কেরল ভোট: শেষ দুর্গ বাঁচাতে পারবে বামেরা, নাকি আবার কংগ্রেস?

মঙ্গলবার সকাল থেকেই ভোটগ্রহণ শুরু হচ্ছে দেশের সবচেয়ে শিক্ষিত রাজ্যের। কেরল বিধানসভা ১৪০টি আসনে একদিনেই হচ্ছে ভোটগ্রহণ। কেরল বিধানসভায় মূল লড়াই হতে চলেছে ক্ষমতাশীন এলডিএফ এবং কংগ্রেস নেতৃত্বাধীন ইউডিএফ জোটের মধ্যে। এবার এই দক্ষিণের রাজ্যকে পাখির চোখ করেছে ভারতীয় জনতা পার্টিও। নিয়মিত প্রচারে এসেছেনে মোদী-শাহ-নাড্ডারা।

Advertisement
কেরল ভোট: শেষ দুর্গ বাঁচাতে পারবে বামেরা, নাকি আবার কংগ্রেস?কেরল এবার পরিবর্তন না প্রত্যাবর্তনের পক্ষে রাজ্যের মানুষ?
হাইলাইটস
  • দেশের একমাত্র বাম শাসিত রাজ্য কেরল
  • মঙ্গলবার এক দফাতেই ভোট ১৪০ আসনে
  • কেরল এবার পরিবর্তন না প্রত্যাবর্তনের পক্ষে রাজ্যের মানুষ?

রাত পোহালে তিন ৪ রাজ্য ও এক কেন্দ্র শাসিত অঞ্চলের নির্বাচন। অসমে তৃতীয় তথা শেষ দফা, বাংলায় তৃতীয় দফার নির্বাচন হলেও দক্ষিণের তামিলনাড়ু ও কেরলে হচ্ছে এক দফাতেই নির্বাচন। সঙ্গে রয়েছে কেন্দ্রশাসিত পুদুচেরিও। এই ৫ রাজ্যের মধ্যে একমাত্র বাম শাসিত সরকার রয়েছে কেরলে। বলতে গেলে ভারতের একমাত্র এই রাজ্যেই টিমটিম করে ক্ষমতা ধরে রেখেছে বাম শিবির। ১৪০ আসনের কেরল বিধানসভায় মূল লড়াই হতে চলেছে  ক্ষমতাশীন এলডিএফ এবং কংগ্রেস নেতৃত্বাধীন ইউডিএফ জোটের মধ্যে। এবার এই দক্ষিণের রাজ্যকে পাখির চোখ করেছে ভারতীয় জনতা পার্টিও। নিয়মিত প্রচারে এসেছেনে মোদী-শাহ-নাড্ডারা। তবে কেন্দ্রে গত ৭ বছর ধরে বিজেপির সরকার থাকলেও কেরলে দলের বিধায়ক সংখ্যা এক। এই পরিস্থিতিতে কেরলে বিজেপি বিশাল কোনও ম্যাজিক দেখাতে পারবে এমন সম্ভাবনাও কম।

কেরলে অলিখিত একটি নিয়ম আছে। প্রতি পাঁচ বছর অন্তর সরকার বদলানোই দক্ষিণী এই রাজ্যের রেওয়াজ। বিধানসভা ভোটের আগে এই রাজ্যে যে সব জনমত সমীক্ষা হয়েছে, তার প্রায় সবক’টিতেই এগিয়ে রয়েছে বাম জোট তাতেই কেরলে  চাকা ঘোরানোর আত্মবিশ্বাস পাচ্ছে বাম শিবির। বিশেষ করে মুখ্যমন্ত্রী পিনারাই বিজয়নের নেতৃত্বে করোনা মোকাবিলা এবং লকডাউন পরিস্থিতি সামাল দিতে এলডিএফ সরকারের কাজ প্রশংসিত হয়েছে। আর তাতেই এবারের কেরলে ভোট রাজনীতিতে বদল আসবে বলেই আশা করছেন প্রকাশ কারাট, সীতারাম ইয়েচুরির মত বামেদের দক্ষিণ ব্রিগেডের নেতারা। তবে কংগ্রেসের প্রাক্তন সভাপতি রাহুল গান্ধী  কাছেও কেরলে ক্ষমতা পুনরুদ্ধার মরণ-বাঁচন লড়াই। 

 

গত বিধানসভায় কেবল ১টি আসন, এবার কেরলে কতবড় ফ্যাক্টর BJP?

