
ছবির নাম-নারী চরিত্র বেজায় কঠিন
অভিনয়-অঙ্কুশ হাজরা, ঐন্দ্রিলা সেন, সোহাগ সেন, সোহিনী সেনগুপ্ত, দেবরাজ ভট্টাচার্য, নবনীতা মালাকার, ঈপ্সিতা সেন
পরিচালক-সাহিল-সুমিত
শুরু করার আগেই বলে নেওয়া ভাল পুরনো কাঠামোতে নতুন করে মাটি দিয়ে সেটাকে সকলের সামনে তুলে ধরার নাম হল 'নারী চরিত্র বেজায় জটিল'। ২০২৬-এর প্রথম মুক্তি পাওয়া বাংলা ছবি, যেটা নিয়ে বেশ হইচই চলছে হত কয়েকদিন ধরেই। 'মির্জা'র পর অভিনেতা-প্রযোজক অঙ্কুশ হাজরার এটি দ্বিতীয় প্রচেষ্টা। একেবারে রমকম ছবি এবং অবশ্যই আদ্যোপান্ত বাণিজ্যিক ঘরানার সিনেমা। ছবিটি প্রশংসিত হলেও এটি মেল গিবসন-হেলেন হান্ট অভিনীত ও ন্যান্সি মায়ার্সের পরিচালনায় ‘হোয়াট উইমেন ওয়ান্ট’-এর আদলে তৈরি।
২০০০ সালে তৈরি এই হলিউডি ছবিতে দেখানো হয়, নিক মার্শাল এক দুর্ঘটনার পর নারীদের মনের কথা শুনতে পারে। প্রথমে ক্ষমতাটাকে সে ব্যবহার করে নিজের সুবিধের জন্য, ঠকাতে, জিততে, নিয়ন্ত্রণ করতে। কিন্তু সময়ের সঙ্গে সঙ্গে সে বুঝে ফেলে—শোনা আর বোঝার মধ্যে বিস্তর তফাত। আর সেখান থেকেই বদলে যাওয়ার গল্প শুরু হয়। হলিউডের সেই গল্পকেই বাঙালিয়ানায় মুড়িয়েছেন পরিচালক দ্বয় সুমিত ও সাহিল, যাঁদের সঙ্গে অঙ্কুশ ও ঐন্দ্রিলার প্রথম ছবি। তাই যাঁরা ‘হোয়াট উইমেন ওয়ান্ট’ দেখেছেন তাঁদের কাছে নারী চরিত্র বেজায় জটিল সেভাবে মনে দাগ ফেলতে পারবে না।
ছবির গল্প শুরু হয় ঝন্টু (অঙ্কুশ হাজরা)-কে ঘিরে। ঝন্টু ইভেন্ট ম্যানেজমেন্ট সংস্থা চালায়। কাজের ছেলেই বলা চলে। পুরনো বাড়িতে মা, বোন, ঠাকুমার সঙ্গে থাকে সে। আর এই বাড়িতেই ভাড়া থাকে ‘আঁখি’ (ঐন্দ্রিলা সেন) নামের একজন। মেয়েদের ঝন্টুর ভালো লাগে কিন্তু বয়স বাড়লেও এতগুলো বছরে নারীর মনের গতিবিধি ঝন্টু বুঝতেই পারেনি। মানুষটা সে মন্দ নয় তবে স্রেফ চালাকি দিয়ে কাজ হাসিল করতে শিখেছে। আঁখির প্রতি রয়েছে বিশেষ দুর্বলতা, কিন্তু অনুভূতি বোঝার জায়গায় জিরো ঝন্টু। এমন এক পরিস্থিতিতে ঝন্টুর গালে এসে পড়ে মা কালীর ইয়া বড় থাপ্পড়! ব্যস এরপর থেকেই নারীর মনের সব কথাই বুঝতে শুরু করে দেন ঝন্টু। আর যার ফলে মেয়েদের জটিল মনের গোপন খবর সবই ধীরে ধীরে ধরতে পারেন। নানান পরিস্থিতির মধ্যে গল্প এগোতে থাকে। ছবিতে ঝন্টু নারীদের প্রেম, রাগ, হতাশা, অভিমান সবটাই অুভব করতে শেখেন।
