Advertisement

Mamata Banerjee: মুসলিম ফ্যাক্টর এখনও TMC-র 'ট্রাম্প কার্ড', BJP-র কোনও স্ট্র্যাটেজিতেই শিকে ছিঁড়বে না

পশ্চিমবঙ্গের নির্বাচনে বহু বছর ধরেই মুসলিম ফ্যাক্টর তৃণমূলের জন্য একটি বড় ‘ট্রাম্প কার্ড’। মমতার তোষণ রাজনীতি নিয়ে BJP যতই সমালোচনা করে সরব হোক না কেন, মমতা তাতে খুব একটা আমল দেন না। কী ভাবে মুসলিমদের 'ভরসার ডোজ' হয়ে উঠলেন দিদি?

মমতা বন্দ্যোরাধ্যায়মমতা বন্দ্যোরাধ্যায়
ধীরেন্দ্র রাই
  • কলকাতা ,
  • 17 Mar 2026,
  • अपडेटेड 11:08 AM IST
  • মুসলিম ফ্যাক্টর তৃণমূলের জন্য একটি বড় ‘ট্রাম্প কার্ড’
  • BJP-র কোনও চালই কাজ করবে না বাংলায়?
  • কী ভাবে মুসলিমদের 'ভরসার ডোজ' হয়ে উঠলেন দিদি?

মমতা বন্দ্যোপাধ্যায়ের 'বিশেষ কমিউনিটি' মন্তব্য ঘিরে তোলপাড় রাজ্য রাজনীতি। এই সাম্প্রতিক মন্তব্যকে তোষণ রাজনীতি বলে কংগ্রেস ও বামপন্থীরা যতই সমালোচনা করুক বা BJP যতই প্রতিবাদ করুক, তাতে তৃণমূল কংগ্রেসের খুব একটা ভ্রুক্ষেপ নেই। পশ্চিমবঙ্গের নির্বাচনে বহু বছর ধরেই মুসলিম ফ্যাক্টর তৃণমূলের জন্য একটি বড় ‘ট্রাম্প কার্ড’।

২০১১ সাল থেকে এই রাজ্যের ক্ষমতায় থাকা মমতা বন্দ্যোপাধ্যায় এমন এক রাজনৈতিক সমীকরণ তৈরি করেছেন, সংখ্যাগরিষ্ঠতা পাওয়ার জন্য তাঁকে রাজ্যের প্রায় ২৫ শতাংশ আসনেই বেশি জোর দিতে হয়। বাকি প্রায় ২৫ শতাংশ (মুসলিম সংখ্যাগরিষ্ঠ) অনেক ক্ষেত্রেই স্বাভাবিকভাবেই তাঁর দিকে ঝুঁকে পড়ে। উল্লেখ্য, পশ্চিমবঙ্গে মুসলিম জনসংখ্যা প্রায় ২৭ শতাংশ।

২০১১ সালের আগে বাংলার মুসলিম ভোট মূলত বামফ্রন্ট ও কংগ্রেসের মধ্যে ভাগ হয়ে যেত। মমতা সেই ভোটব্যাঙ্ককে ধীরে ধীরে নিজের দিকে টেনে আনেন। ২০১১ সালের নির্বাচনের আগে সাচার কমিটির রিপোর্টকে তিনি বড় রাজনৈতিক অস্ত্র হিসেবে ব্যবহার করেন। তিনি বারবার বলেন, ৩৪ বছরের বাম শাসনে মুসলিমদের অবস্থা দলিতদের থেকেও খারাপ হয়ে গিয়েছিল। ধীরে ধীরে তিনি মুসলিমদের কণ্ঠস্বর হয়ে ওঠেন।

এরপর আসে সিঙ্গুর-নন্দীগ্রামের আন্দোলন। সেই আন্দোলনে নিহত বা বাস্তুচ্যুতদের মধ্যে বহু মুসলিম কৃষকও ছিলেন। মমতা তাদের পাশে দাঁড়িয়ে নিজেকে তাদের ‘রক্ষক’ হিসেবে প্রতিষ্ঠা করেন। এর ফলস্বরূপ কংগ্রেস ও বামপন্থী শিবিরের অনেক কর্মী ধীরে ধীরে তৃণমূলে চলে আসেন। এরপর মুসলিম অধ্যুষিত আসনগুলিতে তৃণমূলের শক্ত অবস্থান তৈরি হয়, যা অনেকটাই মমতার নীতি, বক্তব্য এবং রাজনৈতিক কৌশলের ফল।