এক দফাতেই কেরলে ভোট
মঙ্গলবার সকাল থেকেই ভোটগ্রহণ শুরু হচ্ছে দেশের সবচেয়ে শিক্ষিত রাজ্যের। কেরল বিধানসভা ১৪০টি আসনে একদিনেই হচ্ছে ভোটগ্রহণ। রাজ্যে মোট ভোটার সংখ্যা ২ কোটি ৬৭ লক্ষ। মোট বুথ রয়েছে ৪০ হাজার ৭৭১। মঙ্গলবার কেরলে ভাগ্য পরীক্ষা হতে চলেছে ৯৫৭ জন প্রার্থীর। কেরলে ১৪০টি বিধানসভা আসনের মধ্যে ১৪টি তফসিলি জাতি এবং ২ টি তফসিলি  উপজাতিদের জন্য সংরক্ষিত। 

Advertisement

কংগ্রেস এবারের ভোটে কেরলে ৯৩টি আসনে প্রার্থী দিয়েছে। সহযোগী মুসলিম লিগ প্রতিদ্বন্দ্বিতা করছে ২৫টি আসনে। এ ছাড়া ইউডিএফ জোটের  অন্যান্য শরিকদের মধ্যে কেরল কংগ্রেস (জোসেফ) ১০, আরএসপি ৫  এবং বাকী সহয়োগীরা ৭টি আসনে প্রার্থী দিয়েছে।

জুডাসের সঙ্গে বামেদের তুলনা, প্রতারণার অভিযোগ মোদীর

অন্যদিকে  এলডিএফ জোটে সিপিএম ৭৭, সিপিআই ২৪, কেরল কংগ্রেস 1১২, জেডিএস ৪, এনসিপি ৩, ইন্ডিয়ান ন্যাশনাল লিগ ৩, লোকতান্ত্রিক জনতা দল ৩ টি আসনে এবং বাকী শরিকরা ১৪ আসনে লড়াই করছে। অন্যদিকে  এনডিএ জোটে  বিজেপি ১১৩ টি আসনে প্রতিদ্বন্দ্বিতা করেছে এবং তার সহযোগী  ভারতীয় ধর্ম জনসেনা পার্টি ২১ টি আসনে প্রতিদ্বন্দ্বিতা করছে। এ ছাড়া বিজেপি অন্যান্য শরিকদের জন্য ৬ টি আসন ছেছেড়ে, আর বিজেপি প্রার্থীর মনোনয়ন বাতিল হয়েছে ৩ টি আসনে।

আশা দেখলেও বামেদের চিন্তার কারণ লোকসভা ভোট
২০১৬ সালের বিধানসভা নির্বাচনে সিপিআইএম নেতৃত্বাধীন এলডিএফ জোট পেয়েছিল ৯১টি আসন। কংগ্রেসের নেতৃত্বাধীন ইউডিএফ জোটের দখলে গিয়েছিল ৪৭টি আসন। একটি আসন পেয়েছিল বিজেপি। নির্দলের দখলে একটি আসন। তবে উনিশের লোকসভা নির্বাচনে সারা দেশে কংগ্রেসের পতন ঘটলেও দক্ষিণের এই রাজ্যই আশার আলো দেখিয়েছিল শতাব্দী প্রাচীন দলটিকে। সেবার কেরল থেকে মাত্র ১ টি আসনে জয়ী হয়েছিল এলডিএফ। বাকি ১৯টি কেন্দ্র থেকে সাংসদ হয়েছিলেন ইউডিএফ জোটের প্রার্থীরা। লোকসভার ফলকে বিধানসভা অনুযায়ী দেখলে ১৪০ আসনের কেরলে ১২৩টি এগিয়ে রয়েছে কংগ্রেস নেতৃত্বাধীন ইউডিএফ জোট।  শাসক এলডিএফ এগিয়ে মাত্র ১৬টিতে। 

