
গত ২৯ মার্চ, রবিবারের পর থেকে তোলপাড় টলিউড। রাহুল অরুণোদয় বন্দ্যোপাধ্য়ায়ের আকস্মিক মৃত্যুতে এখনও শোকস্তব্ধ সকলে। শোকের ছায়া বাংলা বিনোদন জগতে। এই মৃত্যু ঘিরে রয়েছে নানা ধোঁয়াশা। ইন্ডাস্ট্রির প্রায় সকলেই তুলছেন নিরাপত্তা নিয়ে প্রশ্ন। সেই সঙ্গে এই ঘটনার নিরপেক্ষ তদন্তের দাবি করছেন প্রায় সকলেই। প্রযোজনা সংস্থার বিরুদ্ধে আর্টিস্ট ফোরাম ও প্রিয়াঙ্কা সরকার অভিযোগ দায়ের করেছেন। ৭ এপ্রিল থেকে নিজেদের সুরক্ষার দাবিতে অনির্দিষ্টকালের জন্য কর্মবিরতির ডাক দিয়েছিল টলিপাড়া। মঙ্গলবার, টেকনিশিয়ান স্টুডিওয় দিনভর দফায় দফায় বৈঠক হয়। পরে সাংবাদিক বৈঠকে একাধিক পদক্ষেপের ঘোষণা করেন রঞ্জিত মল্লিক, প্রসেনজিৎ চট্টোপাধ্যায়, ঋতুপর্ণা সেনগুপ্তরা।
টলিপাড়ার সিদ্ধান্ত
টলিপাড়ার বৈঠকের মাধ্যমে সিদ্ধান্ত হয়, কর্মবিরতি প্রত্যাহার করছেন তাঁরা। ম্যাজিক মোমেন্টস মোশন পিকচার্স বা ওই প্রযোজনা সংস্থার সঙ্গে যুক্ত কারও সঙ্গে কোনও কাজ আপাতত করবেন না শিল্পী বা টেকনিশিয়ানরা। ইন্ডাস্ট্রির নিরাপত্তাব্যবস্থা আরও কড়া করতে, আগামী পনেরো থেকে তিরিশ দিনের মধ্যে তৈরি করা হবে আদর্শ পরিচালনা পদ্ধতি বা স্ট্যান্ডার্ড অপারেটিং প্রসিডিয়োর (এসওপি)। এছাড়া শিল্পী এবং কলাকুশলীদের জন্য তৈরি হবে বীমা। যত দিন না সেই বীমা তৈরি হচ্ছে, তত দিন ঝুঁকি নিয়ে এমন কোনও জায়গায় শ্যুটিং করা যাবে না বলে জানানো হয়েছে। শুধু তাই নয়, সর্বভারতীয় স্তরেও যাতে ওই প্রযোজনা সংস্থার সঙ্গে কেউ কাজ না করেন, সেই আবেদনও করা হয়।
সংবাদমাধ্যমকে প্রসেনজিৎ জানান, "রাহুলের মৃত্যুর পর সোশ্যাল মিডিয়ায় ‘বিচার’ চেয়ে অজস্র প্রশ্ন রাখা হয়েছিল। কথা নয়, আমরা কাজের মাধ্যমে উত্তর দিলাম। আপাতত বাংলায় তাঁর কাজ বন্ধ হল। আগামী দিনে আর কী করতে চলেছে আর্টিস্ট ফোরাম, তার জন্য সবাই আর কয়েকটি দিন অপেক্ষা করুন।"
বন্ধ হচ্ছে 'ভোলেবাবা পার করেগা'
'ভোলে বাবা পার করেগা' ধারাবাহিকে শ্যুট করার সময়ই সমুদ্রে ডুবে মৃত্যু হয় রাহুলের। স্বাভাবিকভাবেই অনিশ্চিত ছিল এই মেগার ভবিষ্যৎ। ফের নতুন মোড়কে শুরু হয়েছিল 'ভোলে বাবা পার করেগা'। তবে, সোমবার রাতে জানা যায়, হঠাৎই বন্ধ করার সিদ্ধান্ত নেয় চ্যানেল। অনেকেই মন্তব্য করেছেন, এই ধারাবাহিক চালানো অত্যন্ত 'অমানবিক'। মনে করা হচ্ছে,সোশ্যাল মিডিয়ায় চরম কটাক্ষ এবং অভিনেতাদের বিরূপ প্রতিক্রিয়া দেখেই তড়িঘড়ি সোমবার এই এই সিদ্ধান্ত নিয়েছিল চ্যানেল।
বন্ধ হচ্ছে 'চিরসখা', 'কনে দেখা আলো'?
