
আমাদের সমাজে অনেক মানুষ আছেন যাদের কাছে একবেলা খাবার খাওয়াও স্বপ্নের মতো। খাবারের যন্ত্রণায় ভোগা এসব মানুষ জানেন একবেলা খাবার তাদের কাছে কতটা দামি। আর তাঁদের জন্যই অভিনব উদ্যোগ ‘ভালো কাজের হোটেল’। এখানে মেল একবেলা পেট ভরে আহারের সুযোগ। এ জন্য প্রতিদিন অন্তত একটি ভালো কাজ করতে হবে। ব্যতিক্রমী এই খাবারের হোটেল গড়ে উঠেছে ঢাকার কমলাপুর বাসস্ট্যান্ডে।
রাস্তার এক পাশের হাঁটার পথে সারি দিয়ে বসে আছে ছোট-বড় নানা বয়সের মানুষ। তরুণ বয়সী একজন প্রত্যেককে দুটো প্রশ্ন করছেন, "আপনার নাম?", "আজ আপনি কী ভালো কাজ করেছেন?" উত্তর জেনে টুকে রাখছেন হাতে থাকা ক্লিপ বোর্ডের কাগজে। এই কাজ শেষে সকলকে দেয়া হচ্ছে খাবারের প্যাকেট। বাংলাদেশের রাজধানী ঢাকার কমলাপুরে দেখা মিলবে ভালো কাজের বিনিময়ে খাবার পাওয়ার ব্যতিক্রমী এই উদ্যোগের।
ঢাকা শহরের কমলাপুর রেলওয়ে স্টেশনের কাছে কমলাপুর আইসিডি কাস্টমস হাউস লাগোয়ো এই ব্যক্তিক্রমী হোটেলে দুপুর হলেই মানুষের ভিড় উপচে পড়ে। তবে এখানে ব্যতিব্যস্ত বয়–বেয়ারার দেখা নেই, ক্যাশ কাউন্টারের হাঁকডাক কিংবা বেলের ক্রিং ক্রিংও নেই, নেই সুসজ্জিত টেবিলে খাওয়ার ধুম। হোটেল বলতে যে পাঁচমিশালি কথার হট্টগোল, সেসবের বালাইও নেই সেখানে। নেই সামান্য চেয়ার-টেবিলের ব্যবস্থাও। শুনতে অবাক মনে হলেও এটিই সত্য, এখানে খেতে টাকা লাগে না। শুধু বলতে হবে, সর্বশেষ কোন ভালো কাজটি আপনি করেছেন। আর যে কোনো একটি ভালো কাজের বিনিময়ে যে কেউ এখানে খেতে পারেন পেটপুরে।
কীভাবে এমন একটি মহৎ উদ্যোগের শুরু?
সময়টা ২০০৯ সাল। বিশ্ববিদ্যালয়পড়ুয়া কয়েকজন তরুণের ভাবনাকে নাড়া দিয়েছিল অসহায়দের পাশে দাঁড়ানো এক ব্যক্তির গল্প। ২০০৯ সালে বিশেষ কয়েকটি দিনে এ ধরনের আয়োজন হতো। ২০১৯ সাল থেকে প্রতি শুক্রবার করা হয় আয়োজন। কিন্তু করোনার কারণে লকডাউন শুরু হলে প্রতিদিন একবেলা করে খাবারের আয়োজন করা হয়। ঢাকার পাঁচটি পয়েন্টে খাবার বিতরণ করা হয়। কমলাপুর, সদরঘাট, ধানমন্ডি রবীন্দ্র সরোবর, বনানী কবরস্থান এবং বিমানবন্দর রেলস্টেশন। এসব জায়গার মধ্যে কমলাপুরে প্রতিদিন সন্ধ্যা বা রাতে খাবার দেওয়া হয়। বাকি চারটি স্থানে সপ্তাহে এক দিন খাবার বিতরণ করা হয়। প্রতিদিন প্রায় ৭০০-৮০০ মানুষের জন্য খাবার রান্না হয়। খাবার দেওয়ার আগে তাদের নাম, বয়স, কী কী ভালো কাজ করল তা লিখে রাখা হয়। কেউ যদি মিথ্যা কথা বলে তাকেও ফিরিয়ে দেওয়া হয় না। তাকে বোঝানো হয় সত্য কথা বলাও একটা ভালো কাজ। লিখে রাখা তথ্যগুলো বিশ্লেষণ করে তাদের উৎসাহ দেওয়া হয় ভালো কাজ করার।
কী ধরনের ভালো কাজ করতে হয়?
অন্ধ বা শিশুকে রাস্তা পারাপারে সহায়তা, রিকশা ভাড়া না নিয়ে অসহায় মানুষকে গন্তব্যে পৌঁছে দেওয়া, রাস্তা থেকে কষ্টদায়ক বস্তু বিশেষ করে কাচের টুকরো, ইট- পাথর, পিন সরিয়ে ফেলা এবং কাঁধে বোঝা বহন করতে কষ্ট হলে সহায়তা করার মতো অনেক ভালো কাজ করেন অনেকে।
কী ধরণের খাবার থাকে?
রবি থেকে বৃহস্পতি, খাবারের মেন্যুতে থাকে ডিম-খিচুড়ি। শুক্র ও শনিবারের খাদ্য তালিকায় বিরিয়ানি, পোলাও বা মুরগি তেহারির ব্যবস্থা থাকে। সংগঠনের সদস্যরা নিজেদের চাঁদার টাকায় নিজেরাই বাজার করেন। প্রতিদিন রান্না করে নিজেরাই প্যাকেটে করে পরিবেশন করেন সুবিধাবঞ্চিত মানুষের মাঝে। Youth for Bangladesh নামে একটি সংগঠনের সদস্যরাই বর্তমানে এই সাধু উদ্যোগটি চালাচ্ছে।
সংগঠনসূত্রে জানা গেল, এই হোটেল চালুর পেছনে তাদের উদ্দেশ্য দুটি। প্রথমত, ভালো কাজের চর্চায় সবাইকে উদ্বুদ্ধ করা। আর দ্বিতীয়ত, ক্ষুধার কষ্ট কমিয়ে ক্ষুধামুক্ত এক বাংলাদেশ গড়া।