
গত ২৯ মার্চ, রবিবারের পর থেকে তোলপাড় টলিউড। রাহুল অরুণোদয় বন্দ্যোপাধ্য়ায়ের আকস্মিক মৃত্যুতে এখনও শোকস্তব্ধ সকলে। শোকের ছায়া বাংলা বিনোদন জগতে। এই মৃত্যু ঘিরে রয়েছে নানা ধোঁয়াশা। উঠে আসছে নানা রকম তত্ত্ব। ইন্ডাস্ট্রির অনেকেই তুলছেন নিরাপত্তা নিয়ে প্রশ্ন। এই ঘটনার নিরপেক্ষ তদন্তের দাবি করছেন অনেকেই। প্রযোজনা সংস্থার বিরুদ্ধে আর্টিস্ট ফোরাম ও প্রিয়াঙ্কা সরকার অভিযোগ দায়ের করেছেন। আগামী মঙ্গলবার থেকে নিজেদের সুরক্ষার দাবিতে অনির্দিষ্টকালের জন্য কর্মবিরতির ডাক দিয়েছে টলিপাড়া। এবার মুখ খুললেন লীনা গঙ্গোপাধ্যায়ের ছেলে তথা প্রযোজক অর্ক গঙ্গোপাধ্যায়।
রাহুলের মৃত্যুর এক সপ্তাহ পর, সোশ্যাল মিডিয়ায় একটি দীর্ঘ পোস্ট করেছেন অর্ক। সেই পোস্টে একদিকে যেমন রাহুলের সঙ্গে তাঁর বন্ধুত্বের অজানা গল্প, রসায়ন, কথোপকথন তুলে ধরেছেন, সেরকম কটাক্ষ করতেও ছাড়েননি টলিউডের এক পরিচালককে। অর্ক লিখেছেন কীভাবে 'ভোলেবাবা পার কারেগা' ধারাবাহিকে কাজ পেয়েছিলেন রাহুল। তাঁর মা, লীনা রাহুলকে একজন শিল্পী হিসাবে কথা সম্মান করেন, একথাও লিখেছেন তিনি। অর্ক যোগ করেছেন, রাহুলের পডকাস্ট 'সহজ কথা'-র সাফল্যের পিছনে তাঁর হাতও রয়েছে। যদিও তাঁর এই পোস্টের কমেন্ট সেকশন বন্ধ করে রেখেছেন তিনি।
ফেসবুকে অর্ক লিখেছেন, "আমি সেদিন কলকাতায়, প্ল্যান করলাম মুভিটোনে দেখা করতে যাব - বলল ৪টে অবধি আছি, কখন আসবি? আমি বললাম জানাচ্ছি। সেই জানানো আর হয়নি। আসলে মানুষ থাকলে তো কখনো বোঝা যায় না যে এর পর আবার কখনো দেখা নাও হতে পারে। ভেবেছিলাম হয়তো নেক্সট বার এসে দেখা করব। দেখা কিন্তু সেই নেক্সট বারেই হলো, কেওড়াতলা শ্মশানে। আমি এক কোণায় দাঁড়িয়ে থাকলাম - আর ও আমাদের দেখতেও পেল না। না কি হয়তো দেখতে পেল, কি জানি!"
তাঁর কথায়, "আমি ম্যাজিক মোমেন্টস-এর মুখপাত্র নই - কি হয়েছে এটা একজন প্রত্যক্ষদর্শীর মতো বলা একটা মানুষের পক্ষে সম্ভব নয় যে তখন ঘটনাস্থল থেকে বহু কিলোমিটার দূরে। ঘটনাস্থলে অনেক কলাকুশলী ছিলেন, অভিনেতারা ছিলেন - তারা যা বলেছেন তার থেকেই আমাদের সবাইকে ইনফারেন্স ড্র করতে হচ্ছে। পুলিশ তদন্তের জন্য অনেক ডকুমেন্ট, ফুটেজ ইত্যাদি সিজ করেছে বলে জানি। রাহুলের শেষ মুহূর্তের ভিডিও ফুটেজ ড্রোন ক্যামেরা-য় বন্দি। সেই ফুটেজ দেখতে চাওয়ার অধিকার অবশ্যই রাহুলের পরিবারের মানুষদের থাকতে পারে, কিন্তু আপনারা যারা বলছেন সেটাকে সোশ্যাল মিডিয়া-তে পাবলিক করে দেওয়া হোক - তারা কি বলছেন ভেবে বলছেন তো?"
