রাষ্ট্রপতির সঙ্গে ঠিক কী ঘটেছে উত্তরবঙ্গে?রাষ্ট্রপতি দ্রৌপদী মুর্মুর পশ্চিমবঙ্গ সফর ঘিরে দেশের রাজনীতিতে বড়সড় শোরগোল পড়েছে। অভিযোগ উঠেছে উত্তরবঙ্গে রাষ্ট্রপতির এই সফরে প্রোটোকল লঙ্ঘন করা হয়েছে। খোদ রাষ্ট্রপতি দ্রৌপদী মুর্মু জেলা প্রশাসনের বিরুদ্ধে অব্যবস্থাপনার অভিযোগ করেছেন। পাশাপাশি রাজ্যের বিরুদ্ধে প্রোটোকল লঙ্ঘনের বিষয়টি নিয়েও উষ্মা প্রকাশ করেছেন রাষ্ট্রপতি।
ঘটনা কী ঘটেছে?
রাষ্ট্রপতি হিসেবে প্রথমবারের জন্য ৭ মার্চ উত্তরবঙ্গ সফরে এসেছিলেন দ্রৌপদী মুর্মু। শনিবার বাগডোগরার গোসাইপুরে নবম আন্তর্জাতিক সাঁওতাল সম্মেলনে যোগও দেন রাষ্ট্রপতি। কিন্তু সেখানে অনুষ্ঠান আয়োজনে একাধিক গাফিলতি ছিল বলে অভিযোগ ওঠে। স্থানীয় সূত্র থেকে জানা যায়, গোঁসাইপুরের এয়ারপোর্ট অথরিটি অফ ইন্ডিয়ার যে মাঠে ওই সভার আয়োজন করা হয়েছিল তা সঠিক ভাবে পরিষ্কারও করা ছিল না। অভিযোগ উঠেছে, রাষ্ট্রপতির জন্য বরাদ্দ বাথরুমে পর্যাপ্ত জলের পর্যন্ত ব্যবস্থা ছিল না।
যদিও প্রথমে বাগডোগরার গোসাইপুরে এই অনুষ্ঠান হওয়ার কথাই ছিল না। বরং দার্জিলিং জেলার বিধাননগরেই প্রথম স্থান নির্ণয় করা হয়েছিল। পরবর্তীকালে শিলিগুড়ির বাগডোগরা এলাকার গোসাইপুরে এই অনুষ্ঠান সরানো হয়।
রাষ্ট্রপতি কী অভিযোগ করলেন?
রাষ্ট্রপতি দ্রৌপদী মুর্মু সরাসরি মুখ্যমন্ত্রীকে কড়া ভাষায় আক্রমণ করেননি। বরং তিনি যেন কিছুটা অনুযোগের সুরেই মমতা বন্দ্য়োপাধ্যায়কে বলেছেন, "আমিও বাংলার মেয়ে। আমাকে বাংলায় আসতেই দেওয়া হয় না। মমতাদি আমার ছোটবোন। জানি না, আমার উপর কী রাগ। যাই হোক...কোনও অভিযোগ নেই। কোনও ক্ষোভ নেই। উনি ভাল থাকুন, আপনারাও ভাল থাকুন।"
কিন্তু রাজ্য প্রশাসনের উদ্দেশে রীতিমতো ক্ষোভ প্রকাশ করেছেন দ্রৌপদী মুর্মু। গোঁসাইপুরের মাঠ থেকে বিধাননগরে এসে উষ্মা প্রকাশ করে রাষ্ট্রপতি বলেন, "বিধাননগরে এই আন্তর্জাতিক সাঁওতাল সম্মেলন অনায়াসেই করা যেত, কারণ এখানে যথেষ্ট জায়গা রয়েছে। কিন্তু নিরাপত্তার অজুহাত দেখিয়ে প্রশাসন প্রথমে এখানে অনুমতি দিতে চায়নি। এই কারণে উদ্যোক্তাদের চার-চারবার অনুষ্ঠানস্থল বদল করতে হয়েছে।"