স্থানীয় প্রশাসনের ভোটে কোন ইঙ্গিত?
লোকসভা ভোটে ধরাশায়ী হয়েছে বামেরা, কিন্তু একবছর যেতে না যেতেই স্থানীয় প্রশাসনের ভোটে ফের জয়জয়কার দেখিয়েছে এলডিএফ। গত বছর ডিসেম্বরে পুরসভা, পঞ্চায়েত-সহ স্থানীয় প্রশাসনের ভোট হয়েছে কেরলে। সেই ভোটে ফল বিচার করলে হামেদের ‘লিড’রয়েছে ১০১ আসনে। আর কংগ্রেস জোট এগিয়ে ৩৮টি আসনে। বিজেপি দাঁড়িয়ে রয়েছে সেই একটিতেই। তবে তাৎপর্যপূর্ণ বিষ হল, লোকসভা ভোটের তুলনায় কেরলে ভোট বেড়েছে বিজেপির। গতবছর স্থানীয় নির্বাচনে ১৭ শতাংশ ভোট গিয়েছে গেরুয়া শিবিরের দখলে।

হেভিওয়েট লড়াই
কেরালার বিধানসভা নির্বাচনে প্রবীণ নেতাদের সঙ্গে তরুণ মুখও রয়েছে এবার প্রচুর, যা লড়াইকে আরও  আকর্ষণীয় করে তুলেছে। কোট্টায়াম জেলায় অবস্থিত পুঠুপল্লী আসনে 'ডেভিড বনাম গোলিয়াথ'-এর লড়াই রয়েছে। এখান থেকে ভোটে লড়ছেন কেরলের দু'বারের মুখ্যমন্ত্রী তথা কংগ্রেস নেতা ৭৭ বছর বয়সী ওমেন চান্ডি। এই কেন্দ্রে  সিপিআই (এম) এর ৩০ বছর বয়সী জ্যাক সি টমাস লড়াই করছেন এলডিএফ-এর হয়ে। ধর্মাদম উত্তর কেরলের সবচেয়ে ভিআইপি আসনগুলির একটি। রাজ্যের বর্তমান মুখ্যমন্ত্রী পিনারাই বিজয়ন এখান থেকে প্রার্থী। এখান তাঁর বিপরীতে প্রতিদ্বন্দ্বিতা করছেন  বিজেপির প্রাক্তন রাজ্য সভাপতি সিকে পদ্মনাভান। অন্যদিকে  কংগ্রেসের হয়ে দাঁড়িয়েছেন   সি রঘুনাথ।

পলক্কড়  আসনে নন-মালায়ালি ভোটার সংখ্যা নির্ধারকের ভূমিকা নিতে চলেছে। এখান থেকে এবার বিজেপি মেট্রো ম্যান ই শ্রীধরণকে  প্রার্থী করেছে, অন্যদিকে কংগ্রেস থেকে শফি পরমবিল ময়দানে নেমেছেন।  সিপিএমের হয়ে লড়ছেন সিপি প্রমোদ। নিমোম বিধানসভা আসনটিতে ২০১৬ সালে  প্রথমবারের পদ্ম ফুটেছিল। এই আসনে আধিপত্য বজায় রাখতে বিজেপি তার বিদায়ী বিধায়ককে টিকিট না দিয়ে মেঘালয়ের প্রাক্তন রাজ্যপাল রাজশেখরণকে ময়দানে নামিয়েছে। কংগ্রেস টিকিট দিয়েছে  প্রাক্তন মুখ্যমন্ত্রী কে করুণাকরণের ছেলে  মুরালিধরনকে।

