
পশ্চিমঙ্গে মুসলিম ভোটারদের মন কি পাবে বিজেপি? অতিবড় রাজনৈতিক বোদ্ধাও এই প্রশ্নের উত্তরে সরাসরি 'না' বলে দেবেন। খোদ বিরোধী দলনেতা শুভেন্দু অধিকারীও একাধিক জনসভায় স্বীকার করেছেন, মুসলিমরা বিজেপি-কে ভোট দেবে না। তাহলে পশ্চিমবঙ্গে ক্ষমতায় আসতে গেলে বিজেপি-র একমাত্র লক্ষ্য হিন্দু ভোটব্যাঙ্ক। এখন প্রশ্ন হল, বিজেপি আরও ঠিক কত শতাংশ হিন্দু ভোট পেলে পশ্চিমবঙ্গে ক্ষমতা বদলের সম্ভাবনা রয়েছে?
শুভেন্দু অধিকারী কী দাবি করেছিলেন?
গত ৩ জানুয়ারি একটি সভায় শুভেন্দু দাবি করেছিলেন, আরও ৬ শতাংশ হিন্দু ভোট পেলেই বিজেপি ক্ষমতায় আসবে ২০২৬ সালের বিধানসভা নির্বাচনে। তিনি বলেছিলেন, '২০২৪ সালের লোকসভা ভোটে ৩৯ শতাংশ ভোট পেয়েছে বিজেপি। বিধানসভায় আরও ৬ শতাংশ ভোট পেলেই বিজেপি ক্ষমতায় আসবে।' নন্দীগ্রামে দাঁড়িয়ে দাবি করেছিলেন শুভেন্দু।
প্রথমেই ২০২১ সালের দিকে নজর দেওয়া যাক। বিজেপি জিতেছিল ৭৭টি আসন। তৃণমূলের ভোট শতাংশ ছিল ৪৭.৯৪। বিজেপির ভোট শতাংশ ছিল ৩৮.১৩। বাম-কংগ্রেস-আইএসএফ জোটের দিকে গিয়েছিল ৮.৬ শতাংশ ভোট। অর্থাত্ ১০ শতাংশের ফারাক। এবারে কংগ্রেস ওই জোটে নেই। একক ভাবে লড়ছে। জোটের পক্ষে যে ৮.৬ শতাংশ ভোট গিয়েছিল, সেই ভোট কি বিজেপি-র দিকে যেতে পারে? আসলে অঙ্কটা এত সহজ নয়।
লোকসভা ভোটের প্যাটার্ন যা বলছে
২০২১ সালের বিধানসভা ভিত্তিক ফলাফলের প্যাটার্ন বলছে, রাজ্যের ২৯৪ টি বিধানসভার মধ্যে গেরুয়া শিবির ৬০-৬৫টি কেন্দ্রে ধারাবাহিক ভাবে জিততে পেরেছে। এর মধ্যে ২০ থেকে ২৫টি আসন রয়েছে, যেখানে বিজেপি গত তিনটি বড় নির্বাচনে ২০ হাজারের বেশি ভোটের ব্যবধানে লিড নিয়েছে অথবা জয়ী হয়েছে। ৯০ শতাংশের বেশি হিন্দু ভোটার রয়েছে, রাজ্যের এমন ৪৯টি বিধানসভা কেন্দ্রে ২০২৪ সালের লোকসভা নির্বাচনের ফলাফল অনুযায়ী তৃণমূল কংগ্রেস ২৯টি আসনে লিড পেয়েছে।
পশ্চিমবঙ্গে রাজনৈতিক নেতৃত্বের শীর্ষে উচ্চবর্ণের আধিপত্য
একটি বিষয় খেয়াল রাখতে হবে, পশ্চিমবঙ্গে কিন্তু জাতপাতের রাজনীতি অতীতে ছিল না। পশ্চিমবঙ্গের মোট জনসংখ্যার প্রায় ২৩.৫ শতাংশ তফসিলি জাতি (SC), প্রায় ১৬ শতাংশ অন্যান্য অনগ্রসর শ্রেণি (OBC) এবং প্রায় ৫.৮ শতাংশ তফসিলি উপজাতি (ST)। এর পাশাপাশি সংখ্যালঘু জনগোষ্ঠীর সংখ্যা প্রায় ২৭ শতাংশ। যদিও মমতার দাবি অনুযায়ী, এটি ৩৩ শতাংশ। কিন্তু এত বড় অংশ জনসংখ্যা থাকা সত্ত্বেও রাজ্যের রাজনৈতিক নেতৃত্বের শীর্ষে ঐতিহাসিকভাবে দেখা গিয়েছে উচ্চবর্ণের আধিপত্যই বেশি। পশ্চিমবঙ্গের প্রায় সব মুখ্যমন্ত্রী এবং অধিকাংশ গুরুত্বপূর্ণ মন্ত্রীই উচ্চবর্ণ সম্প্রদায় থেকে এসেছেন।
তবে গত কয়েক বছরে এই সমীকরণ ধীরে ধীরে বদলাতে শুরু করেছে। দীর্ঘদিন প্রান্তিক অবস্থায় থাকা বিভিন্ন সম্প্রদায়, যেমন মতুয়া, রাজবংশী এবং কুর্মি, এখন রাজনৈতিক প্রতিনিধিত্বের দাবিতে আরও সরব হচ্ছে। এই সম্প্রদায়গুলির দাবি শুধু সামাজিক স্বীকৃতির মধ্যে সীমাবদ্ধ নেই। তারা চাইছে প্রশাসন ও রাজনীতির সিদ্ধান্ত গ্রহণের স্তরেও নিজেদের উপস্থিতি নিশ্চিত করতে।
২০২১ সালে ৫০ শতাংশ হিন্দু ভোটব্যাঙ্ক বিজেপি-র
পশ্চিমবঙ্গে বিজেপি যতই হিন্দুত্বের ধ্বজা তুলে ভোটবাক্স ভরানোর চেষ্টা করুক, দেখা যাচ্ছে, ২০২১ সালে ৫০ শতাংশ হিন্দু ভোটব্যাঙ্ক বিজেপি-র পক্ষে গিয়েছে। এমনকী ২০১৯ সালের লোকসভায় খুব ভাল রেজাল্ট হলেও, ভোট শতাংশের নিরিখে হিন্দু ভোট বেড়ে হয়েছিল ৫৭ শতাংশ। অর্থাত্ বাকি হিন্দু ভোট বেশিরভাগই তৃণমূলের দিকে গিয়েছে।