প্রোটোকল বা শিষ্টাচার রক্ষা নিয়েও রাজ্য প্রশাসনের ওপর ক্ষোভ উগরে দেন রাষ্ট্রপতি। নিয়ম অনুযায়ী, দেশের সাংবিধানিক প্রধানকে বিমানবন্দরে স্বাগত জানাতে মুখ্যমন্ত্রী অথবা রাজ্য মন্ত্রিসভার কোনো সিনিয়র ক্যাবিনেট মন্ত্রীর উপস্থিত থাকার কথা।
কিন্তু এদিন বাগডোগরা বিমানবন্দরে রাষ্ট্রপতিকে স্বাগত জানাতে উপস্থিত ছিলেন শিলিগুড়ির মেয়র গৌতম দেব। কোনো মন্ত্রীর অনুপস্থিতিতে মেয়রকে দিয়ে স্বাগত জানানোকে ‘রীতিবিরুদ্ধ’ বলে উল্লেখ করেন দ্রৌপদী মুর্মু। তিনি স্পষ্ট জানান যে, প্রোটোকল অনুযায়ী এই আচরণ কাঙ্ক্ষিত নয়।
মমতা বন্দ্য়োপাধ্যায় কী বললেন?
রবিবার ধর্মতলার অবস্থান মঞ্চ থেকে রাষ্ট্রপতির অভিযোগের জবাব দেন মমতা বন্দ্য়োপাধ্যায়। মুখ্যমন্ত্রী জানিয়েছেন, শনিবারের অনুষ্ঠানটির আয়োজন করেছিল একটি বেসরকারি সংস্থা। সেই সংগঠনই নবম আন্তর্জাতিক আদিবাসী সাঁওতাল সম্মেলনের আয়োজন করেছিল। সেখানেই আমন্ত্রণ জানানো হয়েছিল রাষ্ট্রপতিকে। পাশাপাশি আয়োজকদের তরফে পর্যাপ্ত প্রস্তুতি ছিল না বলে দাবি করেছেন মমতা।
একইসঙ্গে মুখ্যমন্ত্রী জানান, জেলা প্রশাসনের তরফে কোনও প্রোটোকল ভাঙা হয়নি। রাষ্ট্রপতিকে স্বাগত জানাতে এবং বিদায় জানানোর সময়ে কারা থাকবেন, তা আগে থেকেই স্থির হয়ে ছিল বলে দাবি করেন মমতা। রাষ্ট্রপতির সচিবালয় থেকেই তাতে অনুমোদন দেওয়া হয়েছিল বলেও উল্লেখ করেছেন মুখ্যমন্ত্রী। তাঁর অভিযোগ, এই সময়ে নির্বাচনকে প্রভাবিত করতেই রাষ্ট্রপতিকে দিয়ে এই ধরনের রাজনীতি করানো হচ্ছে।
ঘটনার রিপোর্ট চেয়ে পাঠায় স্বরাষ্ট্রমন্ত্রক
রবিবার বিষয়টি নিয়ে কড়া অ্যাকশন নিয়েছে কেন্দ্র সরকার। স্বরাষ্ট্র মন্ত্রক বিষয়টি গুরুত্বের সঙ্গে বিবেচনা করছে বলে জানা গিয়েছে। গোটা বিষয়টি নিয়ে রিপোর্ট তলব করেছেন কেন্দ্রীয় স্বরাষ্ট্র সচিব। পশ্চিমবঙ্গের মুখ্য সচিবকে চিঠি লিখে বিকেল ৫টার মধ্যে এই বিষয়ে বিস্তারিত রিপোর্ট চেয়ে পাঠানো হয়েছে বলে সূত্র মারফত দাবি করা হয়েছে। জানা গিয়েছে, প্রোটোকলের অভাব, সঠিক রুটের তথ্যের অভাব এবং ব্যবস্থাপনায় ত্রুটির ব্যাখ্যা চাওয়া হয়েছে বলে দাবি করা হয়েছে।