মমতা শুধু বক্তব্যই দেননি, তিনি মাটির স্তরে এমন কিছু প্রকল্পও চালু করেছেন যাতে মুসলিম সমাজের সঙ্গে সরাসরি সংযোগ তৈরি হয়েছে। ২০১২ সালে ইমামদের জন্য মাসিক ভাতা চালু করা একটি বড় মোড় ঘোরানো সিদ্ধান্ত ছিল। যদিও এটি নিয়ে বিতর্ক হয়েছিল, তবুও মুসলিম ধর্মীয় নেতৃত্বের মধ্যে মমতার গ্রহণযোগ্যতা বাড়ায়।

Advertisement

এর পাশাপাশি তিনি মাদ্রাসা আধুনিকীকরণ কর্মসূচি চালু করেন এবং ‘ঐক্যশ্রী’ বৃত্তি ও ‘কন্যাশ্রী’ প্রকল্পের সুবিধা বিপুলভাবে মুসলিম মেয়েদের কাছে পৌঁছে দেন। ২০২৬ সালের নির্বাচনের আগে অন্তর্বর্তী বাজেটে সংখ্যালঘু বিষয়ক খাতে ৫৭১৩ কোটি টাকা বরাদ্দ করা হয়েছে। এর ফলে মুসলিম সমাজের মধ্যে একটি নতুন মধ্যবিত্ত শ্রেণি তৈরি হয়েছে, যারা তৃণমূলের দৃঢ় সমর্থক বলে মনে করা হয়।

মমতা বন্দ্যোপাধ্যায়ের মাথায় ওড়না দিয়ে ইফতার পার্টিতে যোগ দেওয়া বা মঞ্চে দাঁড়িয়ে দোয়া পড়া কেবল ‘ইভেন্ট’ ছিল না। এটি ছিল সেই সম্প্রদায়কে সম্মান জানানোর একটি প্রতীকী উপায়, যাকে BJP 'তোষণ' বলে অভিহিত করে। অনেক মুসলিম ভোটারের মনে হয়েছে, প্রথমবার কোনও মুখ্যমন্ত্রী তাদের সংস্কৃতি ও রীতিকে প্রকাশ্যে স্বীকৃতি দিচ্ছেন।

বিভিন্ন সময়ে হিন্দু ও মুসলিম উৎসবকে কেন্দ্র করে উত্তেজনা তৈরি হলেও মমতার বিরুদ্ধে মুসলিমদের দিকে ঝুঁকে থাকার অভিযোগ উঠেছে। কিন্তু তিনি তাতে খুব একটা গুরুত্ব দেননি। 

পশ্চিমবঙ্গে BJP প্রধান বিরোধী শক্তি হয়ে ওঠাও মমতার রাজনৈতিকভাবে সুবিধা করেছে। যখন বিজেপি ‘জয় শ্রী রাম’ স্লোগান বা NRC ইস্যু সামনে আনে, তখন অনেক মুসলিম ভোটারের কাছে মমতা ছাড়া বিকল্প ছিলই না। ফলে তারা আরও বেশি করে তৃণমূলের দিকে ঝুঁকে পড়ে। মমতা এই পরিস্থিতিকেই রাজনৈতিক ভাবে কাজে লাগান। 

তাঁর সাম্প্রতিক বক্তব্য, 'আমরা আছি বলেই আপনারা নিরাপদ' এই কৌশলেরই অংশ বলে অনেক বিশ্লেষক মনে করেন। তিনি বার্তা দিতে চান, তৃণমূল দুর্বল হলে NRC বা CAA-এর মতো বিষয় আবার সামনে আসতে পারে। BJP যত বেশি মেরুকরণের চেষ্টা করে, মুসলিম ভোট তত বেশি মমতার পক্ষে একজোট হয়ে যায়।

