scorecardresearch
 

নির্বাচন ঘোষণার আগেই রাজ্যে আধা সামরিক বাহিনী, কিন্তু কেন? বিশ্লেষণে জয়ন্ত ঘোষাল

এবারের বিধানসভা নির্বাচনে (Assembly Election) পশ্চিমবঙ্গে (West Bengal) যেভাবে আধা সামরিক বাহিনীকে মোতায়েন করা হচ্ছে, সেটা কিন্তু অভূতপূর্ব। তার কারণ নির্বাচনের দিনক্ষণই এখনও ঘোষণা করা হয়নি। আর সেটা যদি মার্চ মাসের প্রথম সপ্তাহে হয়, তার প্রায় পনেরো দিন আগে আধা সামরিক বাহিনী পৌঁছে যাওয়া, সেটাও একটা বিতর্ক সৃষ্টি করেছে। কেননা পশ্চিমবঙ্গ সরকার বলছে, আধা সামরিক বাহিনী পাঠাতে গেলে রাজ্য সরকারের অনুমতির প্রয়োজন হয়।

প্রতীকী ছবি প্রতীকী ছবি
হাইলাইটস
  • নির্বাচনী নির্ঘণ্ট ঘোষণার আগেই রাজ্যে আধা সেনা
  • শুরু কেন্দ্র-রাজ্য বিতর্ক
  • কারণ বিশ্লেষণে জয়ন্ত ঘোষাল

ভারতের (India) যেকোনও রাজ্যের নির্বাচনে আধা সামরিক বাহিনীর ভূমিকা সবসময় খুব গুরুত্বপূর্ণ। আমি দেখেছি, ত্রিপুরায় (Tripura) বা উত্তর-পূর্বাঞ্চলের যে কোনও রাজ্যে, বিশেষ করে যখন উপদ্রুত কোনও অঞ্চলে জঙ্গি কার্যকলাপ হয়েছে বা সন্ত্রাসবাদ মাথা চাড়া দিয়েছে, সেই সমস্ত জায়গার নির্বাচনে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা নিয়েছে আধা সামরিক বাহিনী। বর্তমানে ভোটের সময় মূলত রাজ্যের শান্তি বজায় রাখার উদ্দেশ্যেই আধা সামরিক বাহিনীকে মোতায়েন করা হয়, আর তাতে বড় ভূমিকা নেয় তারা।

এবারের বিধানসভা নির্বাচনে (Assembly Election) পশ্চিমবঙ্গে (West Bengal) যেভাবে আধা সামরিক বাহিনীকে মোতায়েন করা হচ্ছে, সেটা কিন্তু অভূতপূর্ব। তার কারণ নির্বাচনের দিনক্ষণই এখনও ঘোষণা করা হয়নি। আর সেটা যদি মার্চ মাসের প্রথম সপ্তাহে হয়, তাহলে তার প্রায় পনেরো দিন আগে আধা সামরিক বাহিনী পৌঁছে যাওয়া, সেটাও একটা বিতর্ক সৃষ্টি করেছে। কেননা পশ্চিমবঙ্গ সরকার বলছে, আধা সামরিক বাহিনী পাঠাতে গেলে রাজ্য সরকারের অনুমতির প্রয়োজন হয়। যদি নির্বাচনের দিনক্ষণ ঘোষণা হয়ে যায় তার পর সেই রাজ্যটা নির্বাচনী প্রক্রিয়ার কারণে নির্বাচন কমিশনারের অধীনে চলে যায়। সেখানে রাজ্য সরকারের আর ভূমিকা থাকে না। রাজ্য সরকার কার্যত একটা লেমডাক সরকারে পরিণত হয় কিছুদিনের জন্য। সেই কারণে তখন সেটা যদি স্বরাষ্ট্রমন্ত্রক নির্বাচন কমিশনের সঙ্গে যৌথভাবে আলোচনা করে রাজ্য সরকারকে জানিয়ে সেটা করে, সেটা একটা প্রক্রিয়া। কিন্তু নির্বাচনের দিনক্ষণ এখনও ঘোষণা হল না, একটা নির্বাচিত গণতান্ত্রিক সরকার এখনও বহাল, সেই অবস্থায় এইভাবে রাজ্য সরকারের অনুমতি না নিয়ে এবং কোনও আলোচনা না করে একতরফা আধা সামরিক বাহিনী পাঠিয়ে দেওয়াটা অন্যায় এবং অসাংবিধানিক।

