
এটিএম প্রতারণা কাণ্ডে গোয়েন্দাদের জালে আরও ১। বিমান ধরে দিল্লি পালানোর আগেই গ্রেফতার অভিযুক্ত। গত কয়েকদি ধরে এই ঘটনায় চাঞ্চল্য ছড়িয়েছে শহরে।
শহর জুড়ে লাগাতার এটিএম প্রতারণা কাণ্ডের মামলায় এই চক্রের আরও এক অন্যতম চাঁইকে গ্রেফতার করল কলকাতা পুলিশের গোয়েন্দা বিভাগ। বিমান ধরে দিল্লি পালিয়ে যাওয়ার চেষ্টা করেছিল সে।
তার আগেই মঙ্গলবার বিকেলে তাকে কলকাতা বিমানবন্দরের সামনে থেকে হাতেনাতে গ্রেপ্তার করেন গোয়েন্দারা। ধৃত মহম্মদ নাসিম ওরফে রাজবীর দিল্লির ওখলার বাসিন্দা।
মে মাসের মাঝামাঝি সময় থেকে কলকাতা শহরে একের পর এক এটিএম থেকে টাকা লোপাটের অপরাধে এই অভিযুক্ত প্রত্যক্ষভাবে জড়িত ছিল বলে দাবি কলকাতা পুলিশের। বুধবার তাকে আদালতে পেশ করে নিজেদের হেফাজতে চাইবে কলকাতা পুলিশ।
চলতি বছরের মে মাসের শেষের দিক থেকে কলকাতা পুলিশের কাছে একের পর এক অভিযোগ জমা পড়তে থাকে এটিএম প্রচারণা কাণ্ডে। পুলিশ সূত্রে খবর, উত্তর কলকাতা থেকে দক্ষিণ কলকাতার বিভিন্ন এটিএম, বিশেষ করে একটি বেসরকারি ব্যাঙ্কের একাধিক এটিএম থেকে টাকা লোপাট হয়ে যায়।
এই অভিযোগের তদন্ত হাতে নেয় কলকাতা পুলিশের গোয়েন্দা বিভাগের আন্টি ব্যাঙ্ক ফ্রড শাখা। তদন্তে নামার পর ফরেনসিক বিশেষজ্ঞরা এটিএমগুলি পরীক্ষা করেন। তারা জানান, এটিএম গুলি সম্পূর্ণ অক্ষত।
কারণ, এটিএম না খুলেই ভেতর থেকে বের করে নেওয়া হয়েছে লাখ লাখ টাকা। এর মধ্যেই নিউমার্কেট থানা এলাকার একটি বেসরকারি ব্যাঙ্ক এর এটিএম থেকে খোয়া যায় ১৮ লক্ষ টাকা। গোয়েন্দারা সরেজমিনে তদন্ত করে জানতে পারেন, সেখানেও এটিএম না খুলেই বার করে নেয়া হয়েছে ১৮ লক্ষ টাকা।
এরপরই বিশেষজ্ঞদের সাহায্য নিয়ে শুরু হয় জোরকদমে তদন্ত। জোরালো তদন্তে নেমেই রীতিমতো হকচকিয়ে যান তদন্তকারী আধিকারিক। গোয়েন্দারা জানতে পারেন, এক্ষেত্রে গ্রাহক সেজে টাকা তোলার নাম করে ঢুকে প্রথমে এটিএম এর উপরের হুড খুলে দিচ্ছে দুষ্কৃতীরা।
এরপরেই ব্যাঙ্ক সার্ভারের সঙ্গে এটিএমের সংযোগ স্থাপনকারী তারটি খুলে দেওয়া হচ্ছে। তারপর ব্যাঙ্ক সার্ভার এর জায়গায় বাইরে থেকে বসানো হচ্ছে একটি ইলেকট্রনিক ডিভাইস যা আসলে নকল ব্যাঙ্ক সার্ভার এর ভূমিকা পালন করছে এটিএমে।
ফলে আসল ব্যাঙ্ক সার্ভারের সঙ্গে সংযোগ স্থাপনের বদলে দুষ্কৃতীর বসানোর নকল ব্যাঙ্ক সার্ভারের সঙ্গে যোগাযোগ তৈরি হচ্ছে এটিএমের। তাই এরপর থেকে এটিএমে ঘটে যাওয়া কার্যকলাপের কোনও বার্তা পৌঁছাচ্ছে না ব্যাংকের কাছে।
ঠিক এই সুযোগেই লোপাট করা হচ্ছে টাকা। পুলিশ সূত্রে খবর, এটিএমে বসানো সেই মেশিনটি ইন্টারনেটের সাথে যুক্ত থাকায় বাইরে থেকে তার মধ্যে কম্যান্ড পাঠাতে পারছে দুষ্কৃতিরা।
এরপরেই তাতে পাঠানো কম্যান্ড অনুযায়ী আপনাআপনি টাকা বের করে দিচ্ছে এটিএম মেশিন। যা জানতেও পারছে না ব্যাঙ্ক কর্তৃপক্ষ। টাকা বার করে নেওয়া হলে, পুনরায় এটিএমকে স্বাভাবিক অবস্থায় ফিরিয়ে পালিয়ে যাচ্ছে দুষ্কৃতীরা।
এই ঘটনার তদন্তে নেমে ভিন রাজ্যের একটি ব্যাঙ্ক ফ্রড গ্যাংয়ের যোগাযোগ খুঁজে পান তদন্তকারীরা। এরপরই বিভিন্ন রাজ্যে ছড়িয়ে পড়ে কলকাতা পুলিশের গোয়েন্দাদের একাধিক দল।
অবশেষে গত ৫ জুন সুরাট থেকে দু'জন এবং কলকাতা থেকে দু'জনকে গ্রেফতার করে পুলিশ। পুলিশ সূত্রে খবর, ধৃতদের হেফাজতে নেওয়ার পর শুরু হয় লাগাতার জেরা। তাদেরকে জেরা করেই মহম্মদ নাসিম ওরফে রাজবীর নামে আরও এক দুষ্কৃতীর সন্ধান পায় পুলিশ।
রাজবীর এই গ্যাংয়ের অন্যান্য চক্রে বলে জানতে পারেন তদন্তকারীরা। অবশেষে এদিন বিকেলে গোপন সূত্রে খবর পেয়ে দিল্লি পালানোর আগেই কলকাতা বিমানবন্দরের সামনে থেকে তাকে হাতেনাতে গ্রেপ্তার করে পুলিশ।
এদিন পুলিশ জানিয়েছে, বিমান ধরে দিল্লি পালিয়ে যাওয়ার পরিকল্পনা ছিল অভিযুক্তর। আগামীকাল তাকে আদালতে পেশ করে নিয়ে নিজেদের হেফাজতে চাইবে পুলিশ। তাকে জেরা করে এই চক্রের আরও অনেক তথ্য হাতে পাওয়া যেতে পারে বলে মনে করছে পুলিশ।