
আগামীকাল, বৃহস্পতিবার বাংলাদেশের জন্য এক ঐতিহাসিক দিন হতে চলেছে। ২০২৪ সালের জুলাই-অগাস্টের উত্তাল আন্দোলনে প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা ক্ষমতাচ্যুত ও দেশ ছাড়ার পর এই প্রথম দেশ নতুন সরকার গঠনের লক্ষ্যে ভোট দেবে। তবে এই নির্বাচন শুধু ক্ষমতার পালাবদল নয়, ভোটাররা নির্ধারণ করবেন তথাকথিত ‘জুলাই সনদ’-এর ভবিষ্যৎও, যা সংবিধানে বড় ধরনের পরিবর্তনের প্রস্তাব রাখছে।
তারেক রহমানের নেতৃত্বাধীন বাংলাদেশ জাতীয়তাবাদী দল (বিএনপি)কে শুরুতে এগিয়ে থাকা দল হিসেবে ধরা হচ্ছিল। কিন্তু প্রাক্তন মিত্র, শফিকুর রহমানের নেতৃত্বে পুনরুজ্জীবিত জামাতে ইসলামী এখন চমক দেখাতে পারে। এমন আভাস দিচ্ছে একাধিক সমীক্ষা।
ঢাকা-ভিত্তিক রাজনৈতিক বিশ্লেষক ড্যানিয়েল রহমান বলেন, 'আগে আলোচনা হতো বিএনপি জিতবে কি না তা নিয়ে নয়, বরং কত ব্যবধানে জিতবে তা নিয়ে। ২৫০ না ২৮০ আসন, এটাই ছিল প্রশ্ন। এখন জরিপে বিএনপি ও জামায়াতের মধ্যে হাড্ডাহাড্ডি লড়াইয়ের পূর্বাভাস মিলছে, তাই উত্তেজনা অনেক বেড়েছে।'
এই নির্বাচন হচ্ছে নিষিদ্ধ ঘোষিত আওয়ামী লিগকে বাদ দিয়েই। অথচ দলটির এখনও ৩০-৪০ শতাংশ সমর্থন রয়েছে বলে ধারণা করা হয়। ফলে রাজনৈতিক পরিবেশ অত্যন্ত উত্তপ্ত। প্রায় অর্ধেক ভোটকেন্দ্র উচ্চ বা মাঝারি সতর্কতায় রয়েছে। নিবন্ধিত আগ্নেয়াস্ত্রের একটি বড় অংশ এখনও জমা পড়েনি। রাজনৈতিক হামলা, গুলিবর্ষণ ও অস্থিরতা প্রায় নিত্যদিনের ঘটনা। তার ওপর রয়েছে পুলিশের জনবল সঙ্কট। এই প্রেক্ষাপটে সামান্য ব্যবধানই হয়ে উঠতে পারে ফল নির্ধারণের চাবিকাঠি, বিশেষ করে যখন প্রায় অর্ধেক ভোটার এখনও সিদ্ধান্তহীন।
১. সিদ্ধান্তহীন ভোটাররা ফল ঘুরিয়ে দিতে পারে
বিভিন্ন জরিপে দেখা যাচ্ছে, উল্লেখযোগ্য সংখ্যক ভোটার এখনও সিদ্ধান্ত নেননি কাকে ভোট দেবেন। ইন্টারন্যাশনাল রিপাবলিকান ইনস্টিটিউটের এক জরিপে ৭% ভোটার নিজেদের সিদ্ধান্তহীন বলে জানিয়েছেন, ১১% মত জানাতে অস্বীকার করছেন। প্রথম আলোর সমীক্ষায় প্রায় ১৭% ভোটার বলেছেন, তারা এখনও সিদ্ধান্ত নেননি। ব্র্যাক ইনস্টিটিউটের এক সমীক্ষায় দেখা গেছে, প্রায় ৪৮.৫% উত্তরদাতা একসময় নিজেদের অনিশ্চিত বলেছেন। যা রাজনৈতিক অস্থিরতার ইঙ্গিত দেয়।
এই ‘তারল্য’ বা অনিশ্চয়তা নির্বাচনের ফল আমূল বদলে দিতে পারে। কারণ বাংলাদেশে প্রতি আসনে ভোটারের সংখ্যা গড়ে প্রায় ৪ লক্ষ। ফলে কয়েক হাজার ভোট এদিক-ওদিক হলেই ফল উল্টে যেতে পারে। বিশেষ করে তরুণ ভোটার এবং হাসিনা-পরবর্তী রাজনৈতিক বাস্তবতায় হতাশ নাগরিকদের একটি বড় অংশ এখনও মনস্থির করেননি। যে দল এই ভোটারদের শেষ মুহূর্তে সংগঠিত করতে পারবে, তারাই বাড়তি সুবিধা পেতে পারে।
২. কম ভোটার উপস্থিতি: জামাতের পক্ষে যেতে পারে সমীকরণ
ভোট দিতে নিজ নিজ এলাকায় ফিরতে মানুষের উৎসাহ চোখে পড়ার মতো হলেও নির্বাচন কমিশনের মহড়া ভিন্ন চিত্র দেখাচ্ছে। ভোটারদের স্বাভাবিকের তুলনায় অনেক বেশি সময় লাগছে ভোট দিতে। কারণ একইসঙ্গে নির্বাচন ও গণভোট, দু’টির প্রক্রিয়া সম্পন্ন করতে হচ্ছে। একাধিক রিপোর্ট বলছে, ধীরগতির ভোটগ্রহণে লাইনে দীর্ঘ অপেক্ষা, ক্লান্তি ও বিরক্তির কারণে অনেকেই ভোট না দিয়ে ফিরে যেতে পারেন।
বাংলাদেশ ইনস্টিটিউট অফ ডেমোক্রেসি অ্যান্ড ডেভেলপমেন্টের বিশ্লেষণ অনুযায়ী:
ভোটার উপস্থিতি যদি ৬৫-৬৮% থাকে, তাহলে বিএনপি নেতৃত্বাধীন জোট সুবিধা পেতে পারে। কিন্তু উপস্থিতি যদি ৫৩-৫৮%-এ নেমে যায়, তাহলে লাভবান হতে পারে জামায়াত নেতৃত্বাধীন জোট। কম ভোটদান সাধারণত সেই দলগুলোর পক্ষে যায় যাদের শক্ত ক্যাডারভিত্তিক সংগঠন রয়েছে। এই জায়গায় জামায়াতের সাংগঠনিক শৃঙ্খলা বড় ফ্যাক্টর হতে পারে।
৩. নারী ও প্রবীণ ভোটারদের অনীহা: নির্ধারক হয়ে উঠতে পারে
ধীর ভোটপ্রক্রিয়া, নিরাপত্তা নিয়ে শঙ্কা এবং রাজনৈতিক হিংসার আবহ, এই সব মিলিয়ে মহিলা ও প্রবীণ ভোটারদের অংশগ্রহণ কমতে পারে বলে আশঙ্কা রয়েছে। এক সমীক্ষায় দেখা গেছে, ভোট দেওয়ার ইচ্ছা প্রকাশ করা মহিলার হার কয়েক মাসে উল্লেখযোগ্যভাবে কমেছে। যদি ভোটের দিন উত্তেজনা বা হিংসা ছড়ায়, তাহলে এই শ্রেণির ভোটারদের বড় অংশ বুথে নাও যেতে পারেন।