
ছাব্বিশের নির্বাচন যে এবার আর একতরফা হবে না, তা কার্যত স্পষ্ট হয়ে উঠেছে। কারণ উত্তরবঙ্গ পার করে রাজ্যের একাধিক এলাকায় নিজেদের ক্ষমতা বৃদ্ধির দাবি করছে বিজেপি। অন্যদিকে হাল ছাড়ার মানুষই নন মমতা বন্দ্য়েপাধ্যায়। ফলে ছাব্বিশের নির্বাচন কাঁটার টক্কর হতে চলেছে বলে মনে করছেন বাংলার রাজনৈতিক বিশেষজ্ঞরা।
আর এই কাঁটার টক্করে বড় ভূমিকা রাখতে পারে জঙ্গলমহল। এমনিতে বাংলার জঙ্গলমহলে বিজেপির বেশ ভালোই প্রভাব রয়েছে। কিন্তু গত পঞ্চায়েত নির্বাচনে তা বেশ কিছুটা ফিকে হয়ে গিয়েছে। ফলে এবারের নির্বাচন বিজেপির জন্য কিছুটা জমি পুনর্দখলের লড়াইও বটে। জঙ্গলমহলে থাকা মোট ৪০টি বিধানসভা আসন নিয়ে বিজেপির কী পরিকল্পনা?
জঙ্গলমহলে বিজেপি আদিবাসী এবং কুর্মি উভয় সম্প্রদায়কেই আকৃষ্ট করার একটি পরিকল্পনা বাস্তবায়ন করছে। পুরুলিয়া , বাঁকুড়া , ঝাড়গ্রাম এবং পশ্চিম মেদিনীপুর জেলা নিয়ে গঠিত জঙ্গল মহল অঞ্চলে প্রায় ৬ থেকে ৮ শতাংশ আদিবাসী এবং প্রায় ৩০ শতাংশ কুর্মি সম্প্রদায়ের বসবাস। ফলে এখানকার ভোটের ইস্যুর সঙ্গে রাজ্যের অন্য এলাকার ভোটের ইস্যু গুলিয়ে দিলে চলবে না। সেই কারণেই বিজেপি নেতারা জঙ্গলমহলের জন্য় আলাদা পরিকল্পনা করেছেন।
সম্প্রতি, দুর্গাপুরে অনুষ্ঠিত একটি উচ্চ-পর্যায়ের বৈঠকে এই জঙ্গলমহল জয়ের ব্লু প্রিন্ট তৈরি করেছে পদ্ম শিবির। এই বৈঠকের পর বিজেপি এলাকার জল সংকট, মাফিয়া, বিশেষ করে বালি মাফিয়া, তফসিলি উপজাতিদের (ST) জমি অবৈধভাবে দখল, ভুয়ো SC-ST সার্টিফিকেট চক্র, আদিবাসী যুবকদের ইঞ্জিনিয়ারিং ও শিক্ষকতার চাকরি না দেওয়া, সিন্ধ্রি ও রঘুনাথপুর -১ এর মতো গ্রামীণ স্বাস্থ্যকেন্দ্র বন্ধ করে দেওয়া এবং হাসপাতালে চিকিৎসকের তীব্র ঘাটতির মতো বিষয়গুলো উত্থাপন করার সিদ্ধান্ত নিয়েছে। বিজেপি মনে করছে, এই রাস্তায় হাঁটলে বাংলায় জঙ্গলমহলে ফের একবার পদ্ম ফুটতে পারে। ইতিমধ্যেই বিজেপির নীচু স্তরের কর্মী ও নেতারা বাড়ি বাড়ি গিয়ে আদিবাসী ও কুর্মি সম্প্রদায়ের মানুষকে এই বিষয়গুলি সম্পর্কে বোঝানোর পরিকল্পনাও নিয়ে ফেলেছেন বলে জানা গিয়েছে।
তবে জঙ্গলমহলে জয় পাওয়া যে সহজ হবে না, তাও বিলক্ষণ জানে গেরুয়া শিবির। এর কারণ বুঝতে হলে জঙ্গলমহলের অঙ্কটা বুঝতে হবে। পশ্চিমবঙ্গের চারটি জেলা- পুরুলিয়া, বাঁকুড়া, পশ্চিম মেদিনীপুর এবং ঝাড়গ্রামের ২১টি ব্লক জঙ্গলমহল নামে পরিচিত। একসময় বামদের শক্ত ঘাঁটি এবং মাওবাদ দ্বারা প্রভাবিত এই এলাকাটি ২০১১ সালের বিধানসভা নির্বাচনের পর তৃণমূল কংগ্রেসের দখলে আসে।
২০১৮ সালের পঞ্চায়েত ভোটে জঙ্গলমহলে প্রথম পদ্ম ফোটে। ২০১৯ সালের লোকসভা নির্বাচনেও জঙ্গলমহলে ভাল ফল করেছিল বিজেপি। লার ৪২টি লোকসভা আসনের মধ্যে ১৮টির দখল নিয়েছিল পদ্মশিবির। তার মধ্যে ছিল জঙ্গলমহলের জেলাগুলির আসনও। এরপর ২০২১ সালের বিধানসভা ভোটে জঙ্গলমহলে ৪০টি বিধানসভার মধ্যে ১৬টির দখল নিয়েছিল বিজেপি। যা মোটেই খুব খারাপ নয়। কিন্তু, ২০২৩ সালে পঞ্চায়েত নির্বাচনে খারাপ পারফরম্যান্স করে পদ্ম শিবির। ২০২৪ সালের লোকসভাতেও সেই ধারাই অব্যাহত রাখে বিজেপি। ফলে এবার শুভেন্দুদের জোর লড়াই করা ছাড়া আপ উপায় নেই।
অন্যদিকে, ২০১১ সালের আগে এই এলাকাগুলোতে মাওবাদ চরমে ছিল। ক্ষমতায় আসার পর মমতা ব্যানার্জী মাওবাদীদের বিরুদ্ধে কঠোর ব্যবস্থা নেন। কিষেনজীও সংঘর্ষে নিহত হন। মাও দাপট কমার পর এই এলাকার সড়ক থেকে শুরু করে মানুষের জীবনযাত্রার ভোল পাল্টাতে বেশ কয়েকটি গুরুত্বপূর্ণ পদক্ষেপ নেয় তৃণমূল কংগ্রেস। সেই কাজের কৃতিত্ব নিতেও মমতা বন্দ্য়োপাধ্যায় কখনই ভোলেনও না। তিনি সবসময়ই বলেন, তাঁর সরকার ক্ষমতায় আসার পরেই জঙ্গলমহল আসছে। আর বেশ কিছুটা জনমত যে এক্ষেত্রে তৃণমূলের দিকেও রয়েছে তাতে কোনও সন্দেহ নেই। ফলে এই ৪০টি সিট নিয়ে লড়াই এবার একেবারে কাঁটায় কাঁটায়। আদৌ কি ভালো ফল করতে পারবে বিজেপি?