সংবিধানের বিতর্ক থাক। সেটা তো একটা অন্য বিষয়। অমিত শাহর স্বরাষ্ট্রমন্ত্রক আধা সামরিক বাহিনী কেন পাঠাচ্ছে, তার একটা যুক্তি খোঁজার চেষ্টা করা যাক। প্রথম যুক্তি হচ্ছে, পশ্চিমবঙ্গে ভোটে রাজনৈতিক হিংসার খুব উপদ্রব হয়। এমন কোনও নির্বাচন পশ্চিমবঙ্গে হয়নি যেখানে কোনও রাজনৈতিক হিংসা হয়নি। ছোট, বড়, মাঝারি, নানান ধরনের হিংসা হয়। এই হিংসা নিয়ন্ত্রণের পাশাপাশি নিরপেক্ষতা বজায় রাখাও একটি গুরুত্বপূর্ণ বিষয়। এছাড়া রাজ্য পুলিশ অনেক সময় শাসক দলের হয়ে কাজ করে। পশ্চিমবঙ্গে তার ইতিহাস আছে। সিপিএম জমানায় তাদের হয়ে করেছে, তৃণমূলের জমানায় তাদের হয়ে করছে। এখনও গ্রামাঞ্চলে সেগুলো হয়ে থাকে বলে অভিযোগ করছে বিজেপি। সেটা যাতে না হয় তার জন্য আধা সামরিক বাহিনীকে মোতায়েন করা হয়েছে। 

আগে কেন করা হচ্ছে? তার কারণটা হল, এর আগেরবারের অভিজ্ঞতায় দেখা গেছে যে, আধা সামরিক বাহিনী এই এলাকার যে ভূগোল, সেটা জানে না। কোথায় বুথ জানে না। এখন যদি অভিযোগ আসে এক নম্বর বুথ থেকে, তখন রাজ্য পুলিশকেই সেটা বলতে হয়, জেলার পুলিশকেই বলতে হয় আমাদের পথ দেখাও। তারা তখন দুই নম্বর বুথে পৌঁছে দেয় তাদের। তারা সেখানে গিয়ে দেখে, শান্তিপূর্ণভাবেই ভোট হচ্ছে। আর এই সময়ের অপব্যয় তখন একটা বিরাট গুরুত্বপূর্ণ বিষয়, আর তার মাঝেই ভোটের কারচুপিটা হয়ে যায়। সেই কারণে এই অভিযোগের ভিত্তিতে আধা সামরিক বাহিনীকে আগে পাঠানো হচ্ছে যে, আধা সামরিক বাহিনীর সেই ব্যাটেলিয়ন যাতে পুলিশের সঙ্গে কথা বলে এখনই ভোট হওয়ার অনেক আগে থাকতেই বুথ গুলোকে চিনে নেয়, জেনে নেয়। তারা ফ্ল্যাগ মার্চ শুরু করেছে সেখানকার মানুষদেরকে উদ্বুদ্ধ করার জন্য। যেন বলছে  'ভয় পেও না, আমরা আছি। তোমরা বাড়ির থেকে বেরিয়ে ভোটটা দিতে এসো।' বিজেপি মনে করছে, যদি ভোট ঠিকমতো দেওয়া হয় তাহলেই ভোটটা তাদের পক্ষে যাবে। এই কারণে আধা সামরিক বাহিনীকে আগে পাঠানো হয়েছে।

