
হুমায়ুন কবীর ও আসাদ উদ্দিন ওয়েইসিপশ্চিমবঙ্গে হুমায়ুন কবীরের দলের সঙ্গে জোট করে লড়ার কথা ঘোষণা করেছে আসাদউদ্দিন ওয়েইসির দল AIMIM। বাংলায় সাফল্য পেতে ওয়েইসি হাতিয়ার করছেন, ২০১০ সালের ওবিসি তালিকা ও মুসলিমদের নাম বাদের ইস্যুকে। এখন প্রশ্ন হল, পশ্চিমবঙ্গে কি সাফল্য পাবে AIMIM?
ওয়েইসির দলের বিরুদ্ধে বিরোধীরা বারবার একটি দাবি করে, AIMIM আসলে বিজেপি-কে সাহায্য করে। বিজেপি-র বি টিম হিসেবে কাজ করে। মমতা বন্দ্যোপাধ্যায় অতীতে বারবার একটি মন্তব্য করতেন, 'হায়দরাবাদ থেকে আসা কিছু নেতা পশ্চিমবঙ্গে কট্টরপন্থী মুসলিম রাজনীতি করছে।' পশ্চিমবঙ্গে কমবেশি ৩০ শতাংশ মুসলিম ভোট বেশিরভাগই মমতার দিকে যায়। এতদিন ধরে সেই ট্রেন্ডই চলছে। ২০২৬ সালে দেখা যাচ্ছে, হুমায়ুন কবীরের আম জনতা উন্নয়ন পার্টি নামে একটি নতুন দল তৈরি হল। আবার ওদিকে ওয়েইসির দল হুমায়ুনের দলের সঙ্গে জোট বাঁধছে। মুসলিম ভোট কি ভাগ হয়ে যাবে?
জোর দিয়ে হ্যাঁ বলা যাচ্ছে না
বাংলায় ২৯৪টি আসনের মধ্যে ৪৬টি আসনে ৫০ শতাংশের বেশি মুসলিম ভোটার। ১৬টি আসনে ৪০ থেকে ৫০ শতাংশ ভোট নির্ণায়ক মুসলিমরা। এবং ৫০টি আসনে ২০ থেকে ৩০ শতাংশ মুসলিম ভোটব্যাঙ্ক। এই বিপুল ভোটাররা কি ওয়েইসি বা হুমায়ুন কবীরকে তাঁদের 'মসিহা' হিসেবে মেনে নেবেন? এখানে জোর দিয়ে হ্যাঁ বলা যাচ্ছে না। কেন?
দেখুন, হায়দরাবাদের বাইরে ওয়েইসির দল যে ভীষণ ভাবে সফল, তা কিন্তু বলা যাচ্ছে না। গতবার উত্তরপ্রদেশেও লড়েছিল AIMIM, যেখানে বিজেপি ক্ষমতায় রয়েছে। একটিও আসন জিততে পারেনি। আবার ২০২১ সালে বিহার নির্বাচনে দেখা গেল, সীমাঞ্চলে ব্যাপক ভাবে ভোট কাটাকাটি হল AIMIM-এর জন্য। ওয়েইসির দল যেখানেই দাঁড়ায়, সেখানে একটিই অ্যাজেন্ডা হল, মুসলিমরা ভাল নেই। তাদের দল মুসলিম সম্প্রদায়কে দেখবে। পশ্চিমবঙ্গের ক্ষেত্রে দেখা যাচ্ছে, মুসলিমরা যে এখানেও খুব ভাল আছে, তা নয়। ২০০৬ সালে সাচার কমিটির রিপোর্ট ও ২০১৬ সালে প্রতীচী-SNAP রিপোর্ট বলছে, আর্থ-সামাজিক সূচকে মুসলিমরা অন্য অনেক সম্প্রদায়ের তুলনায় পিছিয়ে। তবে রাজনৈতিক ক্ষেত্রে তারা যথেষ্ট সক্রিয় এবং ভোটের রাজনীতিতে তাদের একটি নির্দিষ্ট প্রভাবও রয়েছে। শ্যামাপ্রসাদ মুখোপাধ্যায়, যিনি বিজেপির পূর্বসূরি ভারতীয় জনসংঘের প্রতিষ্ঠাতা, বাংলার মানুষ হলেও, এখনও পর্যন্ত পশ্চিমবঙ্গে বিজেপির শাসন প্রতিষ্ঠিত হয়নি।

ক্ষোভ থাকলেও কেন তৃণমূলেই ভরসা?
