
বিশ্বের সবচেয়ে জঘন্য অপরাধগুলির কথা উঠলেই জেফ্রি এপস্টাইনের নাম অনিবার্যভাবে সামনে আসে। যৌন পাচার, নাবালিকা নির্যাতন এবং ক্ষমতার অপব্যবহারে জড়িয়ে থাকা এপস্টাইনের অন্ধকার জগৎ একের পর এক স্তর খুলে দিচ্ছে। তথাকথিত ‘এপস্টাইন ফাইলস’ প্রকাশের সঙ্গে সঙ্গে এই কেলেঙ্কারির জালে জড়িয়ে পড়ছে বহু প্রভাবশালী নাম।
এই অপরাধের কেন্দ্রস্থল ছিল এপস্টাইনের ব্যক্তিগত দ্বীপ ‘লিটল সেন্ট জেমস’, যা ‘এপস্টাইন আইল্যান্ড’ নামেও পরিচিত। সেখানেই নাবালিকা মেয়েদের এনে নিয়মিত যৌন নির্যাতন চালানো হত বলে অভিযোগ। এতদিন যাঁদের কণ্ঠস্বর চাপা পড়ে ছিল, এখন তাঁরা একে একে সামনে আসছেন। তাঁদের মধ্যেই একজন মারিনা ল্যাসারডা। ২০১৯ সালের মামলায় যিনি ‘মাইনর ভিকটিম ১’ নামে পরিচিত ছিলেন।
ব্রাজিল থেকে নিউ ইয়র্ক: এক কিশোরীর ভয়াবহ যাত্রা
মারিনা একাধিক আন্তর্জাতিক সংবাদমাধ্যমে নিজের অভিজ্ঞতার কথা জানিয়েছেন। তিনি জানান, ব্রাজিল থেকে তিনি তাঁর মা ও বোনের সঙ্গে নিউ ইয়র্কে আসেন এবং একটি ছোট্ট ঘরে বসবাস শুরু করেন। মাত্র ১৪ বছর বয়সে পরিবারের খরচ চালাতে তাঁকে একসঙ্গে তিনটি কাজ করতে হত।
এই সময়েই এক বন্ধুর মাধ্যমে তিনি একটি ‘সহজ চাকরির’ প্রস্তাব পান। মাত্র ৩০০ ডলারের বিনিময়ে একজন 'বড়লোককে' ম্যাসাজ দেওয়া। সেই 'বড়লোক'ই ছিলেন জেফ্রি এপস্টাইন।
নিউ ইয়র্কের টাউনহাউসে প্রথম সাক্ষাতের পরই সেই তথাকথিত কাজ দ্রুত ভয়াবহ যৌন নির্যাতনে পরিণত হয়। মারিনা একে বর্ণনা করেছেন, 'স্বপ্নের চাকরি মুহূর্তের মধ্যে সবচেয়ে ভয়ঙ্কর দুঃস্বপ্নে বদলে গিয়েছিল।'
১৪ থেকে ১৭ বছর: অবিরাম নির্যাতনের অধ্যায়
প্রায় তিন বছর ধরে মারিনা এপস্টাইনের কবলে বন্দি ছিলেন। তিনি জানান, এপস্টাইন নিয়মিত ফোন করত এবং আরও কমবয়সি মেয়েদের নিয়ে আসতে চাপ দিত। এমনকি স্কুল আইডি দেখে মেয়েদের বয়স যাচাই করত সে।
মারিনার দাবি, প্রতিদিন এপস্টাইনের বাড়িতে ৫ থেকে ১০ জন মেয়ে আসত। একবার তিনি ১৮ বছরের এক তরুণীকে নিয়ে গেলে এপস্টাইন চিৎকার করে বলেন, সে 'খুব বেশি বয়স্ক'। মারিনা আরও জানান, এপস্টাইনকে তিনি একাধিকবার ডোনাল্ড ট্রাম্পের সঙ্গে দেখেছেন, যদিও সেই সময় তাঁর নিজের জীবনের আতঙ্কই সবকিছুর ঊর্ধ্বে ছিল।
২০০৮-এর নীরবতা, ২০১৯-এর বিস্ফোরণ
২০০৮ সালে এফবিআই মারিনার সঙ্গে যোগাযোগ করেছিল। তিনি গ্র্যান্ড জুরির সামনে সাক্ষ্য দিতে প্রস্তুত ছিলেন। কিন্তু একটি বিতর্কিত 'নন-প্রসিকিউশন ডিল'-এর মাধ্যমে এপস্টাইন আইনের ফাঁক গলে যায়, আর মারিনার কণ্ঠস্বরও চেপে রাখা হয়।
আজও মারিনা মনে করেন, যদি ২০০৮ সালেই তাঁকে কথা বলতে দেওয়া হত, তাহলে পরবর্তী বহু মেয়ে এই নরকযন্ত্রণার হাত থেকে বাঁচতে পারত।
২০১৯ সালে মামলাটি নতুন করে খোলার পর মারিনার সাক্ষ্যই এপস্টাইনের বিরুদ্ধে যৌন পাচারের অভিযোগের মেরুদণ্ড হয়ে ওঠে। যদিও এপস্টাইন কারাগারে রহস্যজনকভাবে মারা যান, তবুও তাঁর ফাইল ও সহযোগীদের প্রশ্ন আজও অমীমাংসিত।
ন্যায়বিচারের দাবিতে অদম্য কণ্ঠস্বর
২০২৫ সালের সেপ্টেম্বরে মারিনা প্রথমবার প্রকাশ্যে আসেন। ক্যাপিটল হিলে এক সাংবাদিক সম্মেলনে তিনি এপস্টাইন ফাইলসের সম্পূর্ণ প্রকাশের দাবি জানান। তাঁর বক্তব্য স্পষ্ট, 'অর্ধসত্য কখনও ন্যায়বিচার দিতে পারে না।'
বর্তমানে ৩৭ বছর বয়সি মারিনা ল্যাসারডা এপস্টাইনের বেঁচে যাওয়া ভুক্তভোগীদের জন্য এক শক্তিশালী কণ্ঠস্বর। তাঁর লড়াই কেবল নিজের জন্য নয়, বছরের পর বছর নীরবে সহ্য করা অগণিত মেয়ের জন্য।