মূলত বিএসএফ, সিআইএসএফ, সিআরপিএফ, এরাই হচ্ছে স্বরাষ্ট্রমন্ত্রকের অধীনে আধা সামরিক বাহিনী। বিএসএফ, তারা বাংলাদেশের সীমান্তবর্তী এলাকায় থাকে। এখানে সিআইএসএফ এখন বিমানবন্দর গুলোতে অনেক বেশি সক্রিয় হয়েছে। অনেক ইন্ডাস্ট্রিয়াল হাউস, শিল্প তালুকের নিরাপত্তার দেখভাল করছে। তার ফলে মূলত সিআরপিএফ-ই ভোটের সময় জেলা গুলোতে যাচ্ছে। কিন্তু মিক্স ম্যাচ হতে পারে। অর্থাৎ, এখানকার কিছু কর্মী এই ব্যাটিলিয়ানে ডেপুটেশনে আসতে পারে। যারা এলাকাটা চেনে, বাঙালি বা এইসব এলাকা গুলোতে প্রশিক্ষণপ্রাপ্ত। যাঁরা আগে এইসব এলাকায় কাজ করেছেন অর্থাৎ যাঁরা সিনিয়র লোক, তাঁদেরকে দিলে তাঁরা কিছুটা করতে পারে। 

এখন এই অপারেশনাল ব্যাপারগুলো অমিত শাহ নিজে দেখছেন, এবং সেই কারণে আধা সামরিক বাহিনী পাঠানো শুরু হয়ে গেছে। কিন্তু এটা নিয়ে একটা বিতর্ক চলছে যে এটা করতে পারেন কি না। আর একটা জিনিস যেটা গোয়েন্দা অথবা বিভিন্ন সূত্রের রিপোর্টে আসছে তা হল, এই ফ্ল্যাগ মার্চ যখন হয়, সেই সময় যদি আধা সামরিক বাহিনীর ওপরে কোনও বড় আক্রমণ হয়, তাহলে কেন্দ্রীয় স্বরাষ্ট্রমন্ত্রক রাজ্য সরকারকে দায়ী করবে। রাজ্য সরকার, কেন্দ্রীয় স্বরাষ্ট্রমন্ত্রককে দায়ী করবে। এই ধরনের বিস্ফোরণ, কোনও আইএসআই বা পাক গোয়েন্দা বাহিনীও করতে পারে যাদেরকে 'এজেন্ট প্রভোকেটার' বলে। যারা এরকম কোনও সুযোগে, যেখানে ভিড় আছে সেখানে কোনও বড় হাঙ্গামা বাধিয়ে আমাদের দেশকে আসলে ডিসটেবিলাইজড করতে চায়।

পশ্চিমবঙ্গে যেহেতু প্রায় শতকরা তিরিশ ভাগ সংখ্যালঘু মানুষ, যেহেতু বাংলাদেশের সীমান্তবর্তী এলাকা রয়েছে তাই এটা সংবেদনশীল রাজ্য। আন্তর্জাতিক সীমান্ত আছে। নেপাল আছে, ভুটান আছে। শিলিগুড়ির যে করিডোর, তার সঙ্গে চীনের একটা যোগাযোগের জায়গা আছে। এইসব মিলিয়ে পশ্চিমবঙ্গ কিন্তু খুব সংবেদনশীল। এখন যদি কোনও ঘটনা ঘটে যায়, সেটা একেবারেই অনভিপ্রেত,সেটা কেউ চায় না। কিন্তু সেই ঘটনাটাকে কেন্দ্র করে দোষারোপ পালটা দোষারোপে ভোটের পরিবেশটা আরও নষ্ট হয়ে যেতে পারে। সেই কারণে শান্তিকামী বাঙালি এবং পশ্চিমবঙ্গের মানুষ কিন্তু চাইছেন, আধা সামরিক বাহিনী যদি আসে আসুক, কিন্তু এই কেন্দ্র-রাজ্য বিবাদে ভোটের শান্তিপূর্ণ পরিস্থিতিটা যেন নষ্ট না হয়ে যায়।

(লেখক - মমতা বন্দ্যোপাধ্যায়ের প্রেস উপদেষ্টা)