
এক মিনিটের অ্যাপিয়ারেন্স থেকে ধীরে ধীরে গোটা সিনেমায় মূল চরিত্রে অভিনয়। এখন টলিউডের গণ্ডি ছাড়িয়ে বলিউডের মূল ধারার সঙ্গে মিশে যাওয়ার অনন্য সফর। আগামী ৪ ফেব্রুয়ারি মুক্তি পাচ্ছে তিগমাংশু ঢুলিয়া পরিচালিত (Tigmanshu Dhulia) ওয়েব সিরিজ The Great Indian Murder. দীর্ঘ সফরের অভিজ্ঞতা কেমন, তা নিয়ে আনকাট আড্ডায় অভিনেতা দেবপ্রসাদ হালদার (Deboprasad Hadar)। অপমান থেকে তেল মারামারি, লবিবাজি - সব কিছু নিয়ে অকপটে কথা বললেন তিনি। শুনল আজতক বাংলা।
প্রশ্ন: ছোট চরিত্র থেকে ধীরে ধীরে এই উত্তরণের সফরের অভিজ্ঞতা কেমন?
দেবপ্রসাদ: জার্নিরা খুব মজার জার্নি ছিল। এর মধ্যে অনেক ধরনের সেন্টিমেন্টস ছিল, খিদে ছিল, অপমান ছিল। এবং যতবার অপমানিত হয়েছি সব সময় খিদে বেড়ে গিয়েছিল। মানুষ হিসাবে আমায় শক্ত হতে তা ভীষণ সাহায্য করেছে। আমার তো মনে হয় ফেইলিয়র একটা মানুষের জীবনের ভিতটা শক্ত করে দেয়। সেই খিদে থেকেই ভালো চরিত্রের খোঁজ করেছি। এখনও করে চলেছি। আমার কাছে ছোট চরিত্র বড় চরিত্র বলে কিছু নেই। স্ক্রিন প্রেজেন্স যতই কম থাক, তার ইমপ্যাক্ট গোটা সিনেমা বা সিরিজে কতটা সেটা আমার কাছে বেশি গুরুত্বপূর্ণ। গল্পে চরিত্রটার কতটা অবদান থাকবে সেটা বেশি ইমপর্ট্যান্ট। ৫ মিনিটের রোলও একজন অভিনেতাকে ভালোভাবে চিনিয়ে দিতে পারে। রোম ওয়াজ নট বিল্ট ইন ওয়ান ডে।
প্রশ্ন: কেমন ছিল সেই অপমানকর দিনগুলি, কেমনই বা ছিল সেই সেন্টিমেন্টস?
দেবপ্রসাদ: কলকাতায় তেল আর মাখনটা খুব ভালো বিক্রি হয়। কে কতটা ভালো তেল মারতে পারে দিনের শেষে সেটাই দেখা হয়। এখানে অনেক পরিচালকই ভাবেন না আমার এই চরিত্রটা কোন অভিনেতা ভালোভাবে পর্দায় মেলে ধরতে পারবেন। এখানে লবির লোকজনকে কাজ দেওয়া হয়। সে কারণেই আমার কাছে জার্নিটা বেশ থ্রিলিং ছিল এবং এখন আছে। শেষ দিন পর্যন্ত সফর চলবে। যখনই ফ্লোরে ঢুকি, আমি একটা সাদা কাগজ হিসাবে ঢুকি। যাতে প্রতিনিয়ত শিখতে পারি। নিজেকে প্রতি দিন বলি আমি এখনও কিছু জানি না। যত দিন কাজ করব, শিখে নিজেকে আরও বেশি ইমপ্রুভ করে যেতে চাই। এটাই দিনের শেষে থেকে যাবে।
প্রশ্ন: নিজেকে কী ভাবে মোটিভেট করেন?
দেবপ্রসাদ: একজন বিখ্যাত মানুষের ইন্টারভিউতে পড়েছিলাম, তুমি যদি সব কিছু জেনে গিয়ে থাকো তবে সুইসাইড করো। তোমার আর বেঁচে থেকে কী হবে! এই লাইনটা ভীষণ অনুপ্রেরণা দেয়। আর্টিস্টিক সত্ত্বার কোনও শেষ নেই। ক্রিয়েটিভিটি কী ভাবে শেষ হবে? অমিতাভ বচ্চন যদি এখনও বলতে পারেন আমি শিখছি, তা হলে আমরা কারা? যতদিন কাজ করব এই লাইনগুলো মনে করে কাজ করে যাব। কলকাতায় একটা জিনিস ভীষণ প্রচলতি, এখানে সেল্ফ প্রোক্লেইমড বড় অভিনেতা বা পরিচালকের কোনও অভাব নেই। অথচ খুব বিপরীত চিত্র বলিউডে। আমি যে তিশু স্যরের (Tigmanshu Dhulia) সঙ্গে কাজ করলাম, তাকে দেখে অনেকেই অবাক হতে পারেন। এত বড় মাপের পরিচালক-অভিনেতা হওয়া সত্বেও মাটিতে পা রেখে চলেন। আমি অবাক হয়ে দেখেছি এবং শিখেছি।
প্রশ্ন: বিষয়টা নিয়ে একটা উদাহরণ দিলে হয়তো আমাদের পাঠকের বুঝতে সুবিধা হবে...
