
বাংলাদেশ নির্বাচনের ফলাফল প্রকাশ হওয়ার পর থেকেই ভারতের দৃষ্টিভঙ্গি থেকে নানা কাটাছেঁড়া চলবে। কোন কোন ক্ষেত্রে কী প্রভাব পড়তে পারে, আগামী দিনে দুই দেশের সম্পর্ক কোথায় দাঁড়াতে পারে, তা নিয়েও হিসেবনিকেশ শুরু হয়ে গিয়েছে। তার মধ্যেই কিছুটা মাথাব্যথার কারণ হয়ে পারে জামাত-ই-ইসলামি। পরাজিত হয়েও কীভাবে ভারতের জন্য চিন্তার কারণ হতে পারে এই দল?
২৯৯ আসনের বাংলাদেশ সংসদ নির্বাচনে BNP বিপুল ভোটে জয় পেয়েছে। তারেক রহমানের নেতৃত্বে BNP দুই শতাধিক আসন জিতেছে। অন্যদিকে, বিরোধী জামাত-ই-ইসলামি এবং তার জোটসঙ্গীরা মাত্র ৬৮টি আসন পেয়েছে। তবে দু'টি গুরুত্বপূর্ণ বিভাগে জামাত উল্লেখযোগ্য সাফল্য করে। রংপুর বিভাগ এবং খুলনা বিভাগ। উভয় অঞ্চলই ভারতের সীমান্তবর্তী। রংপুর ভারতে চিকেনস নেক নামে পরিচিত শিলিগুড়ি করিডোরের কাছে অবস্থিত। যা উত্তর পূর্বের ৭টি রাজ্যকে ভারতের বাকি অংশের সঙ্গে সংযুক্ত করে। খুলনা পশ্চিমবঙ্গের ২৪ পরগনার সংলগ্ন। জামাত এই দু'টি বিভাগের মধ্যে অবস্থিত রাজশাহী বিভাগেও বেশ কয়েকটি আসন জিতেছে। সামগ্রিক ভাবে জামাত পশ্চিমবঙ্গ সীমান্তবর্তী সমগ্র উত্তর দক্ষিণ বাংলাদেশ অঞ্চলে আধিপত্য বিস্তার করছে।
রংপুর বিভাগের ৩৩টি আসনের মধ্যে ১৩টিতেই জামাত বেশি ভোট পেয়েছে। খুলনার ৩৬টি আসনের মধ্যে ২৩টিতে তাদের প্রার্থীরা জয়ী। কিছু আসনের ফলাফল এখনও আনুষ্ঠানিক ঘোষণা বাকি। তবে প্রবণতা স্পষ্ট। সীমান্তবর্তী এলাকায় জানাতের অবস্থান ধরে রাখা সম্ভব। জাতীয় পর্যায়ে এর প্রভাব সীমিত বলে মনে হলেও সীমান্তবর্তী এলাকায় এর উপস্থিতি ভারতের জন্য কূটনৈতিক দৃষ্টি থেকে উদ্বেগের কারণ। এটি কেবল নির্বাচনী হিসেবনিকেশের বিষয় নয়। এটি ভৌগলিক বিষয়, আদর্শ এবং নিরাপত্তার প্রশ্ন। এর মূলে কেবল রাজনীতির বিষয় নয় বরং ভোটারদের অনুভূতির বিষয়।
রংপুর বিভাগটি চিকেনস নেক নামে পরিচিত করিডোরের ঠিক বিপরীতে অবস্থিত। যা অসম, অরুণাচল প্রদেশ, মেঘালয়, মণিপুর, মিজোরাম, নাগাল্যান্ড এবং ত্রিপুরার মতো রাজ্যগুলিকে ভারতের বাকি অংশের সঙ্গে সংযুক্ত করে। এটি এই অঞ্চলের লাইফলাইন, ফলে এখানে কোনওপ্রকার কট্টরপন্থী আগ্রাসন ভারতের নিরাপত্তা প্রভাবিত করতে পারে।
ভারতের সঙ্গে জামাতের তিক্ত ইতিহাস রয়েছে। ১৯৭১ সালের মুক্তিযুদ্ধের সময়ে জামাত নেতাদের বিরুদ্ধে পাকিস্তানের পক্ষ নেওয়ার এবং ভারত বিরোধীব অবস্থান গ্রহণের অভিযোগ আনা হয়েছিল। পরবর্তী বছরগুলিতে তাদের বেশ কয়েকজন নেতা ভারতকে অভ্যন্তরীণ বিষয়ে হস্তক্ষেপের অভিযোগও করেছিলেন। কিছু বিবৃতিতে এমনকী এ-ও বলা হয়েছিল, ভারত বাংলাদেশকে একটি উপনিবেশের চোখে দেখে। এই ধরনের অভিযোগ বাংলাদেশের রাজনীতিতে নতুন নয়। তবে সীমান্ত এলাকায় নির্বাচনী সমর্থন পাওয়ার পর এর প্রভাব বৃদ্ধি পাবে।
চিকেনস নেক চ্যালেঞ্জ
জামাতের সঙ্গে যুক্ত কিছু উগ্রপন্থী মহল চিকেনস নেক সম্পর্কে আপত্তিকর মন্তব্য করেছে। সোশ্যাল মিডিয়া এবং সমাবেশে দাবি করা হয়েছে, এই করিডোরটি ভারতের দুর্বলতার প্রতীক। যদি আঞ্চলিক উত্তেজনা কখনও বৃদ্ধি পায় তাহলে এই অঞ্চলের উপর চাপ সৃষ্টি হতে পারে। যদিও এটি সরকারি নীতি না-ও হতে পারে। এই ধরনের বিবৃতি ভারতের নিরাপত্তা ব্যবস্থাকে সতর্ক করছে।
