
কলকাতার পার্কস্ট্রিটের অন্যতম জনপ্রিয় রেস্তোরাঁয় মাটনের বদলে গোমাংস পরিবেশন নিয়ে উত্তাল গোটা নেটপাড়া। শুক্রবার দুই বন্ধুকে নিয়ে পার্কস্ট্রিটের এক রেস্তোরাঁয় ডিনার সারতে যান জনপ্রিয় ইউটিউবার সায়ক চক্রবর্তী। আর সেখানেই তাঁকে মাটন স্টেকের পরিবর্তে গোমাংস পরিবেশন করা হয়। আর অজান্তেই সেই খাবার খাওয়ার পর সায়ক এই নিয়ে ভিডিওতে নিজের ক্ষোভ উগরে দিয়েছেন। এই ঘটনার পরিপ্রেক্ষিতে ইউটিউবার তথা অভিনেতার অভিযোগের ভিত্তিতে গ্রেফতার হন ওই হোটেলের কর্মী। যদিও গোটা বিষয়টিকে খুব ভাল নজরে দেখছে না সোশ্যাল মিডিয়া ও টলিপাড়ার একাংশ। কারণ প্রাণের শহর কলকাতা বরাবরই ধর্ম নিয়ে সহিষ্ণু। সেখানে দাঁড়িয়ে সায়কের ধর্মকে টেনে নেওয়ার ব্যাপারটি একেবারেই গ্রহণযোগ্য নয় বলেই জানিয়েছেন অনেকে।
সোশ্যাল মিডিয়া থেকে শুরু করে টলিপাড়াতেও সায়কের এহেনও আচরণ একেবারেই সঠিকভাবে দেখা হচ্ছে না। নেটপাড়ায় ঢুঁ মারলেই এখন দেখা যাবে সায়কের এই ঘটনা নিয়ে নানান রকমের পোস্ট, মিম ইত্যাদি। নেটিজেনের একাংশ দাবি করেছেন যে পার্কস্ট্রিট অঞ্চলের ওই জনপ্রিয় রেস্তোরাঁ বহু বছর ধরে কলকাতাবাসীর মন জয় করে এসেছে। সাধ্যের মধ্যে থাকা পানীয় ও কিছু কন্টিনেন্টাল খাবার খেতেই শহরবাসী এখানে ভিড় জমান প্রতিরাতেই। আর উৎসব-পার্বনে তো কথাই নেই। আর এই শহরের অধিকাংশ মানুষের অজানা নয় যে এই রেস্তোরাঁর বিফ স্টেক কতটা জনপ্রিয়। যাঁরা গোমাংস খান, তাঁরা এই পদটি খেতেই এই রেস্তোরাঁতে আসেন। নেটপাড়ার একাংশের কথানুযায়ী, সায়ক ভিডিওতে নিজেকে ব্রাহ্মণ বলে দাবি করেছেন অথচ তিনি এটা জানেন না যে সেই রেস্তোরাঁয় গোমাংস ও পাঁঠার মাংস হয়ত একই কড়াইতেই রান্না হয়। আবার কেউ কেউ বলেন, ধর্মীয় সুড়সুড়ি না দিলেই পারতেন তিনি।
গীতাপাঠের দিন ময়দান চত্বরে মাংসের প্যাটিস বিক্রি করা দিন আনি দিন খাই দোকানিকে হেনস্তার ঘটনা খুব পুরনো নয়। সেদিনও ধর্ম নিয়ে কারবারিদের কানমুলে শহরবাসী বুঝিয়ে দিয়েছিল কলকাতা আজও ধর্মনিরপেক্ষতায় বিশ্বাসী। এবার ছাব্বিশের পড়ন্ত জানুয়ারির শেষবেলাতেও ‘এটা কলকাতা’ বলে হুঁশিয়ারা দাগা সায়ক চক্রবর্তীকেও সেশহরই পাঠ দিল, কাস্ট/ ক্লাসের উর্ধ্বে গিয়ে ওই বেয়ারাও প্রথমত একজন মানুষ। এবং এদেশের নাগরিক হিসেবে তাঁরও মৌলিক অধিকার রয়েছে। তাই গোটা ঘটনা নিজের ফোনে ভিডিও করার আগে বা লাইভে যাওয়ার আগে ওই বেয়াড়ার অনুমতি নেওয়া উচিত ছিল। আবার কেউ কেউ ব্রাহ্মণ বলে দাবি করা কনটেন্ট ক্রিয়েটারকে মগড়াহাটের বিফ হালিম স্বাদ গ্রহণের পুরনো স্মৃতির কথাও মনে করিয়ে দিয়েছে। তবে নেটিজেনের পাশাপাশি সায়কের তুলোধনা করতে ছাড়েননি তারকাদের একাংশও।
অভিনেতা রাহুল বন্দ্যোপাধ্যায় বলছেন, “চুপ করেই থেকেছি। কারণ চিরকাল ভেবেছি, অন্যের কাজ নিয়ে আমি বলার কে? তাই শত অপছন্দ হওয়া সত্ত্বেও চুপ থেকেছি। কিন্তু এবার আর সম্ভব নয়। সায়ক এইবার যেটা করেছে, তা হিংসায় উসকানি এবং রাজ্যের শান্তি নষ্ট করার চেষ্টা। ব্যাঙ্গাত্মক সুরে ঋত্বিক চক্রবর্তী প্রশ্ন ছুড়লেন, “মটন মাখা-সন্দেশ পানিফল বিফ, চিনেবাদাম কোনটা কী, খেয়ে বোঝো না? তোমার স্বাদ কোরক নেই কুসুম?” কেউ বা আবার ‘অভিনেতা-অভিনেত্রীদের ভাত মেরে’ কন্টেন্টের নামে ক্রিয়েটারদের রসাতলে যাওয়া ‘রিল কালচারে’র উপদ্রবে বিরক্ত প্রকাশ করেছেন।
অভিনেতা রাহুল দেব বোস তাঁর পোস্টে জানিয়েছেন যে তাঁর সঙ্গে সায়কের সম্পর্ক ভাল কিন্তু যেভাবে সায়ক ওই রেস্তোরাঁর কর্মীর সঙ্গে আচরণ করেছেন, তা একেবারেই অনৈতিক। ১৫ সেকেন্ডের একটা ভিডিওতে নিজের জনপ্রিয়তা বাড়ানোর জন্য সেই বেয়াড়া ও তাঁর পরিবারকে ঝুঁকিতে ফেলে দেওয়া হল না কি? মুখ খুলেছেন পরিচালক ও অভিনেত্রা মানসী সিনহাও। তিনি লিখেছেন, আমায় কেউ, না বলে গরুর মাংস খাওয়ালে আমি বুঝতেই পারব না। জীবনে খাইনি কিনা, তাই স্বাদ জানিনা। কিন্তু যদি জানা থাকতো, এক গরাস মুখে দিলেই বুঝতে পারতুম না? নাহ, script টা একটু কাঁচা হয়ে গেছে no doubt এবং একই সঙ্গে...এই আপত্তি, রাগ ইত্যাদির সঙ্গে ধর্ম টাকে এভাবে হাল্কা মিশিয়ে দেবার চেষ্টাটা বেশ বিরক্তিকর। একেবারে সহ্য হলো না। আর এক অভিনেত্রী ত্বরিয়া চট্টোপাধ্যায় সায়ককে কটাক্ষ করতে গিয়ে দেবলীনা নন্দীর ঘুমের ওষুধ খেয়ে আত্মহত্যার চেষ্টার ঘটনাকেও টেনে এনেছেন।