
বাংলাদেশের জাতীয় সংসদের প্রাক্তন স্পিকার শিরীন শারমিন চৌধুরীকে গ্রেফতার করেছে ঢাকা মহানগর গোয়েন্দা পুলিশ। ৭ এপ্রিল ভোরে তাঁকে ঢাকার ধানমন্ডির একটি বাড়ি থেকে গ্রেফতার করা হয়। হাসিনা আমলে দীর্ঘ সময় ধরে বাংলাদেশের জাতীয় সংসদের স্পিকার হিসেবে দায়িত্ব পালন করেন শিরীন। সংসদের অধিবেশন পরিচালনা থেকে শুরু করে আন্তর্জাতিক সম্মেলনে অংশগ্রহণ—সব ক্ষেত্রেই তাঁর সক্রিয় উপস্থিতি ছিল। তবে ৫ অগাস্ট আওয়ামী লিগ সরকারের পতনের পর তাঁকে প্রকাশ্যে আর দেখা যায়নি।
সোমবার গভীর রাতে রাজধানীর ধানমন্ডির আত্মীয়ের বাড়ি থেকে তাঁকে আটক করা হয়। মিন্টো রোডের গোয়েন্দা দফতরে রেখে তাঁকে প্রাথমিক জিজ্ঞাসাবাদ করা হয়েছে বলে জানিয়েছেন পুলিশের এক শীর্ষ আধিকারিক। পুলিশ সূত্রে জানা গিয়েছে, রংপুরে এক স্বর্ণশ্রমিক হত্যার মামলাসহ রাজধানীর বিভিন্ন থানায় দায়ের হওয়া একাধিক মামলায় তাঁর নাম রয়েছে। সেই মামলাগুলির মধ্যে কোনও একটিতে গ্রেফতার দেখিয়ে আদালতে তোলা হবে তাঁকে। ২০২৪ সালের ৫ আগস্ট রাজনৈতিক পালাবদলের পর থেকেই জনসমক্ষে আর দেখা যায়নি প্রাক্তন এই স্পিকারকে।
মঙ্গলবার জাতীয় সংসদের প্রাক্তন স্পিকার শিরীন শারমিন চৌধুরীর রিমান্ড আবেদন নামঞ্জুর করে কারাগারে পাঠানোর আদেশ দিয়েছে আদালত। গণ–অভ্যুত্থানের সময় হিংসা, ভাঙচুর ও হত্যাচেষ্টার ঘটনায় রাজধানীর লালবাগ থানায় করা একটি মামলায় শিরীন শারমিন চৌধুরীকে দুই দিন রিমান্ডে নেওয়ার আবেদন করে ঢাকা মহানগর গোয়েন্দা পুলিশ (ডিবি) । আসামিপক্ষ রিমান্ড আবেদন বাতিল চেয়ে জামিন আবেদন করে। আদালত জামিন আবেদন নামঞ্জুর করে। আদালত রিমান্ড ও জামিন আবেদন দুটিই নামঞ্জুর করে।
আবেদনে ডিবি জানায়, ২০২৪ সালের ১৮ জুলাই কোটা সংস্কার আন্দোলনের অংশ হিসেবে লালবাগের আজিমপুর সরকারি কলোনি এলাকায় নিরস্ত্র ছাত্র-জনতা শান্তিপূর্ণ মিছিল করছিলেন। এ সময় আন্দোলন দমনের উদ্দেশ্যে পুলিশ ও আওয়ামী লিগের অজ্ঞাতনামা সন্ত্রাসীরা আন্দোলনকারীদের ওপর দেশিয় ও বিদেশি আগ্নেয়াস্ত্র ব্যবহার করে গুলিবর্ষণ করেন। এ ঘটনায় আন্দোলনকারী মো. আশরাফুল ফাহিমের বাঁ চোখ, মাথা ও শরীরের বিভিন্ন জায়গায় গুলি লাগে। তিনি গত বছরের ১৭ জুলাই লালবাগ থানায় মামলা করেন। এই মামলায় শিরীন শারমীন চৌধুরী ৩ নম্বর আসামি।
শিরীন শারমিন দু'দফায় বাংলাদেশ সংসদের স্পিকার ছিলেন। ২০২৪-এর গণঅভ্যুত্থানের পর রাষ্ট্রপতি মহম্মদ সাহাবুদ্দিন জাতীয় সংসদ ভেঙে দেন। তবে নিয়ম অনুযায়ী সংসদ ভেঙ্গে দিলেও স্পিকার এবং ডেপুটি স্পিকার বহাল থাকেন। কিন্তু বাংলাদেশ সংসদের ডেপুটি স্পিকার শামসুল হক টুকু গণঅভ্যুত্থানের পরই গ্রেফতার হয়ে কারাগারে চলে যান। অন্যদিকে শিরীন শারমিন চৌধুরীর স্পিকার পদে বহাল ছিলেন। সেই বছরই সেপ্টেম্বরের গোড়ায় রাষ্ট্রপতির কাছে পদত্যাগ পত্র পাঠিয়ে দেন তিনি। সেই সময় অন্তর্বর্তী সরকারের তরফে তাঁর ওপর প্রবল চাপ তৈরি করা হয়েছিল বলে খবর। আওয়ামী লিগের অভিযোগ, পদত্যাগ না করলে গ্রেফতার করার হুঁশিয়ারি দেওয়া হয় শিরীনকে। তখন তাঁর এবং স্বামীর কয়েকটি ব্যাঙ্ক অ্যাকাউন্ট কাউন্ট সিল করে দেয় পুলিশ। কয়েকবার তাঁর বাড়িতে গিয়ে জিজ্ঞাসাবাদ করা হয়। কিন্তু মহম্মদ ইউনূসের সরকার তাঁকে গ্রেফতার করেনি। ২০১৩-র এপ্রিলে তিনি বাংলাদেশ সংসদের স্পিকার নির্বাচিত হয়েছিলেন। তিনি বাংলাদেশের উত্তর প্রান্তের শহর রংপুরের রংপুর-৬ আসন থেকে নির্বাচনে প্রতিদ্বন্দ্বিতা করতেন। আওয়ামী লিগে গুরুত্বপূর্ণ কোনও পদে না থাকলেও শিরীন শারমিন যথেষ্ট গুরুত্ব পেতেন শেখ হাসিনার পছন্দের মানুষ হওয়ায়। হাসিনা প্রকাশ্যে বলতেন, শিরীন আমার কন্যা। নির্বাচনী প্রচারে আওয়ামী লিগ নেত্রী বলতেন, আমার মেয়ের জন্য ভোট চাইতে এসেছি। আমার মুখ চেয়ে শিরীনকে জয়যুক্ত করবেন।