বিশ্লেষকদের মতে, তৃণমূল এমন একটি কৌশল নিয়েছিল যাতে BJP-র ‘ভয়’ বজায় থাকে এবং একই সঙ্গে বামপন্থীরা প্রধান বিরোধী শক্তি হয়ে উঠতে না পারে। নেতৃত্বের সংকটে থাকা বাম দলগুলোও সেই সুযোগ কাজে লাগাতে পারেনি।

পরিসংখ্যান দেখলে বোঝা যায়, মুসলিম অধ্যুষিত এলাকায় তৃণমূলের জয়ের হার বেশ উল্লেখযোগ্য। ২০১১ ও ২০১৬ সালে মুসলিম ভোট কংগ্রেস ও তৃণমূলের মধ্যে ভাগ হলেও মমতা এগিয়ে ছিলেন। কিন্তু ২০২১ সালের নির্বাচন একটি বড় মোড় ঘোরানো ঘটনা হয়ে দাঁড়ায়। BJP-র শক্তিশালী প্রচারের মুখে বাংলার মুসলিম ভোটাররা কংগ্রেস ও ISF-কে প্রায় সম্পূর্ণভাবে পাশে সরিয়ে দেন।

প্রায় ৮৫টি আসনে যেখানে মুসলিম ভোট অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ, তার মধ্যে ৭৫টিতেই তৃণমূল জয় পায়। মুর্শিদাবাদের ২২টির মধ্যে ২০টি, মালদার ১২টির মধ্যে ৮টি, উত্তর দিনাজপুরের ৯টির মধ্যে ৭টি, বীরভূমের ১১টির মধ্যে ১০টি এবং দক্ষিণ ২৪ পরগনার ৩১টির মধ্যে ৩০টি আসন তৃণমূলের দখলে যায়। কংগ্রেস ও বামপন্থীরা প্রায় অদৃশ্য হয়ে যায়।

BJP কিছু আসন জিতলেও মুসলিম অধ্যুষিত এলাকায় তেমন সাফল্য পায়নি। ২০২৬ সালের নির্বাচনের জন্য মমতা ইতিমধ্যেই রাজনৈতিক সমীকরণ সাজিয়ে রেখেছেন। ২৯৪ আসনের বিধানসভায় সংখ্যাগরিষ্ঠতার জন্য দরকার ১৪৮টি আসন। এর মধ্যে প্রায় ৭৫টি আসনে মুসলিম জনসংখ্যা এতটাই বেশি যে সেখানে BJP-র জেতা খুব কঠিন বলে মনে করা হয়।

মমতার সমীকরণ তাই অনেকটাই সরল। মুসলিম ভোটের ভিত্তিতে ৭৫টি আসন নিশ্চিত করা এবং বাকি ৭৫টি আসন নারী ভোটার ও ‘লক্ষ্মীর ভাণ্ডার’-এর মতো সামাজিক প্রকল্পের মাধ্যমে জয়ের চেষ্টা করা।

তার সামনে হুমায়ুন কবীর বা আসাদউদ্দিন ওয়াইসির মতো কিছু ছোটখাটো চ্যালেঞ্জ থাকতে পারে, কিন্তু আপাতত তাদের প্রভাব খুব বড় বলে মনে হচ্ছে না।

সমালোচকরা বলেন, মমতা মুসলিমদের কেবল ‘ভোটব্যাঙ্ক’ হিসেবে ব্যবহার করেছেন। কিন্তু অনেক পর্যবেক্ষকের মতে বাংলার মুসলিম ভোটাররা মমতাকে নিজেদের ‘ঢাল’ হিসেবেই দেখেন।

Advertisement

গত প্রায় ১৫ বছরে মমতা বন্দ্যোপাধ্যায় মুসলিম রাজনীতিকে শুধু ভোটের সমীকরণ থেকে সরিয়ে অনেকের কাছে ‘অস্তিত্বের প্রশ্ন’-এর রূপ দিয়েছেন। বর্তমানে পশ্চিমবঙ্গে BJP-র বিরুদ্ধে মুসলিম ভোট একটি শক্ত প্রাচীরের মতো দাঁড়িয়ে আছে, যা ভাঙা কোনও বিরোধী দলের পক্ষেই সহজ নয়।

 

Read more!
Advertisement
Advertisement