
বিধানসভা নির্বাচন (Bidhansabha Nirvachan) একেবারে দোরগোড়ায়। নির্বাচনী নির্ঘণ্ট (Election Dates) সামনে এসেছে। চারিদিক ভোট- ভোট আবহ। এমনকী, বিভিন্ন দলের প্রার্থীরা পুরোদমে প্রচার শুরু করেছেন। ভোটের আগে, সক্রিয় রাজনীতিতে যোগদান, দল বদল ইত্যাদি চেনা ছবি। তবে রাজ্যবাসী কিছুটা অবাক হয়েছে সম্প্রতি এক ঘটনায়। মিশ্র প্রতিক্রিয়া সমাজমাধ্যমে। বিজেপি-তে যোগ দেওয়ার কথা বলেছেন আরজি করের নির্যাতিতার বাবা- মা (RG Kar Victim Parents)। শুধু তাই নয়, পানিহাটি থেকে বিজেপি (BJP)-র হয়ে প্রার্থী হতে পারেন নির্যাতিতার মা। এই ঘটনায় আন্দোলন নিয়ে তাঁদের করা মন্তব্য এই মুহূর্তে আলোচনায়।
আরজি কর হাসপাতালে (RG Kar Hospital) মহিলা চিকিৎসককে ধর্ষণ- খুনের ঘটনার জেরে ধুন্ধুমার হয় শহর- শহরতলি। জেলায় জেলায় চলে বিক্ষোভ। গর্জে ওঠে দেশবাসী। এমনকী প্রতিবাদে সরব হন প্রবাসীরাও। সুবিচার ও নিরাপত্তার দাবিতে, প্রতিবাদে শামিল হন বিভিন্ন সরকারি হাসপাতালের জুনিয়র ডাক্তাররা। দীর্ঘদিন তাঁদের কর্মবিরতি চলে। ২০২৪ সালে মহিলা চিকিৎসকের মর্মান্তিক মৃত্যুতে সরব হন সমাজের বিভিন্ন স্তরের মানুষেরা।
সেসময় প্রতিবাদে সামিল হন বিনোদন জগতের শিল্পী ও কলাকুশলীরাও। শুধু টলিউড না, সরব হয় বলিউডও। তবে অন্যান্য বহু ইন্ডাস্ট্রির মতো এই ঘটনার অনেকটাই প্রভাব পড়েছিল টলিপাড়ায়। সোশ্যাল মিডিয়ায় বা পথে নেমে 'জাস্টিস' চাওয়াতেই শুধু থেমে ছিল না স্টুডিওপাড়া। স্থগিত ছিল একাধিক ছবি টিজার, ট্রেলার মুক্তি। পিছিয়ে যায়, ছবি মুক্তিও। এই আন্দোলনে শুরু থেকে সামিল ছিলেন কয়েকজন টলি শিল্পী। নির্যাতিতার মায়ের মন্তব্যে আজতক বাংলার (bangla.aajtak.in) কাছে প্রতিক্রিয়া দিলেন, আরজি কর আন্দোলনের তিন প্রতিবাদী অভিনেত্রীরা।
উষসী চক্রবর্তী জানালেন, "মীনাক্ষি মুখোপাধ্যায় যেমন বলেছেন, অভয়া আমাদের সবার মেয়ে, সেটাই বলতে চাই। ওরকম একটা নারকীয় ঘটনায় আমরা সবাই রাস্তায় নেমেছিলাম। আবার যদি নারী সুরক্ষা সম্পর্কিত কোনও এরকম ঘটনা ঘটে, আমরা আবার রাস্তায় নামবো। আমাদের তরফ থেকে যেটুকু করণীয় বলে আমাদের তখন মনে হয়েছে, করেছি। ভবিষ্যতেও করব। এর বাইরে কে কী বললেন, কে কী করলেন গুরুত্বপূর্ণ না। অভয়ার বাবা- মা, কাকু- কাকিমার হয়তো মনে হয়েছে যে, কোনও নির্দিষ্ট রাজনৈতিক দল করলে তাঁরা জাস্টিস পাবেন। কিন্তু আমার মনে হয়, ওঁরা কোনও রকম হতাশা বা ট্রমা থেকে এটা করেছেন। এটা নিয়ে আমার কিছু বলার নেই। কারণ যাঁদের মেয়ে হারিয়েছে, তাঁরাই জানে যে তাঁরা কীসের ওপর দিয়ে গেছে। আমাদের কাজ আমরা করব। আগেরবারও করার চেষ্টা করেছি। হয়তো সফল হতে পারিনি। অভয়া আমাদের সবার মেয়ে। অভয়ার জন্য যেটা ঠিক মনে হয়েছে আমরা অতীতেও করেছি এবং ভবিষ্যতেও করব। কেউই আমাদের আটকাতে পারবে না।"
শ্রীলেখা মিত্র বলেন, "একজন বাবা- মা, যারা এতদিন অপেক্ষা করছেন বিচারের জন্য। বর্তমান সরকারের ওপর সব রকম আস্তা তাঁরা হারিয়ে ফেলেছেন। তাঁদের কাছে, রাম-বাম ম্যাটার করে না। সন্তানের এভাবে মৃত্যু কোনও বাবা- মায়ের পক্ষে মেনে নেওয়া সম্ভব না। হয়তো তাঁরা মনে করেছেন, যেহেতু কেন্দ্রে বিজেপি, তাই জিতলে সুবিধা হতে পারে। আমি সরাসরি বাম রাজনীতি করি না, তবে সমর্থন করি। কিন্তু এরপরেও আমি বলব, এখানে এটা ম্যাটার করে না।"