একই ভাবে, মৌলবাদী গোষ্ঠীগুলি সেভেন সিস্টার্স সম্পর্কে একটি থিওরি তৈরি করেছে। দাবি করেছে, এটি উত্তর পূর্ব ভারতে বিচ্ছিন্নতাবাদী মনোভাবকে উস্কে দিতে পারে। জামাত প্রধান শফিকুর রহমানের ইসলামিক মৌলবাদী এবং নারীবিদ্বেষী বক্তব্য ভাইরাল হলেও তার ভারত-বিরোধী অবস্থান আরও উদ্বেগজনক। তিনি ১৯৭১ সালের ইতিহাসকে তার সমর্থকদের কাছে নতুন ভাবে উপস্থাপন করতে চান। ভারতকে 'লুন্ঠনকারী' হিসেবে নির্দেশ করেন তিনি। জামাতের NCP নেতা নাহিদ ১ লক্ষেরও বেশি ভোটে জিতেছেন। রংপুরের মতো এলাকায় যখন জামাত শক্তিশালী তখন এই চিন্তা করা স্বাভাবিক, এই আদর্শ রাজনৈতিক উস্কানি পেতে পারে।
২৪ পরগনার জন্য স্পর্শকাতর
খুলনা বিভাগের পরিস্থিতিও কম সংবেদনশীল নয়। এই অঞ্চলটি পশ্চিমবঙ্গের দক্ষিণাঞ্চলে, বিশেষ করে ২৪ পরগনার সঙ্গে সীমান্তবর্তী। নিরাপত্তা সংস্থাগুলি আগে এখানে অনুপ্রবেশ, চোরাচালান এবং চরমপন্থী নেটওয়ার্ক সম্পর্কে সতর্ক ছিল। যদি জামাতের মতো একটি দল এখানে শক্তিশালী সমর্থন অর্জন করে তাহলে সীমান্তে চ্যালেঞ্জ আরও বাড়তে পারে। যদিও জামাত জাতীয় ক্ষমতা থেকে দূরে থাকতে পারে। তবুও এই অঞ্চলের স্থানীয় প্রশাসন, শিক্ষা প্রতিষ্ঠান এবং সামাজিক সংগঠনগুলিকে প্রভাবিত করার সুযোগ পাবে। সীমান্তবর্তী জেলাগুলিতে যদি চরমপন্থা বৃদ্ধি পায় তবে এর প্রভাব সীমান্তের উপরও পড়বে।
ভারত ও বাংলাদেশের সম্পর্কের উন্নতি, নিরাপত্তায় সহযোগিতা, সন্ত্রাসবাদ ও চরমপন্থার বিরুদ্ধে সমন্বয় প্রতিষ্ঠা নির্ভর করবে ঢাকা সরকারের রাজনৈতিক সদিচ্ছার উপর। যদি সেক্ষেত্রে স্থানীয় ভাবে ভারতবিরোধী মনোভাব উস্কে দেওয়া হয় তাহলে কেন্দ্রীয় সরকারের উপরও চাপ সৃষ্টি করা যেতে পারে।
জামাতের কৌশল প্রায়শই দু'টি স্তরে পরিচালিত হয়েছে। এক, নির্বাচনী রাজনীতি এবং দুই, ধর্মীয় আন্দোলন। নির্বাচনে পরাজয়ের পরও তারা আদর্শগত ভাবে সক্রিয় থাকতে পরে। বিশেষ করে যে সব জায়গায় তারা আসন জিতেছে। তারা সেখানে তাদের অ্যাজেন্ডা বাঁচিয়ে রাখবে। ভারতের বিরুদ্ধে কঠোর বক্তব্য তার সমর্থকদের ঐক্যবদ্ধ রাখার একটি সহজ উপায়।
রংপুর এবং খুলনার জয় জামাতকে সংসদে শক্তিশালী না করলেও সীমান্ত সমস্যা, জল বন্টন, বাণিজ্য ভারসাম্য এবং সংখ্যালঘু বিষয়গুলিতে ভারত বিরোধী অবস্থান নিতে পারে জামাত।
বাংলাদেশে হিন্দুদের জন্য চ্যালেঞ্জ
রংপুর এবং খুলনা বিভাগে আধিপত্য প্রতিষ্ঠা করবে জামাত। এই এলাকায় উল্লেখযোগ্য পরিমাণ হিন্দুদের বাস। ফলস্বরূপ যে হিন্দুরা আওয়ামী লিগের সমর্থক এবারের নির্বাচনে হয় ভোট দেননি কিংবা ভয়ে BNP-কে ভোট দিয়েছেন, তারা তটস্থ হয়ে পড়বেন। হিন্দুরা জামাত সমর্থকদের দ্বারা সম্ভাব্য তালিবান সদৃশ্য নৃশংস চ্যালেঞ্জের মুখোমুখি হতে পারেন। এই ঝুঁকি আরও বৃদ্ধি পাবে কারণ জামাত তাদের রাজনৈতিক অ্যাজেন্ডা এগিয়ে নিয়ে যাওয়ার জন্য নতুন বাংলাদেশি সরকারের উপর চাপ বাড়াতে থাকবে।
জাতীয় পর্যায়ে হয়ত জামাতের পরাজয় হয়েছে। তবে রংপুর ও খুলনার সীমান্তবর্তী এলাকায় তাদের উপস্থিতি ইঙ্গিত দিচ্ছে, ভারতবিরোধী রাজনীতি বাংলাদেশে এখনও শেষ হয়নি। সীমিত পরিসর হলেও তারা এখনও বিরোধিতা করবে।