ছবির গল্প একেবারে সহজ-সরল কিন্তু কমেডিতে ঠাসা, সঙ্গে অবশ্য আবেগকেও গুরুত্ব দেওয়া হয়েছে সমানভাবে। ঝন্টুর চরিত্রে অঙ্কুশ হাজরা ছাড়া আর কেউ যে জুতো গলাতে পারতেন না, তা একেবারে স্পষ্ট। তাঁর অভিনয় এতটাই পাকা যে কখনও তাঁকে ছ্যাবলা বলে মনে হবে না। প্রতিটি দৃশ্যে সংলাপের টাইমিং মেপে, ঝন্টুকে দেখে হাসি বেরিয়ে আসে। ছোট ছোট সংলাপে ভর করেই অঙ্কুশ দৃশ্যের ছাপ রেখে যান। অপরদিকে, আঁখি চরিত্রে ঐন্দ্রিলা একেবারে দুর্দান্ত, অঙ্কুশের সঙ্গে পাল্লা দিয়ে অভিনয় করেছেন তাঁর অফস্ক্রিন প্রেমিকা। ছবির অন্যতম বড় সম্পদ দুই প্রবাদপ্রতিম অভিনেত্রী—সোহিনী সেনগুপ্ত এবং সোহাগ সেন। মঞ্চে যাঁরা দাপিয়ে বেড়ান, তাঁরা জানেন ক্যামেরার ফ্রেমে কতটুকু অভিনয়ই যথেষ্ট। সোহাগ সেনের প্রতিটি ক্ষুদ্র অভিব্যক্তি নজরকাড়া—রাগ দেখানো অভিনয় এখানে ম্যানারিজমে রূপ নিেয়ছে, বয়স আর অভিজ্ঞতার ছাপ রেখে। অন্যদিকে সোহিনী সেনগুপ্তর দেড় মিনিটের সেই মোনোলগ—একজন মায়ের ভেতরের না-বলা কথাগুলো যেভাবে তিনি উজাড় করে দেন, সেখানে দর্শকের চোখ-মনের অন্য কোথাও যাওয়ার সুযোগ থাকে না। প্রতিটি শব্দ আলাদা করে থেকে যায়। আর ছবির শুরু থেকে শেষ পর্যন্ত যিনি না থেকেও আছেন তিনি হলেন প্রসেনজিৎ চট্টোপাধ্যায়। তাঁর কণ্ঠস্বর এই ছবির এক পৃথক চরিত্র হয়ে উঠেছে। কীভাবে, হল-এ গিয়ে দেখতে হয়।
ছবির কিছু খামতি রয়েছে। যেমন কিছু সংলাপ অতিরিক্ত চটুল। এই সিনেমার মূল বার্তা ইতিবাচক, নারীকে সম্মান করার কথাই বলে, কিন্তু সেইটা করতে গিয়ে কিছু বাক্যে গরমিল হয়ে গিয়েছে। সেইখানে নজর দিলে ভালো হত। গানের দিক থেকে বলতে গেলে শিলাজিতের ডান্ডা ২.০’ দর্শক-শ্রোতার ভালো লাগছে। আর সোমলতা-দুর্নিবারের কণ্ঠে ‘শোনো গো দখিন হাওয়া’ ছবির সেরা প্রাপ্তি। এই গানে অঙ্কুশ-ঐন্দ্রিলার কেমিস্ট্রি থেকে চোখ সরবে না। সব মিলিয়ে বলা চলে নারী চরিত্র বেজায় জটিল একবার হলেও দেখে আসা যায়। গল্প সহজ, সরল, কমেডিতে ভরপুর। ছবির মূল বার্তা নারীদের মনকে বোঝা, সেদিকেই ফোকাস এই ছবি।