অর্ক আরও লেখেন, "আমি জানি ওর পরিবারের মানুষ জানতে চায় এত স্টেটমেন্ট-এর মধ্যে কোনটা তারা বিশ্বাস করবেন, কি সেফটি মেজারস ছিল, আমার ধারণা সেটা জানতে চাওয়ার পূর্ণ অধিকার ওর পরিবার, বন্ধু বান্ধবদের রয়েছে। তাই প্রোডাকশন কোম্পানি-র থেকে জানতে চাওয়া বা পূর্ণ তদন্তের দাবি করা বা পুলিশ-এর থেকে জানতে চাওয়া-এর সবকটাই স্বাভাবিক এবং যথেষ্ট ন্যায্য। যদি অবহেলার ১% ও সম্ভাবনা থাকে, তার তদন্ত হওয়া উচিত, প্রতিবাদ হওয়া উচিত, পদযাত্রাও হওয়া উচিত। কিন্তু আপনাদের বিবেককে একবার জিজ্ঞেস করুন- যাদের প্রথম সারিতে রেখে আপনারা হাঁটলেন, তাদের দেখতে পেলে রাহুল নিজে লজ্জিত হত না তো? ইন্ডাস্ট্রি-র মার্কা মারা ধারাবাহিক যৌন অপরাধী- যিনি কোনও পাবলিক ইভেন্ট-এ গেলে মহিলারা তার কাছাকাছি যেতে নিরাপদ বোধ করেন না,যার জন্য প্রতিবাদ করতে আপনারাই কিছুদিন আগে পথে নেমেছিলেন -তিনি নিজের ইমেজ শুধরাতে ২ মিনিটের নিম্ন মানের অভিনয় করলেন, ভালো লাগলো আপনাদের? গর্ব বোধ করলেন? যে প্রোডিউসারদের শর্ট-এ চিটিংবাজ বলে ডাকেন, যাদের ফাইনান্সিয়াল মিসকনডাক্টের জন্য সমস্ত চ্যানেল থেকে কাজ দেওয়া বন্ধ করে দেওয়া হয়েছে, তারা নিজের প্রাসঙ্গিকতা খুঁজে পাওয়ার জন্য মরিয়া হয়ে মিথ্যে কথা রটাচ্ছে। আপনারাও জানেন সেটা। যাই হোক। ইন্ডাস্ট্রি-তে সেফটি অ্যান্ড সিকিউরিটি-র স্ট্যান্ডার্ডাইজেশন হওয়া উচিত - কিন্তু গা বাঁচানোর আর পার্সোনাল অ্যাটাক আর নিজের পার্সোনাল এজেন্ডা-কে এস্টাবলিশ করার র্যালি হওয়া উচিত নয়। এটা আপনারাও জানেন - হয়তো ভেবে দেখেননি, তাই একটু ভাবতে অনুরোধ করলাম। তারপর আপনাদের যা ঠিক মনে হয় সেটাই করবেন।"
সব শেষে রাহুল-পুত্র সহজের জন্যেও একটি বার্তা দিয়েছেন অর্ক। তিনি লিখেছেন, "সহজ, তুমি আমাকে কখনও দেখোনি কিন্তু তুমি আমার খুব আদরের। আমি জানি তুমি অলরেডি এক ঝটকায় অনেকটা বড় হয়ে গেছো, আরও বড় যখন হবে তখন নিশ্চয়ই পুরো বিষয়টা বুঝবে। কারুর কথা শুনে নয়, নিজের বিচার বুদ্ধি দিয়েই বুঝবে। তখন হয়তো বুঝবে এই আঙ্কলটা তোমার বাবাকে আরো অনেকের মতনই ভালোবাসত। অনেক আদর।"
প্রসঙ্গত, টলিপাড়ার পরিচিত মুখ রাহুল অরুণোদয় বন্দ্যোপাধ্যায়। এক সপ্তাহ আগে, তালসারিতে 'ভোলে বাবা পার করেগা' ধারাবাহিকের শ্যুটিং করতে গিয়ে জলে ডুবে মৃত্যু হয় অভিনেতার। স্বাভাবিকভাবেই তাঁর মৃত্যু নিয়ে একাধিক প্রশ্ন উঠে আসে। রবিবার পূর্ব মেদিনীপুর জেলা পুলিশের পক্ষ থেকে রাহুলের মৃত্যু নিশ্চিত করা হয়। ছোটপর্দা, বড়পর্দা, মঞ্চ থেকে ওটিটি, সব মাধ্যমেই নিজের অভিনয় দক্ষতায় সকলের মন বারবার জয় করেছেন। সম্প্রতি নিজের পডকাস্ট চ্যানেলের মাধ্যমের সকলের মনের আরও কাছে পৌঁছান অভিনেতা।
তাম্রলিপ্ত মেডিকেল কলেজ হাসপাতালে প্রয়াত অভিনেতার ময়নাতদন্ত হওয়ার পরই দেহ পরিবারের হাতে তুলে দেওয়া হয়। মৃত্যুর পরের দিন, সোমবার তাম্রলিপ্ত হাসপাতাল সূত্রের খবর, যে পরিমাণ বালি ফুসফুসে পাওয়া গিয়েছে তা অস্বাভাবিক। কম সময় জলে ডুবে থাকলে এত বালি পাওয়া যেত না। সংবাদমাধ্যমে প্রকাশ, অন্তত এক ঘণ্টা জলের তলায় ডুবে ছিলেন রাহুল। জলের তলায় হয়তো সেই অবস্থাতেই পড়েছিলেন। সেই কারণে হয়তো তাঁর দেহ থেকে এতটা বালি ও নোনা জল মিলেছে।