
বিধানসভা নির্বাচনের নির্ঘণ্ট ঘোষণা হয়ে গিয়েছে। প্রার্থীও ঘোষণা হয়ে গিয়েছে। আর এই আবহে বাংলার প্রতিটি কেন্দ্রেই ভোটের আগুন চড়ছে। ব্যতিক্রম নয় মানিকতলাও। বাংলা বিধানসভা ভোটে অন্যতম হাইপ্রফাইল এই কেন্দ্র। এখানে তৃণমূল প্রার্থী শ্রেয়া পাণ্ডের সঙ্গে লড়াই বিজেপির তাপস রায়ের। এই লড়াইয়ে মিশে আছে পারিবারিক সম্পর্কের অতীত। এই কেন্দ্রে ২০১১ থেকে ২০২১ টানা তিনবার ঘাসফুল ফুটিয়েছিলেন সাধন পাণ্ডে। সাধন পাণ্ডের একসময়ের রাজনৈতিক সতীর্থ তথা দীর্ঘদিনের পরিচিত তাপস রায় এখন পদ্মশিবিরের সৈনিক। অন্যদিকে প্রয়াত হেভিওয়েট নেতা সাধন পাণ্ডের মেয়ে শ্রেয়া পাণ্ডে লড়ছেন ঘাসফুল প্রতীকে। উত্তর কলকাতার এই কেন্দ্রটি কার্যত ' প্রেস্টিজ ফাইটে' পরিণত হয়েছে দুই শিবিরের কাছেই।
তাপস রায় মানিকতলার অলিগলি হাতের তালুর মতো চেনেন। দীর্ঘ কয়েক দশক ধরে তিনি উত্তর কলকাতার রাজনীতির সঙ্গে যুক্ত। ফলে এলাকার সাংগঠনিক শক্তি এবং সাধারণ মানুষের নাড়ির স্পন্দন তিনি ভালোই বোঝেন। কিন্তু এবার পরিস্থিতি ভিন্ন। শ্রেয়া পাণ্ডের শক্তির মূল উৎস তাঁর বাবার দীর্ঘদিনের উত্তরাধিকার এবং এলাকার মানুষের সঙ্গে তাঁর ব্যক্তিগত আবেগীয় সংযোগ। সাধন পাণ্ডে ছিলেন মানিকতলার অবিসংবাদিত নেতা, আর সেই আবেগকেই হাতিয়ার করে ভোট বৈতরণী পার হতে চাইছে তৃণমূল। বিজেপি প্রার্থী তাপস রায়ের কাছে বড় চ্যালেঞ্জ হলো তৃণমূলের এই 'আবেগ' কার্ডকে ব্যর্থ করা। দলীয় সূত্রে খবর, তাপস রায় এবার মানিকতলায় উন্নয়নের বকেয়া কাজ এবং রাজ্য সরকারের বিরুদ্ধে দুর্নীতির অভিযোগকে প্রধান অস্ত্র হিসেবে ব্যবহার করতে চাইছেন। অন্যদিকে, শ্রেয়া পাণ্ডে তাঁর বাবার আদর্শ এবং মমতা বন্দ্যোপাধ্যায়ের জনমুখী প্রকল্পগুলিকে সামনে রেখে প্রচার চালাচ্ছেন। চেনা মাঠে এই 'মেগাফাইট' এখন কার দিকে হেলে, সেটাই দেখার অপেক্ষায় রয়েছেন রাজনৈতিক বিশ্লেষকরা।
মানিকতলা কেন্দ্রে এসআইআরের আগে মোট ভোটার ছিলেন ২ লক্ষ ৮ হাজার ৭৯৯ জন। সংশোধনের পর যোগ-বিয়োগে ভোটার সংখ্যা ১ লক্ষ ৬৪ হাজার ১৪৫ জন। এসআইআরের প্রভাব মাথায় রেখেই ভোটের অঙ্ক কষছেন প্রার্থীরা। প্রসঙ্গত, প্রয়াত রাজনীতিক সাধন পাণ্ডের সঙ্গে তাপসের যোগাযোগ ছিল সেই ৭০-এর দশক থেকে। দু’জনেই প্রথমে কংগ্রেস এবং পরে তৃণমূলে একসঙ্গে দীর্ঘ দিন কাজ করেছেন। ২০২২ সালের ফেব্রুয়ারি মাসে মানিকতলার বিধায়ক সাধন প্রয়াত হন। পরে ওই আসনের উপনির্বাচনে তৃণমূল প্রার্থী হিসাবে জয়ী হন স্ত্রী সুপ্তি। আর ২০২৪ সালের লোকসভা নির্বাচনের আগে তাপস তৃণমূল ছেড়ে বিজেপিতে যোগদান করেন।
সাধন পাণ্ডে ও তাপস রায়- উভয়েই ছাত্র রাজনীতি থেকে উঠে এসেছেন এবং দীর্ঘদিন তৃণমূল কংগ্রেসে সহকর্মী ছিলেন। উত্তর কলকাতার রাজনীতিতে দুজনেই ছিলেন অত্যন্ত প্রভাবশালী মুখ। রাজনৈতিক মহলে এটি পরিচিত যে, উত্তর কলকাতায় সাধন পাণ্ডে ও তাপস রায়ের মধ্যে আধিপত্যে কখনও কখনও ঠান্ডা লড়াইও হয়েছে। সাধন পাণ্ডে যখন মানিকতলার বিধায়ক ছিলেন, তখন তাপস রায় ছিলেন পাশের কেন্দ্র বরাহনগরের বিধায়ক।
২০২১ সালে এই কেন্দ্রে বিজেপির কল্যাণ চৌবেকে ২০,২৩৮ ভোটে পরাজিত করেছিলেন সাধন পাণ্ডে। ২০২৪ সালের উপনির্বাচনে সুপ্তি পাণ্ডে জেতেন ৬২,৩১২ ভোটে। সেবার তৃণমূলের ভোট বেড়েছিল ২০.৮৩ শতাংশ। অন্যদিকে বিজেপির ভোট কমেছিল ১৭.৬৭ শতাংশ। তবে মা সুপ্তির তুলনায় এবার শ্রেয়ার লড়াইটা অনেকটাই কঠিন। কারণ প্রতিপক্ষ দুঁদে রাজনীতিক। তবে এখনও পর্যন্ত সৌজন্য বজায় রেখেছে দুপক্ষই। রবিবার প্রচারের মাঝে সুপ্তি ও তাপসের মধ্যে সৌজন্য সাক্ষাৎও হয়। তাপস বলছেন, 'সৌজন্যই বাংলার ঐতিহ্য। এটাই বাংলার সংস্কৃতি। এটাই বাংলার পরম্পরা। যে কোনও কারণেই হোক সেটা এখন উধাও হয়ে গিয়েছে।' অন্যদিকে শ্রেয়া পাণ্ডে বলছেন, 'আমার মাটিতে আমি লড়ছি। বিজেপি শুধু পোস্টার ব্যানারে থাকে।' অন্য দিকে, সুপ্তি পাণ্ডে বলছেন, ‘ভোটের লড়াই নিজের জায়গায় থাকলেও মানুষের মধ্যে সম্পর্ক ও সৌজন্য বজায় থাকাটা গুরুত্বপূর্ণ। রাজনৈতিক মতপার্থক্য রয়েছে, তবে তাপসের সঙ্গে ব্যক্তিগত সম্পর্কে প্রভাব পড়বে না।’