দেবপ্রসাদ: এখানেও দুই ইন্ডাস্ট্রির তুলনা চলেই আসবে। ওখানে কাজ করতে গিয়ে দেখেছি, যিনি সেটে খাবার-চা-জল পৌঁছে দিচ্ছেন তাঁকেও স্যর বলে সম্বোধন করা হয়। কলকাতার শুটিং ফ্লোর এ সব ভাবতেও পারবে না। প্রত্যেক মানুষের সম্মান রয়েছে, সেটা দেওয়া উচিত। অভিনেতা হিসাবে যখন ফ্লোরে যাই তখন দেখি না পরিচালকের পদে তিশু স্যর রয়েছেন না অন্য কেউ, আমি ওই চেয়ারটাকে সম্মান করি। টলিউডের সবার ক্ষেত্রে যদিও একথা খাটে না। তবে বেশিরভাগই একই প্রকৃতির। একে অপরের প্রতি সম্মান দেওয়াটা এখানে বাজে ভাবে মিসিং।
প্রশ্ন: তিগমাংশু ঢুলিয়ার সঙ্গে কাজের অভিজ্ঞতা কেমন?
দেবপ্রসাদ: প্রথমেই বলি অদ্ভূত মানুষ। ততোধিক অদ্ভূত তাঁর চিন্তাভাবনা। সামনের অভিনেতা নাসির সাহাব না আমার মতো অকিঞ্চিৎকর কেউ, তিনি শিল্পীর স্বাধীনতায় বিশ্বাসী। একটা ঘটনা বলি। একটা দৃশ্যের শুটিংয়ের সময় তিশু স্যরের সঙ্গে আমার রীতিমতো তর্ক-বিতর্ক শুরু হয়েছিল। আমি আমার পয়েন্ট নিয়ে খুব স্পষ্টভাবে বুঝিয়েছিলাম স্যরকে। উনি আমায় সরাসরি চুপ করিয়ে দিতে পারতেন, কিন্তু তিনি আমার পয়েন্টের সঙ্গে শেষে একমত হয়েছিলেন। এই সিরিজে কাস্টিং দেখলে মাথা খারাপ হয়ে যাবে। প্রত্যেকেই বিরাট মাপের অভিনেতা। কিন্তু সকলে একে অপরকে যা সম্মান করেন, তা অনেক কিছু শিখিয়ে দেয়।
প্রশ্ন: প্রথম দিনের শুটিংয়ের অভিজ্ঞতা কেমন?
দেবপ্রসাদ: কলকাতায় শুটিং ছিল। যাওয়ার সময় নিজেকে বলছিলাম, গত ১০ বছর ধরে আমার যে স্ট্রাগল, আমার যে জার্নি, আমার শিক্ষা, সব কিছু প্রমাণ হবে আজকের দিনটা। কারণ এই লোকটার কাছে তেল মেরে কিছু পাব না। একে যদি সন্তুষ্ট করতে হয় তবে কাজ দিয়ে সন্তুষ্ট করতে হবে। আমায় তিশু স্যর শুটিং চলাকালীন বলেছিলেন, 'ইয়ে তুমহারে জ্যায়সা খুদ সে শিখা হুয়া জো অ্যাক্টর লোগ হোতে হ্যায় না, বহুত খতরনাক হোতে হ্যায়। তুমহারে পাস হর চিজ কা লজিক হ্যায় না? ঠিক হ্যায় তুমে জ্যায়সা ঠিক লগে তুম করো... ম্যায় বাকি দেখতা হুঁ...' একজন শিল্পীর এর চেয়ে বেশি কী চাই! সেই দিনের ফলে আন্দামানে শুটিংয়ের পর একটা গোটা দিন তিশু স্যার আমায় সঙ্গে নিয়ে ঘুরেছিলেন। ওই দিনটা কোনও দিন ভুলব না। আমি অত্যন্ত খুশি যে আমি তাঁকে কাজ দিয়ে সন্তুষ্ট করেছি, তেল মেরে নয়।
প্রশ্ন: আপনার চরিত্র নিয়ে কিছু বলুন...
দেবপ্রসাদ: সিরিজে আমার চরিত্র একজন অবসরপ্রাপ্ত সরকারি অফিসারের। নাম ব্যানার্জি। সিরিজটা একজন রাজনৈতিক নেতার ছেলের খুনের তদন্ত নিয়ে তৈরি। তার মাঝেই এমন কিছু ঘটে যার সঙ্গে আমার চরিত্রের সরাসরি যোগাযোগ আছে। এমন কিছু রিভিল হয় যা সকলকে নাড়িয়ে দেবে। এর চেয়ে বেশি কিছু আমার বলার অনুমতি নেই। তবে সিরিজ দেখার সময় সকলেই সেটা বুঝতে পারবেন। অত্যন্ত পজিটিভ এবং গুরুত্বপূর্ণ চরিত্র।
শেষ প্রশ্ন, এই সিরিজ নিয়ে আপনার প্রত্যাশা কতটা?
দেবপ্রসাদ: আমি কিচ্ছু প্রত্যাশা নেই। যে কোনও সিনেমা বা সিরিজে অভিনয়ের সময় আমি শুধু নিজের কাজটা মন দিয়ে করতে পারি। তার বাইরে আমার চাওয়ার কিছু নেই। বাকিটা নিজে থেকেই হবে। গীতার লাইনে খুব বিশ্বাস করি, কাজ করে যাও ফলের আশা কোরো না। যা হওয়ার নিজে থেকেই হবে। কারণ বেশিরভাগ ক্ষেত্রে দেখেছি প্রত্যাশা করলে হতাশা মেলে। তাই শুধু কাজ করে যেতে চাই, সেটাও মন দিয়ে।