
ছবির নাম: প্রজাপতি ২
পরিচালক: অভিজিৎ সেন
অভিনয়ে: দেব, মিঠুন চক্রবর্তী, শকুন্তলা বড়ুয়া, অপরাজিতা আধ্য, ইধিকা পাল, জ্যোতির্ময়ী কুন্ডু, অনুমেঘা কাহালি এবং অন্যান্য।
২০২৫ সালটা যেন এক কথায় দেবেরই বছর। গত বছরের শেষে 'রঘু ডাকাত', তারপর 'ধূমকেতু' আর এখন 'প্রজাপতি ২'। দেব কিন্তু দিব্যি বোঝেন বাণিজ্যিক ও পারিবারিক ছবির মধ্যে ব্যালেন্স করতে। পরপর দুটো বাণিজ্যিক মারকাটারি-অ্যাকশনধর্মী ছবি করার পর পারিবারিক ছবি নিয়ে এসে দর্শকদের হলমুখী করতে দেবের কৌশল নিঃসন্দেহে প্রশংসনীয়। প্রজাপতির পর দেব-মিঠুন জুটির ফেরা নিয়ে দর্শকদের মধ্যে প্রথম থেকেই উন্মাদনা ছিল। আর প্রজাপতি ২ মুক্তি পেতেই তা আরও এবার প্রমাণ হল যে প্রতিযোগিতায় দেব কখনই পিছিয়ে থাকেন না।
ছবিতে দেব এবং মিঠুনের যুগলবন্দী দেখলে - জয়গুরু বলতেই হয়। এক বাবা তাঁর ছেলেকে আনন্দে দেখতে, জীবনের ক্রনিক কষ্ট থেকে তাঁকে দূরে সরিয়ে রাখতে, এমনকি যখন যেভাবে একজন বাবা তাঁর সন্তানের বিপদে রুখে দাঁড়াতে পারে, প্রজাপতি ২ যেন ঠিক সেটাই। এই ছবিতে প্রজাপতি-র মতো বাবার বিয়ে নিয়ে মাথাব্যথা নেই, বরং এক সিঙ্গল ফাদারকে আবার সংসারী করতে উঠেপড়ে লেগেছেন তাঁর বাবা। ছবিতে মুখ্য চরিত্র দুজন দেব (জয় চক্রবর্তী) ও মিঠুন চক্রবর্তী (গৌর চক্রবর্তী)। এই বাবা-ছেলে মিলে কীভাবে বিদেশের মাটিতে নিজেদের কেরামতি দেখায়, এটাই সিনেমার প্রধান কাহিনী। দুজনেই কিন্তু রান্নার সঙ্গে ওতপ্রোতভাবে জড়িত। একজন দেশে হোটেল চালান, অন্যজন বিদেশে রান্না করেন।
গল্প একটু এগিয়ে যেতেই বোঝা যায়, জয়ের স্ত্রী শ্রী (ইধিকা) সন্তান জন্ম দিতে গিয়েই মারা যান। সেই থেকে নিজের জেদ এবং মেয়ের মুখের দিকে তাকিয়েই জয়ের লড়াই শুরু। মেয়েকে একাই বিদেশে বড় করছেন জয়। এদিকে জয়ের সহকর্মী পেস্ট্রি শেফ মধু ( জ্যোতির্ময়ী ) কে ছেলের জীবনের নতুন সংযোজন হিসেবে বেশ মনে ধরে গৌরের। তাঁর বিয়ের বাজনা বাজাতেই লন্ডনে হাজির হন তিনি। তবে, ভুললে চলবে না, গৌর বাবুর দুই মানব সন্তান ছাড়াও, তাঁর নিজের রক্তজলে বানানো বাড়িটিও তাঁর আরেক সন্তান। তাঁকে সেভাবেই স্নেহ করেন তিনি। এদিকে, গোটা সিনেমা জুড়ে আবারও নজর এসেছে আন্তর্জাতিক রাজনৈতিক প্রেক্ষাপটের নানা আলোচনা। ভারত-বাংলাদেশের সংঘর্ষের বিষয়গুলিকেও তুলে ধরা হয়েছে এই ছবিতে। জয় যে রেস্তরাঁয় কাজ করে তার হেড শেফ শাকিবুল হাসান (অনির্বাণ চক্রবর্তী)। গৌরের ছেলেকে আবার বিয়ে দিতে চাওয়া, শাকিবুলের চক্রান্তে জয়ের চাকরি চলে যাওয়া ইত্যাদি পেরিয়ে গল্প এগোতে থাকে। গল্পের মোড় ঘোরে ছেলেকে প্রতিষ্ঠিত করতে বাবার লড়াইয়ের মধ্যে দিয়ে।