মঙ্গলবার রাতে আর্টিস্ট ফোরামের তরফ থেকে বিবৃতিতেও পরিষ্কার জানিয়ে দেওয়া হয়েছে, 'লীনা গঙ্গোপাধ্যায় ও শৈবাল বন্দ্যোপাধ্যায়ের নাম যে যে প্রযোজনার সঙ্গে যুক্ত আছে ও থাকবে সেই সমস্ত ধারাবাহিক (ম্যাজিক মোমেন্টস মোশন পিকচার্স-র 'চিরসখা' ও অর্গানিক স্টুডিওস প্রাইভেট লিমিটেট-র 'কনে দেখা আলো') কোনও শিল্পী ও কলাকুশলী অংশ নেবেন না। অর্গানিক স্টুডিওস প্রাইভেট লিমিটেট, লীনার ছেলে অর্ক গঙ্গোপাধ্যায়ের প্রযোজনা সংস্থার। নেটমাধ্যমে প্রাপ্ত তথ্য অনুযায়ী, লীনা নিজেও এই সংস্থার ডিরেক্টর, গল্প ও চিত্রনাট্য লেখিকা। ফলে 'চিরসখা'-র পাশাপাশি, 'কনে দেখা আলো'-র ভবিষ্যৎও বিষ বাঁও জলে। শোনা যাচ্ছে রবিবারই শেষ সম্প্রচার হবে 'চিরসখা'-র পর্ব। আগামী ১৩ এপ্রিল থেকে রাত ১০টায়, 'চিরসখা'-র স্লটে সম্প্রচারিত হবে নতুন মেগা 'সংসার সংকীর্তন'। এই সময় সম্প্রচারিত হত।
অন্যদিকে, 'কনে দেখা আলো' কবে- কীভাবে শেষ হবে বা এর ভবিষ্যৎ কী তা এখনও পরিষ্কার নয়। তবে কিছু ক্ষেত্রে এই ধারাবাহিকটি চলার সম্ভবনা রয়েছে। যদি, লীনা গঙ্গোপাধ্য়ায় সরে দাঁড়ান এই মেগা সিরিয়াল থেকে। যার অর্থ, এই মেগার গল্প, চিত্রনাট্য লেখার দায়ভার যদি অন্য় কেউ নেয়, অথবা প্রযোজনা সংস্থাকেই যদি বদলে দেয় জি বাংলা। জানা যাচ্ছে, অতীতে এরকম বেশ কিছু উদাহরণ আছে, যেখানে প্রযোজনার রাশ নিজের হাতেই তুলে নিয়েছে চ্য়ানেল। ইতিমধ্যেই লাজু- অনুভাবদের গল্প শেষ হতে পারে শুনে মন খারাপ অনুগামীদের। এবার দেখার, শেষমেশ কী সিদ্ধান্ত নেওয়া হয়।
জাতীয় স্তরের ধারাবাহিক
বাংলার পাশাপাশি, জাতীয় স্তরেও একাধিক মেগা সিরিয়াল চলে লীনা, শৈবালের প্রযোজনা সংস্থার ব্যানারে। জনপ্রিয় বাংলা ধারাবাহিক 'শ্রীময়ী'-র হিন্দি সংস্করণ 'অনুপমা' দারুণ জনপ্রিয়। সেখানে ইন্দ্রাণী হালদারের জায়গায়, নায়িকার ভূমিকায় অভিনয় করছেন বাঙালি অভিনেত্রী রূপালি গঙ্গোপাধ্যায়। সেখানে যোগ দিয়েছেন আরও এক বঙ্গ তনয়া অদ্রিজা রায়। এছাড়াও লীনা-শৈবালদের ঝুলিতে রয়েছে 'ঝনক', 'কভি কভি ইত্তেফাক সে'-র মতো মেগা। এই সব ধারাবাহিকের ভবিষ্যৎ কী হবে, তা নিয়েও প্রশ্ন থেকেই যাচ্ছে।
প্রসঙ্গত, টলিপাড়ার পরিচিত মুখ রাহুল অরুণোদয় বন্দ্যোপাধ্যায়। সপ্তাহখানেক আগে, তালসারিতে 'ভোলে বাবা পার করেগা' ধারাবাহিকের শ্যুটিং করতে গিয়ে জলে ডুবে মৃত্যু হয় অভিনেতার। স্বাভাবিকভাবেই তাঁর মৃত্যু নিয়ে একাধিক প্রশ্ন উঠে আসে। সেদিনই পূর্ব মেদিনীপুর জেলা পুলিশের পক্ষ থেকে রাহুলের মৃত্যু নিশ্চিত করা হয়। ছোটপর্দা, বড়পর্দা, মঞ্চ থেকে ওটিটি, সব মাধ্যমেই নিজের অভিনয় দক্ষতায় সকলের মন বারবার জয় করেছেন। সম্প্রতি নিজের পডকাস্ট চ্যানেলের মাধ্যমের সকলের মনের আরও কাছে পৌঁছান অভিনেতা।
তাম্রলিপ্ত মেডিকেল কলেজ হাসপাতালে প্রয়াত অভিনেতার ময়নাতদন্ত হওয়ার পরই দেহ পরিবারের হাতে তুলে দেওয়া হয়। মৃত্যুর পরের দিন, সোমবার তাম্রলিপ্ত হাসপাতাল সূত্রের খবর, যে পরিমাণ বালি ফুসফুসে পাওয়া গিয়েছে তা অস্বাভাবিক। কম সময় জলে ডুবে থাকলে এত বালি পাওয়া যেত না। সংবাদমাধ্যমে প্রকাশ, অন্তত এক ঘণ্টা জলের তলায় ডুবে ছিলেন রাহুল। জলের তলায় হয়তো সেই অবস্থাতেই পড়েছিলেন। সেই কারণে হয়তো তাঁর দেহ থেকে এতটা বালি ও নোনা জল মিলেছে।