scorecardresearch
 

West Bengal Election 2021: প্রার্থীতালিকা প্রকাশে BJP-TMC উভয়েই দেরি করছে! স্ট্র্যাটেজিটা কী? বিশ্লেষণে জয়ন্ত ঘোষাল

অতীতে কংগ্রেস জমানায় আমি দেখেছি, প্রার্থী মনোনয়ন নিয়ে ভীষণ ভাবে মারামারি হত। কেন না, তখন কংগ্রেসের মধ্যে অনেকগুলো গোষ্ঠী ছিল। প্রিয়রঞ্জন দাশ মুন্সির গোষ্ঠী, অশোক সেনের গোষ্ঠী, সোমেন মিত্রের গোষ্ঠী, সুব্রত মুখোপাধ্যায়ের গোষ্ঠী, প্রণব মুখোপাধ্যায়ের গোষ্ঠী, ভোলা সেন, নানা রকমের চরিত্র , তাঁদের নানা রকমের অনুগামী।

মমতা বন্দ্যোপাধ্যায় ও নরেন্দ্র মোদী মমতা বন্দ্যোপাধ্যায় ও নরেন্দ্র মোদী
হাইলাইটস
  • প্রার্থী বাছাই নিয়ে যে প্রকাশ্যে খুব কোন্দল
  • ২০০টি আসনে মমতা বন্দ্যোপাধ্যায়ের তালিকা তৈরি
  • মমতা বন্দ্যোপাধ্যায়ের অভিজ্ঞতা কিন্তু সব দিক দিয়ে খুব একটা ভালো নয়

এই মুহূর্তে পশ্চিমবঙ্গের বিধানসভা নির্বাচনে সকলের অজান্তে ঘটে চলা সব থেকে বড় ঘটনা হল, প্রতিটি দলই প্রার্থী বাছাই নিয়ে খুব ব্যস্ত। ৬ তারিখ থেকে মনোনয়ন জমা দেওয়ার প্রক্রিয়া শুরু হয়ে যাবে। তার আগে যদি প্রার্থী তালিকাটাই ঘোষণা না হয় তবে তো মুশকিল! গত সপ্তাহেই মোটামুটিভাবে তৃণমূলের  প্রার্থী তালিকা ঘোষণা হয়ে যাওয়ার কথা ছিল। ২৯৪ টি আসনের মধ্যে প্রায় ২০০টি আসনে মমতা বন্দ্যোপাধ্যায়ের তালিকা তৈরি বলে তৃণমূল সূত্র থেকেই জানা যাচ্ছে। তাহলে এত দেরি কেন? দেরি যে শুধু তৃণমূলের ক্ষেত্রে হচ্ছে, তা নয়। বিজেপিরও প্রার্থী বাছাইয়ের প্রক্রিয়ায় বেশ বিলম্ব হচ্ছে। আর প্রার্থী বাছাই নিয়ে যে প্রকাশ্যে খুব কোন্দল, মারামারি হচ্ছে, তেমনটাও নয়। 

অতীতে কংগ্রেস জমানায় আমি দেখেছি, প্রার্থী মনোনয়ন নিয়ে ভীষণ ভাবে মারামারি হত। কেন না, তখন কংগ্রেসের মধ্যে অনেকগুলো গোষ্ঠী ছিল। প্রিয়রঞ্জন দাশ মুন্সির গোষ্ঠী, অশোক সেনের গোষ্ঠী, সোমেন মিত্রের গোষ্ঠী, সুব্রত মুখোপাধ্যায়ের গোষ্ঠী, প্রণব মুখোপাধ্যায়ের গোষ্ঠী, ভোলা সেন, নানা রকমের চরিত্র , তাঁদের নানা রকমের অনুগামী। তাদের মধ্যে কাকে মনোনয়ন দেওয়া হবে আর কাকে দেওয়া হবে না, -এই নিয়ে শুরু হত কোন্দল। এমনকী মমতা বন্দ্যোপাধ্যায়ও যখন যুব কংগ্রেসের নেত্রী হলেন তখনও যুব কংগ্রেসের পক্ষ থেকে ক’জন প্রার্থী হবেন, না হবেন, সে সব নিয়েও নানা রকমের প্রশ্ন উঠতে শুরু করে। 

এইরকম একটা পরিস্থিতিতে যেটা খুব বড় হয়ে দেখা দিয়েছে এবারে, কংগ্রেসের ওই গোষ্ঠী কোন্দল, তা না থাকলেও তৃণমূলের জেলায় জেলায় প্রার্থী হওয়ার জন্য মারামারিটা রয়েছে। কিন্তু সকলেই জানে, এখানে মমতা বন্দ্যোপাধ্যায় যা বলবেন, সেটাই হবে। তাহলে দেরি হচ্ছে কেন? দেরি হওয়ার একটা বড় কারণ হল, মমতা বন্দ্যোপাধ্যায় এবারে প্রার্থী বাছাইয়ের প্রক্রিয়াটা প্রশান্ত কিশোরের সংস্থার মাধ্যমে অনেকটা বৈজ্ঞানিক ভাবে করার চেষ্টা করেছেন। তিনি চেষ্টা করেছেন যাতে যারা প্রার্থী রয়েছে, existing যারা হেরে গেছে তাদের আবার দ্বিতীয়বার প্রার্থী না করা। আর যারা প্রার্থী আছেন তাদেরও সকলে চিনতে পারবেন না। -এই অবজেক্টিভ অ্যাসেসমেন্টের ভিত্তিতে অনেকের নাম বাদ যাচ্ছে। প্রবীণ এবং নবীনদের অনুপাতটা ঠিক রাখার জন্য প্রবীণদের অনেককে বাদ দিয়ে নবীনদের নিয়ে আসা হচ্ছে। অর্থাৎ; প্রবীণ এবং নবীনের মধ্যে মিশ্রণের চেষ্টাকরা হচ্ছে, যেটা হওয়া খুব প্রয়োজন। 

