারাজকে বঙ্গবিভূষণ সম্মান প্রদান।
বংশীবদন OUT অনন্ত IN?
রাজবংশী নেতা হিসেবে যে দুটি নাম বেশ উজ্জ্বল, তাঁরা হলেন, অনন্ত মহারাজ ও বংশীবদন বর্মন। বংশীবদন দীর্ঘদিনই তৃণমূল কংগ্রেসের ঘনিষ্ঠ। কিন্তু বংশীবদনকে দিয়ে রাজবংশী ভোট পাচ্ছে না তৃণমূল, এটা প্রমাণিত। এবার অনন্ত যদি তৃণমূলে যোগ দেন বা তৃণমূল কংগ্রেসকে সমর্থন করেন বিধানসভা ভোটে, তাহলে বিজেপির 'বাড়া ভাতে ছাই' হতে পারে। এখন দুটি বিষয় হল, অনন্ত মহারাজ গ্রেটার কোচবিহারের পক্ষে। রাজবংশী জনতার একটি বড় অংশের দীর্ঘদিনের দাবি, পৃথক রাজ্য। সে ক্ষেত্রে তৃণমূল কংগ্রেসের সঙ্গে অনন্ত মহারাজের রাজনৈতিক সমঝোতা কী হতে পারে? দ্বিতীয়ত, বংশীবদন বর্মন কি অনন্ত মহারাজের আগমনকে স্বাগত জানাবেন? কারণ ২০০৫ সালে যখন গ্রেটার কোচবিহার আন্দোলনে আগুন জ্বলেছিল, একাধিক মৃত্যু হয়েছিল, সেই আন্দোলনের নেতা ছিলেন বংশীবদন। পরে তাঁকে গ্রেফতার করা হলে অনন্ত মহারাজ বা নগেন্দ্র রায়ের উত্থান হয়। নিজেকে কোচবিহার রাজবংশের সন্তান দাবি করেন নগেন্দ্র রায়। হয়ে ওঠেন অনন্ত মহারাজ।