রাহুল গান্ধীর জন্য কেরল জয় কেন গুরুত্বপূর্ণ?
প্রদেশ কংগ্রেসে ভোটের আগে গোষ্ঠীদ্বন্দ্ব সবচেয়ে সমস্যায় ফেলেছে কংগ্রেস নেতৃত্বকে। এই আবহে প্রচারের কমান্ড নিজের হাতেই রেখেছএন রাহুল গান্ধী। এই কারণেই রাহুল পাঁচ রাজ্যের নির্বাচনে কেরলেই সবচেয়ে বেশি  প্রচার করেছেন। গত লোকসভায় আমেঠিতে হারের পর কেরলের  ওয়ানাড় থেকেই সংসদ হন রাহুল। কেরলে ক্ষমতার পরিবর্তন ঘটানো কেবল কংগ্রেস নয় রাহুলের সাংগঠনিক ক্ষমতারও বড় পরীক্ষা। বার বার তাঁর নেতৃত্ব নিয়ে প্রশ্ন উঠেছে। ৫ রাজ্যে বিধানসভা নির্বাচনের পরেই রয়েছে কংগ্রেসের সভাপতি নির্বাচন। তাই এক্ষেত্রে কেরলে নিজের ক্ষমতা প্রদর্শন রাহুলের কাছে জীবন-মরণ চ্যালেঞ্জ। 

Advertisement

কতটা লড়াই দেবে বিজেপি?
কেরলে বিজেপি তেমন ভাবে মাটি এখনও শক্ত করতে না পারলেও তাদের ভোট ক্রমাগত বাড়ছে। সেই কারণেই এবার বিজেপি কেরলে নির্বাচনী লড়াইয়ে জয়ের জন্য পুরো শক্তি নিয়ে ঝাঁপিয়েছে। এবার গেরুয়া শিবির কেরলের প্রায় ডজনখানেক বিধানসভা আসনে বিশেষ নজর দিয়েছে। বিজেপি গত বারের একটি আসনকে এবার ডাবল ডিজিটে রূপান্তরিত করার চেষ্টা করছে। এই কারণেই সারা দেশে মেট্রোম্যান হিসাবে জনপ্রিয় ই শ্রীধরণকে কেরলে বিজেপির মুখ হিসাবে তুলে ধরা হয়েছে। বিজেপি কেরালায় লাভ জিহাদের বিরুদ্ধে আইন করার প্রতিশ্রুতি দিয়েছে, যার কারণে হিন্দুদের পাশাপাশি খ্রিস্টান সম্প্রদায়কে কাছে টানার চেষ্টা করা হয়েছে।

শেষ হাসি হাসবে কে?
রাজনীতির বিশেষজ্ঞরা বলছেন যে দলিত ও পশ্চাৎপদ বর্ণের লোকেরা এখনও বামপন্থীদের পাশে রয়েছেন। অন্যদিকে কংগ্রেস এবার মুসলিম ও খ্রিস্টান সম্প্রদায়ের পাশাপাশি জেলে সম্প্রদায়ের ভোট পাওয়ার আশায় রয়েছে। এদিকে বিজেপির নজর উচ্চবর্ণের ভোটব্যাঙ্কের দিকে। মুখ্যমন্ত্রী  পিনারাই বিজয়ান গত  পাঁচ বছরে তাঁর উন্নয়নমূলক কাজের খতিয়ান দেখিয়ে।  কেরালায় গত চার দশক ধরে প্রতি পাঁচ বছরে ক্ষমতা পরিবর্তিত হয়। এমন পরিস্থিতিতে, এবার পিনারই বিজয়ন সেই ঐতিহ্যকে ভাঙতে পারবেন নাকি রাহুল গান্ধীর যাদু কেরলে চলবে তার ফয়সালা হয়ে যাবে মঙ্গলবারই। যদিও জবাব জানতে অপেক্ষা করতে হবে দোসরা মে পর্যন্ত।
 

POST A COMMENT
Advertisement