অভিনেত্রী যোগ করেন, "এটা ঘটনা যে, সেদিন কলতান, মীনাক্ষিরা গাড়ি না আটকালে বোঝা যেত না যে, মৃত্যুটা কীভাবে হয়েছে। সারা পৃথিবীজুড়ে সবাই যেভাবে রাস্তায় নেমেছিল, আন্দোলন শুরু হয়েছিল, এত কিছু হয়ত হত না। এটা আত্মহত্যা বলে চালিয়ে দেওয়া হত। কিন্তু তারপরেও তো অভয়া মঞ্চ বা কেউ কিছু করতে পারেনি। কারণ সত্যি এই দল এখন ক্ষমতায় নেই। তাই তাঁদের হয়তো মনে হয়েছে আমার মেয়ের বিচারটা আগে যে এনে দিতে পারবে। সে যে কেউ হোক। তাই এই সরকারের বিপক্ষে যে দল ক্ষমতায় আছে, তাঁরা সেই দলেই হয়তো যাচ্ছেন। সন্তান ফিরে না আসলেও, তাঁদের সন্তানের বিচারটাই হয়তো এখন প্রথম ও শেষ কথা। বাম সমর্থকেরা অনেকে হয়তো অনেক কিছু ভাবতে বা বলতে পারেন। কিন্তু আমরা তো তাঁদের জায়গায় নেই। এত উপর-উপর এই বিষয়টা দেখলে হবে না। এই ব্যাপারটার আরও অনেক বিষয় আছে, যেটা আমরা বুঝব না। কিন্তু বোঝার চেষ্টা অনন্ত করা উচিত। আজ যদি এই সরকার বলত, তাঁদের মেয়েকে জাস্টিস পাওয়ানোর কথা, তাহলে হয়তো তৃণমূলকে সমর্থন করতেন। ফলে, এক্ষেত্রে আমি বাম- রাম কিছুই দেখছি না। সেই বাবা ও মায়ের কষ্ট ঘুচে যাক, সেটা তাঁরা যেভাবেই মনে করেন। আমি সবাইকে বলব, তাঁদের ক্ষেত্রে কোনও আজেবাজে কথা আপনারা না লিখে, দয়া করে একটু অন্যভাবে ভাববেন।"
দেবলীনা দত্ত জানালেন, "অভয়ার মায়ের মতো যে মায়েরা রয়েছেন এই মুহূর্তে, আমি কারও জুতোয় পা রেখে হেঁটে দেখিনি কীরকম লাগে। কিন্তু এঁদের কারও জুতোয় পা রাখার কথা ভাবলেও আমি আঁতকে উঠি, রাতের ঘুম উড়ে যায়। ওই জুতোয় পা রাখলে আমি কী করতাম, কী বলতাম, আমার মাথা কাজ করত কিনা আমি সত্যি বলতে পারছি না। ফলে ওঁকে আমি কোনও কিছুর জন্যই দোষী সাব্যস্ত করতে রাজি নই। ওঁর যা ইচ্ছে তাই বলতে পারে, যা ইচ্ছে তাই করতে পারে। কোনও কিছুই ওঁর মেয়েকে ফিরিয়ে দেবে না। কষ্টটা বুকে নিয়েই ওঁকে শেষ নিঃশ্বাস অবধি বাঁচতে হবে। উনি প্রতিদিন মেয়ের ডাক শুনতে পান 'মা-মা' করে। চুল আঁচড়ান না। তাই আমার মনে হয়, ওঁকে আমরা একটু ছাড় দিই। ওঁকে আমরা সমালোচনার বাইরে রাখি। ওঁকে ওঁর মতো ছেড়ে দিই। এটুকু আমার মনে হয়।"
প্রসঙ্গত, গত বৃহস্পতিবার সংবাদমাধ্যমের সামনে আরজি করের নির্যাতিতার মা বলেন, "গতকাল আমি নিজেই ফোন করে প্রস্তাব দিয়েছি। BJP-র হয়ে ভোটে দাঁড়াতে চাই বলেছি। কারণ আমার মনে হয়েছে, নারীদের নিরাপত্তা এবং নারী সুরক্ষা এখানে নেই। আর পশ্চিমবঙ্গের রন্ধ্রে রন্ধ্রে দুর্নীতি। সেই তৃণমূলকে মূল থেকে উপড়ে ফেলতেই আমি BJP-তে যোগ দিচ্ছি।" নির্যাতিতার মা আরও বলেন, "বামপন্থীরা ভোট কেটে তৃণমূলকে জেতার সুযোগ করে দিয়েছে। সেটা বরানগর হোক বা পানিহাটি। CPIM-এর সদস্য তন্ময় ভট্টাচার্য নিজেই এ কথা বলেছেন। সজল ঘোষ হেরেছেন একমাত্র ওদের ভোট কাটার জন্যই। রাজনৈতিক হাতিয়ার হিসেবে আমার মেয়ের মৃত্যুকে কাজে লাগিয়েছিল ওরা। আমার মেয়েকে রাজনীতির ময়দানে নিয়ে এসেছিল।"