এই ছবিতে সাধারণ মধ্যবিত্ত পরিবারের নিত্যদিনের স্বপ্ন দেখা, তা ভেঙে যাওয়া, আবার ভাঙা স্বপ্নের টুকরোগুলিকে একত্রিত করে ফের সেই দিকে এগিয়ে যাওয়া, পরিচালক অভিজিৎ সেন সুন্দরভাবে দেখিয়েছেন এই ছবিতে। জয় ও গৌরের ফুড ভেঞ্চার ব্যর্থ হওয়ার পর মায়ের পান্তাভাতের রেসিপি বিদেশে তাদের সেভিয়ার হয়ে দেখা দেয়। তবে এই ছবির প্রধান রসদই হল বাবা-ছেলের সহজ সরল সমীকরণ। যা প্রজাপতি থেকে শুরু হয়ে প্রজাপতি ২-এও মিশেছে। আগের ‘প্রজাপতি’ও একই কারণে দর্শকের আবেগে নাড়া দিয়েছিল। তবে এ ছবি আরও একটু বেশি আবেগতাড়িত করবে।
দেবের অভিনয় আগের চেয়ে আরও পরিণত। পর্দয় তাঁকে জয়ের চরিত্রে বেশ মানিয়েছে। মিঠুন চক্রবর্তীর কথা আলাদাভাবে বলার প্রয়োজন নেই। প্রজাপতি এবং প্রজাপতি ২ এই দুই ছবিতেই তিনি বাবার ভূমিকায় একেবারে যথাযোগ্য। বলা চলে এই দুই ছবির অভিভাবকই ছিলেন মিঠুন। অনির্বাণ চক্রবর্তী বা সিনেমায় নবাগত জ্যোতির্ময়ীও ভাল। ইধিকা ও দেবের রসায়ন দর্শকদের বরাবরই প্রিয়। এক্ষেত্রেও সেটা দেখা গিয়েছে। খরাজ ও অপরাজিতা আঢ্যের (দেবের দিদি ও জামাইবাবু) অভিনয়ও নজর কেড়েছে দর্শকদের।
কিন্তু ছবিটি কিছু কিছু জায়গায় একটু দীর্ঘায়িত মনে হয়। কিছু কিছু জায়গা একটু অবাস্তবও লাগে। যেমন লন্ডনের এক রেস্তরাঁর হেড শেফ শাকিবুলের এত ক্ষমতা যে তার কথায় লন্ডনে আর কোথাও নাকি কাজ পায় না জয়! আবার শেষ আধঘণ্টাতেও ছবিটি বড্ড সরলীকৃত মনে হয়। এতটাও সহজে সব কিছু কি ঘটে কখনও? আবার দেবের রেসিপি খুঁজে না পাওয়ার দৃশ্যটিও বেশ অবাস্তব, গুগলের যুগে এখন রেসিপি খোঁজা এক মিনিটের ব্যাপার। সিনোটোগ্রাফি অসাধারণ হলেও এডিটিংয়ে খামতি নজরে এসেছে। তবে এই ছবির গানগুলো মন ছুঁয়েছে সকলেপ। অনেকদিন পর জিৎ গঙ্গোপাধ্যায়কে পাওয়া গিয়েছে এই ছবিতে। সবশেষে বলাই চলে বছর শেষের আমেজে পরিবার নিয়ে প্রজাপতি ২ একবার হলেও দেখে আসা যায়। বিশেষ করে দেব-মিঠুনের জুটিকে যাঁরা পছন্দ করেন, তাঁদের জন্য এই বাবা-ছেলের সংঘর্ষের গল্প মন্দ লাগবে না।