২০০৬ সালে পশ্চিমবঙ্গের রাজনীতিতে ৪৬ জন মুসলিম প্রতিনিধি ছিলেন। ২০১১ সালে তা বেড়ে হয়ে যায় ৫৯। সেটাই ছিল মমতা বন্দ্যোপাধ্যায়ের ক্ষমতায় আসার ভোট। ৫৯ জনের মধ্যে ২৫ জনই ছিলেন তৃণমূলের। আবার ২০১৬ সালে তৃণমূলের মুসলিম বিধায়ক বেড়ে হল ৩২। একই সময়ে পশ্চিমবঙ্গে ধুলাগড় ও বসিরহাটের মতো জায়গায় সাম্প্রদায়িক হিংসার ঘটনাও ঘটেছে। ২০১৯ সালের নির্বাচনের পর থেকে সোশ্যাল মিডিয়ায় সাম্প্রদায়িক উস্কানিমূলক বক্তব্যও বেড়েছে। অন্যদিকে, ফিরহাদ হাকিম ছাড়া তৃণমূল কংগ্রেসের মধ্যে তেমন কোনও প্রভাবশালী বাঙালি মুসলিম জননেতা নেই। চাকরিতে বৈষম্য থেকে শুরু করে সম্প্রদায়ের জন্য যথেষ্ট কাজ না করার অভিযোগ, মুসলিমদের একাংশের মধ্যে তৃণমূল সরকারের বিরুদ্ধে একাধিক ক্ষোভও রয়েছে।
উর্দু ও বাংলা যখন ফ্যাক্টর
পশ্চিমবঙ্গের মুসলিমরা কেরলম, গুজরাত, মহারাষ্ট্র, কাশ্মীর, রাজস্থান সহ নানা ভিনরাজ্যে পরিযায়ী শ্রমিক হিসেবে কাজ করতে যান। বাংলার গ্রামাঞ্চলে, বিশেষ করে ব্লক ও পঞ্চায়েত স্তরে, বিজেপি-শাসিত রাজ্যগুলির মতো অভিজ্ঞতা মুসলিমদের তেমনভাবে হয়নি। তাই তাদের ক্ষোভ এখনও সেই জায়গায় পৌঁছয়নি, যেখানে তারা তৃণমূলকে ‘শিক্ষা দেওয়ার’ কথা ভাবতে পারে।
ভোট কাটাকাটিতে বিরত
আবার মালদা, মুর্শিদাবাদ, উত্তর দিনাজপুরের মতো জেলাগুলিতে কংগ্রেসের এখনও কিছু ভোট রয়েছে। ওই জেলাগুলিতে AIMIM বা হুমায়ুনের নতুন রাজনৈতিক দলের বিকল্প হিসেবে যদি কাউকে ভেবে থাকেন মুসলিমরা, তাহলে সেই জায়গায় কংগ্রেস রয়েছে। AIMIM-এর কিন্তু পশ্চিমবঙ্গে কোনও মুখ নেই। আরও একটি ফ্যাক্টর হল, AIMIM দলটিতে উর্দুভাষী মুসলমানই বেশি। পশ্চিমবঙ্গে যা একেবারেই নগণ্য। রাজ্যের মুসলিমদের ৯০ শতাংশেরও বেশি বাঙালি। অধিকাংশই গ্রামীণ এলাকায় বসবাস করেন। অন্যদিকে কলকাতা ও পার্শ্ববর্তী জেলাগুলি, আসানসোল এবং কিছু শহুরে এলাকায় মুসলিমদের একাংশ বিহার ও পূর্ব উত্তরপ্রদেশ থেকে আসা উর্দুভাষীদের বংশধর। এই দুই গোষ্ঠীর মধ্যে কিছু গুরুত্বপূর্ণ সাংস্কৃতিক ও রাজনৈতিক পার্থক্য রয়েছে।
আসলে মুসলিমরা একটি বিষয় বোঝেন, যে সব আসনগুলিতে তাদের ২৫ থেকে ৩০ শতাংশ ভোটব্যাঙ্ক বা নির্ণায়ক শক্তি, সেখানে যদি কোনও ভোট কাটাকাটি বা ভাগাভাগি হয়, তাহলেই বিজেপি জিতে যাবে। আর পশ্চিমবঙ্গের মুসলিমরা বিজেপি-কে ঠেকাতে সদা সচেষ্ট। তারা জানে, AIMIM বা আম জনতা উন্নয়ন পার্টিকে ভোট দেওয়া মানেই, ভোট কাটাকাটি হবে। কলকাতার মেয়র ফিরহাদ হাকিমের কথায়, 'AIMIM-এর পশ্চিমবঙ্গে লড়ায় আমাদের কোনও প্রভাব পড়বে না। দুটো দলকেই (AIMIM ও আম জনতা উন্নয়ন পার্টি) বিজেপি ফান্ডিং করছে। দুটি দলই সাম্প্রদায়িক।'