এই রকম একটা পরিস্থিতিতে প্রশান্ত কিশোরের যে চিন্তা ভাবনা, তাতে অনেক পেশাদারী লোকদের বেশি করে নিয়ে আসা। যেমন বিভিন্ন জেলাতে যারা স্থানীয় ডাক্তার, আইনজীবী, স্থানীয় স্তরে জনপ্রিয়তাদেরকে নিয়ে আসা। রাজনীতির চর্বিতচর্বণের বাইরের এবং খুব বেশি টলিউড বা তারকাদের নিয়ে আসার কথা বলা হলেও এবারে কিন্তু মমতা বন্দ্যোপাধ্যায় তুলনামূলকভাবে সেটাতে জোর কম দিচ্ছেন। কেউ কেউ তো নিশ্চয়ই থাকবেন। অতীতে যেভাবে মুনমুন সেন, সন্ধ্যা রায় থেকে মিমি, অর্থাৎ; একের পর এক তারকারা লোকসভাতে এসেছেন। যেমন, দেব এসেছেন। আবার বিধানসভাতেও অনেকে এসেছেন। যেমন, চিরঞ্জিৎ এসেছেন। এঁদের নিয়ে মমতা বন্দ্যোপাধ্যায়ের অভিজ্ঞতা কিন্তু সব দিক দিয়ে খুব একটা ভালো নয়। তঁদের রাজনৈতিক ভূমিকা, সাংগঠনিক ভূমিকা সুষ্ঠুভাবে যে তারা সকলে পালন করতে পেরেছে, তা নয়। তারা যেন মনে হয়, তৃণমূল এসেও তৃণমূলে নেই। 

এই কারণে বড় পেশাদারী মানুষদেরকে নিয়ে আসার ব্যাপারে মমতা বন্দ্যোপাধ্যায়ের একটা জোর রয়েছে। সেটাকে কেন্দ্র করে কিন্তু তৃণমূলের ভেতরে গোলমাল শুরু হয়ে গেছে। তৃণমূলে এই মূহূর্তে গোলমাল হচ্ছে। কারণ, কিছু তৃণমূলের এমএলএ, যারা টিকিট পাবে না, তারা বিজেপিতে চলে যেতে পারে, সেই আশঙ্কা রয়েছে। সুতরাং, বিজেপির তালিকাটা আগে প্রকাশ হয়ে গেলে একদিক থেকে মমতা বন্দ্যোপাধ্যায়ের জন্যে ভালো হত। মমতা বন্দ্যোপাধ্যায় আর কতদিন অপেক্ষা করবে। 


এই পরিস্থিতিতে বিজেপির দেরি কেন? তার কারণ, বিজেপিও তাদের যে প্রার্থী, তাদের এখন তিনজন বিধায়ক আছে। ২৯৪ টা প্রার্থী দেওয়া কিন্তু বিজেপির মতো দলের পক্ষে খুব সহজ কাজ নয়। শুধুমাত্র যে কোনও লোককে একটা টিকিট পাইয়ে দিলাম, তা তো নয়। অনেকগুলো কথা মাথায় রাখতে হচ্ছে। কেননা, আদিবাসী এলাকায় আদিবাসী প্রার্থী দেওয়া, মতুয়া এলাকায় মতুয়া প্রার্থী দেওয়া, কামতাপুরী এলাকায় রাজবংশী প্রার্থী দেওয়া। সবদিক থেকে প্রতিনিধিত্ব এখন করতে হবে। এইবারে যেভাবে উপজাতি, আদিবাসী, ওবিসি, মুসলমান, নানান রকমের ক্রাইটেরিয়া রয়েছে, সেগুলো বিজেপিকেও সামলাতে হচ্ছে। 

বিজেপি দেখছে, কোন কোন জায়গায় বাম, কংগ্রেস এবং সিদ্দিকি-র যে সেকুলার ফ্রন্ট, তারা কোথায়, কী প্রার্থী দেবে, সেটাও দেখতে হচ্ছে। সুতরাং তার ফলে বিজেপিও আবার তাদের যে তালিকা, সেটা দিল্লির অমিত শাহ এবং মোদীও ব্যক্তিগতভাবে প্রার্থীদের নাও চিনতে পারেন। তবে, একটা অ্যাসেসমেন্ট তাদের টিম করছে যে, এরমধ্যে যেন বেনোজল না ঢুকে যায়। তৃণমূল থেকে আসায় শুভেন্দু অধিকারী, তারা ক’জনকে প্রার্থী করতে পারে! মুকুল রায়ের ক’জন প্রার্থী হবে? ক’জন রাজীব বন্দ্যোপাধ্যায়ের প্রার্থী হবে? তৃণমূল থেকে যারাই এসেছে, তাদের সকলকেই যে প্রার্থী করা হবে না, -এটাও কিন্তু কৈলাস বিজয়বর্গীয় ঘোষণা করে দিয়েছেন। তিনি বলেছেন,সকলকে প্রার্থী করা সম্ভব নয়। কেননা, তাহলে তো বিজেপিটা তৃণমূলের ‘বি টিম’ হয়ে যায়। সুতরাং সেটাও তারা করতে চাইছেন না। সবমিলিয়ে পরিস্থিতিটা কিন্তু বেশ জটিল হয়ে গেছে। সব দলই কিন্তু চেষ্টা করছে, এই জটিলতা থেকে বেরিয়ে আসতে।