
বাংলাদেশে ফের এক হিন্দু মৃত্যুর অভিযোগ। এ বার পুলিশ হেফাজতেই প্রাণ গেল এক সুপরিচিত শিল্পীর। রবিবার গভীর রাতে রাজশাহী মেডিক্যাল কলেজ হাসপাতালে মৃত্যু হয় প্রখ্যাত গায়ক ও আওয়ামি লিগ নেতা প্রলয় চাকীর। পরিবার ও ঘনিষ্ঠদের অভিযোগ, অন্তর্বর্তী সরকারের অধীনে প্রশাসনের অবহেলা ও জেলা হেফাজতে দুর্ব্যবহারের ফলেই মৃত্যু হয়েছে তাঁর। ঘটনাকে কেন্দ্র করে ফের বাংলাদেশে সংখ্যালঘুদের নিরাপত্তা ও মানবাধিকার নিয়ে প্রশ্ন উঠতে শুরু করেছে ।
প্রলয় চাকী বেশ পরিচিত সংগীতশিল্পী ছিলেন। পাশাপাশি আওয়ামি লিগের পাবনা জেলা ইউনিটের সাংস্কৃতিক সম্পাদক হিসেবে দায়িত্ব পালন করতেন। একই সঙ্গে তিনি ছিলেন জেলা আওয়ামী শিল্পী গোষ্ঠীর সাধারণ সম্পাদক। সংস্কৃতি জগতেও তাঁর সক্রিয় ভূমিকা ছিল। বনমালী শিল্পকলা কেন্দ্রের সংস্কৃতি বিষয়ক যুগ্ম সম্পাদক হিসেবেও কাজ করেছেন তিনি। রাজনীতি ও সংস্কৃতি; দুই ক্ষেত্রেই পরিচিত মুখ ছিলেন প্রলয়।
পরিবার সূত্রে জানা গিয়েছে, গত ডিসেম্বর মাসে পাবনা থেকে তাঁকে গ্রেফতার করা হয়। তাঁর বিরুদ্ধে বাংলাদেশে গণ-অভ্যুথ্যানের সময় এক বিস্ফোরণের মামলায় জড়িত থাকার অভিযোগ রয়েছে। সেই মামলায় আওয়ামী লিগের একাধিক নেতার নাম জড়িয়ে। গ্রেফতারের পর থেকে তিনি পুলিশ ও জেল হেফাজতে ছিলেন।
পরিবারের দাবি, প্রলয় চাকীর একাধিক শারীরিক সমস্যা ছিল। বিশেষ করে হৃদ্রোগ সংক্রান্ত জটিলতায় ভুগছিলেন। রবিবার সন্ধ্যায় হঠাৎই তাঁর শারীরিক অবস্থার অবনতি হয়। অভিযোগ, হেফাজতে থাকাকালীন তিনি অসুস্থ হয়ে পড়েন। তবুও যথাসময়ে প্রয়োজনীয় চিকিৎসা করা হয়নি। সন্ধ্যার পর কার্ডিয়াক অ্যারেস্ট হলে তাঁকে রাজশাহী মেডিক্যাল কলেজ হাসপাতালে নিয়ে যাওয়া হয়। গভীর রাতে তাঁর সেখানেই মৃত্যু হয়। সেই সময়ও তিনি পুলিশ ও জেল হেফাজতেই ছিলেন।
পরিবারের সদস্যদের অভিযোগ, প্রলয়ের অসুস্থতার বিষয়টি প্রশাসনকে বারবার জানানো হয়েছিল। কিন্তু তা সত্ত্বেও চিকিৎসার ক্ষেত্রে গাফিলতি করা হয়েছে। হেফাজতে থাকাকালীন তাঁর সঙ্গে দুর্ব্যবহারও করা হয়েছে বলে অভিযোগ তুলেছেন তাঁরা। এই মৃত্যুকে ‘রহস্যজনক’ বলে দাবি করছে পরিবার।
সাম্প্রতিক অতীতে বাংলাদেশের বিভিন্ন প্রান্তে একের পর এক হিন্দু ব্যক্তির উপর হামলা ও হত্যার অভিযোগ সামনে এসেছে। কয়েক সপ্তাহের মধ্যেই একাধিক ঘটনায় প্রাণ হারিয়েছেন সংখ্যালঘু সম্প্রদায়ের মানুষ। গত মাসে এক গার্মেন্টস কারখানায় কর্মরত হিন্দু শ্রমিক দীপু চন্দ্র দাসকে প্রকাশ্যে পিটিয়ে হত্যা করার অভিযোগ ওঠে। তারপরেই ঘটে অমৃত মণ্ডলের মৃত্যুর ঘটনা।
এর পরে ময়মনসিংহ জেলায় গুলি করে হত্যা করা হয় বজেন্দ্র বিশ্বাসকে। একইভাবে গণপিটুনিতে গুরুতর জখম হয়ে হিন্দু ব্যবসায়ী খোকন দাসের মৃত্যু হয়। সম্প্রতি এই তালিকায় যুক্ত হয় যশোরের মণিরামপুরের রানা প্রতাপ বৈরাগীর নাম। জনবহুল বাজারে গুলি চালিয়ে তাঁকে হত্যা করা হয় বলে অভিযোগ। প্রত্যক্ষদর্শীদের মতে, ঘটনাস্থলেই তাঁর মৃত্যু হয়।
এহেন প্রেক্ষাপটে প্রলয় চক্রবর্তীর পুলিশ হেফাজতে মৃত্যুকে কেন্দ্র করে নতুন করে চাঞ্চল্য তৈরি হয়েছে। বাংলাদেশের আইনশৃঙ্খলা পরিস্থিতি এবং সংখ্যালঘুদের নিরাপত্তা নিয়েও প্রশ্ন উঠছে রাজনৈতিক ও নাগরিক মহলে। অন্তর্বর্তী সরকার ও প্রশাসনের ভূমিকা নিয়েও তীব্র বিতর্ক তৈরি হয়েছে।