
দিঘার তালসারিতে শ্যুটিং করার ফাঁকে জলে ডুবে মৃত্যু হয় অভিনেতা রাহুল অরুণোদয় বন্দ্যোপাধ্যায়ের। তাঁর হঠাৎ করে এই মৃত্যুর ঘটনা টলিপাড়ার সকলকেই হতচকিত করে দিয়েছে। বিশেষ করে শ্যুটিং করার সময় এক অভিনেতার এরকম মর্মান্তিক পরিণতি অনেক প্রশ্নের মুখে দাঁড় করিয়েছে প্রযোজনা সংস্থাকে। তবে রাহুলের এই মৃত্যু প্রথম নয়, এর আগেও সাতের দশকে একই ঘটনা ঘটেছিল আর এক অভিনেত্রীর সঙ্গেও। সেই অভিনেত্রীর মৃত্যুও হয়েছিল জলে ডুবে।
সাতের দশকে বাংলা থিয়েটারের জনপ্রিয় অভিনেত্রী ছিলেন কেয়া চক্রবর্তী। পরিচালক স্বদেশ সরকারের জীবন যে রকম ছবির শ্যুটিং চলাকালীন হুগলি নদীতে ডুবে মৃত্যু হয় এই প্রতিভাবান থিয়েটার শিল্পীর। এই ছবিতে কেয়া এক অন্ধ মায়ের চরিত্রে অভিনয় করছিলেন। ১৯৭৭ সালের ১২ মার্চ মৃত্যু হয়েছিল কেয়ার। সেই সময় একাধিক সংবাদমাধ্যমের রিপোর্ট অনুযায়ী, একটা দৃশ্যের শ্যুটের সময় কেয়া নৌকা থেকে ঝাঁপ দেন মাঝগঙ্গাতে, এরপর তাঁকে খুঁজে পাওয়া যায় না। শরীরে একাধিক আঘাত সহ পরের দিন উদ্ধার হয় কেয়া চক্রবর্তীর দেহ। সেই মৃত্যু ঘিরেও ছিল অসংখ্য প্রশ্ন— দুর্ঘটনা, নাকি অন্য কিছু? উত্তর আজও অমীমাংসিত। জানা যায়, সুরক্ষার পর্যাপ্ত ব্যবস্থা ছিল না। ডামিও ব্যবহার করা হয়নি।
নান্দীকারের প্রধান মহিলা শিল্পী ছিলেন কেয়া। তিন পয়সার পালা, ভালোমানুষ ও অ্যান্টিগনি-তে তাঁর অভিনয় আজও চিরস্মরণীয়। তবে আজও তাঁর মৃত্যু নিয়ে ধোঁয়াশা রয়েছে। কখনই এই মৃত্যুর মীমাংসা হয়নি। মাত্র ৩৪ বছর বয়সে বাংলা থিয়েটার ও ফিল্ম ইন্ডাস্ট্রি হারিয়েছিলেন এক প্রতিভাবান মহিলা শিল্পীকে। নান্দীকারের নিজস্ব নথিতে উল্লেখ করা হয়েছে, ১২ মার্চ একটি সিনেমার শ্যুটিং করার সময় কেয়া চক্রবর্তীর মৃত্যু হয় দুর্ঘটনায়। যদিও এই দুর্ঘটনা কীভাবে হয়েছে, তা এখনও জানা যায়নি।
কলকাতা সাঁকরাইলে এই ছবির শ্যুটিং চলছিল। কেয়া তখন জনপ্রিয়তার তুঙ্গে। মাঝগঙ্গায় একটি দৃশ্যের জন্য ঝাঁপ দিয়েছিলেন কেয়া, কিন্তু আর উঠে আসেননি। এটি আত্মহত্যা, খুন নাকি দুর্ঘটনা, এই প্রশ্নের কোনও সন্তোষজনক উত্তর মেলেনি। আর ঠিক একই ধরনের ঘটনাই ঘটল অভিনেতা রাহুল অরুণোদয় বন্দ্যোপাধ্যায়ের সঙ্গেও। রবিবার, বিকেল প্রায় পাঁচটা। তালসারির সমুদ্রতটে শুটিং চলছিল ‘ভোলে বাবা পার করেগা’ ধারাবাহিকের। দৃশ্য অনুযায়ী, জলে নামার নাকি কথাই ছিল না নায়ক রাহুলের। গোড়ালি ছোঁয়া জলে দাঁড়িয়েই নায়িকার সঙ্গে সংলাপ বলার কথা ছিল। পরিচালক শুভাশিস মণ্ডল অন্তত তেমনটাই দাবি করেছেন। তার পরেই রাহুল নাকি আচমকাই শটের বাইরে গিয়ে সমুদ্রের দিকে এগোতে শুরু করেন। প্রথমে গোড়ালি, তারপর হাঁটু, তারপর কোমর—ক্রমশ গভীর জলে চলে যাচ্ছিলেন তিনি। শেষমেশ... সব শেষ।
দুটি মৃত্যুর মধ্যে প্রায় পঞ্চাশ বছরের ব্যবধান। গঙ্গা আর তলসারির সমুদ্র ভিন্ন জগৎ। কিন্তু মূল ব্যর্থতা—নিরাপত্তার অভাব, দূরদর্শিতার অভাব, এবং বিপদের মুখে ঠেলে দেওয়া মানুষদের প্রতি একটি প্রযোজনা সংস্থার কর্তব্যের অভাব। যা বার বার করে উঠে আসছে। ওড়িশা পুলিশের পক্ষ থেকে ইতিমধ্যেই জানানো হয়েছে যে তালসারিতে শ্যুটিং করার কোনও অনুমতি নেওয়া হয়নি। কেয়া ও রাহুলের মৃত্যুর মধ্যে পাঁচ দশকের ব্যবধান হলেও, মিল রয়েছে একাধিক। দু’জনেই শুটিংয়ে ব্যস্ত। দু’জনেই জলের মধ্যে। দু’জনের ক্ষেত্রেই ছিল না পর্যাপ্ত প্রস্তুতি বা নিয়ন্ত্রণ। আর দু’জনেই চলে গেলেন কেরিয়ারের তুঙ্গে থাকা অবস্থায়। হঠাৎ। অসময়ে।
দুই শিল্পীর এই একইভাবে মৃত্যুর ঘটনা আবারও ভাবাচ্ছে টলিপাড়াকে। কেন এখনও শিল্পীরা যথেষ্ট সুরক্ষা পান না শ্যুটিং সেটে? কেন পর্যাপ্ত বন্দোবস্ত থাকে না আউটডোর শ্যুটিংয়ে শিল্পীদের জন্য? কেন এত বছর পরও এত অব্যবস্থা? আজ এইসব প্রশ্নের মুখে দাঁড়িয়ে টলিউড। রাহুল ও কেয়ার আকস্মিক চলে যাওয়া চোখে আঙুল দিয়ে দেখিয়ে দিল বাংলা ফিল্ম ইন্ডাস্ট্রির কঙ্কালসার চেহারা।