
মাঝরাত পেরিয়ে গেলেও পশ্চিম দিল্লির সেই বাড়ির ডাইনিং টেবিলে রাখা বিবাহবার্ষিকীর কেকটি কাটাই হল না। মোমবাতি জ্বালানোর আগেই নিভে গেল উৎসবের আলো। সারা রাত শহরের রাস্তায় রাস্তায় ছেলেকে খুঁজে বেড়ালেন বাবা-মা। একের পর এক থানার দরজায় ঘুরেও তাঁরা জানতেন না, ছেলে আর কোনওদিনই বাড়ি ফিরবে না।
২৫ বছরের কমল ধ্যানি একটি কল সেন্টারে কাজ করতেন। শুক্রবার রাত ১২টা ৫০ মিনিটে যমজ ভাই করণকে ফোন করে জানিয়েছিলেন, '১৫ মিনিটের মধ্যেই বাড়ি পৌঁছচ্ছি।' মাকে রুটি বানাতে বলেছিলেন। পরিবারের সবাই মধ্যরাতে একসঙ্গে কেক কাটার প্রস্তুতি নিচ্ছিল।কিন্তু সেই ১৫ মিনিট আর কখনও শেষ হয়নি। আধ ঘণ্টা পেরিয়ে গেলেও কমল বাড়ি ফেরেননি। ফোন বন্ধ। উদ্বেগ দ্রুত আতঙ্কে বদলে যায়। পরিবারের সদস্যরা রাতেই বেরিয়ে পড়েন খোঁজে। রোহিণীতে তাঁর অফিসে গিয়ে জানা যায়, অনেক আগেই কাজ শেষ করে বেরিয়ে গিয়েছিলেন কমল।
অফিসের ম্যানেজারও তাঁদের সঙ্গে যোগ দেন। শুরু হয় এক থানার পর আরেক থানায় ছুটে বেড়ানো, ফাঁকা রাস্তা, অচেনা মোড়, কোথাও যদি বাইকটা দেখা যায়, কোথাও যদি ফোনটা বেজে ওঠে। ঘণ্টার পর ঘণ্টা কেটে যায়। কোনও খবর মেলে না।
ভোরের দিকে পুলিশের ফোন আসে। খবরটা ছিল ভয়াবহ, কমল আর নেই। জনকপুরিতে দিল্লি জল বোর্ডের (ডিজেবি) পাইপলাইন সংস্কারের জন্য খোঁড়া প্রায় ১৫ ফুট গভীর একটি গর্তের ভিতর থেকে উদ্ধার হয় তাঁর দেহ। মাথায় তখনও হেলমেট পরা ছিল। কাদায় মাখা অবস্থায় পাশে পড়ে ছিল মোটরবাইকটি। পুলিশের প্রাথমিক অনুমান, বাড়ি ফেরার পথে বাইক চালাতে চালাতেই তিনি সেই খোলা গর্তে পড়ে যান।
যে বাইকটি চালাচ্ছিলেন কমল, সেটি তিনি নিজের জন্মদিনে জমানো টাকায় কিনেছিলেন। বন্ধু ময়াঙ্ক বলেন, 'বাইকটা ও খুব ভালবাসত। ২০২৪ সালে কিনেছিল। শান্ত, পরিশ্রমী ছেলে ছিল। নিজের স্বপ্ন নিয়ে বাঁচতে চেয়েছিল।'
খবরটা পরিবারের উপর নেমে আসে বজ্রপাতের মতো। যমজ ভাই করণ জানান, 'মাকে অনেক পরে বলা হয়েছে। বাবা সারা রাত খুঁজেছেন। সকালে তাকেই ছেলের দেহ ব্যাগে মোড়া অবস্থায় দেখতে হয়েছে।' যে দিনটি হওয়ার কথা ছিল আনন্দের, সেটিই বদলে যায় জীবনের সবচেয়ে অন্ধকার দিনে।
স্থানীয় বাসিন্দা ও দোকানদারদের দাবি, দুর্ঘটনাটি প্রায় অনিবার্য ছিল। রাস্তা খোঁড়া হলেও সেখানে কোনও নিরাপত্তা ব্যবস্থা ছিল না। একটি ক্যাফের ম্যানেজার সন্দীপ জানান, 'ট্রাফিক সিগন্যাল থেকে ঘটনাস্থল পর্যন্ত প্রায় ১০০ মিটার কোনও স্ট্রিটলাইট নেই। গর্তের পাশে ছিল না ব্যারিকেড, না সেফটি নেট।'
স্থানীয় বাসিন্দা উমা বলেন, 'দু’মাস ধরে রাস্তার অবস্থা খারাপ। এক দিক বন্ধ, আরেক দিক সরু। রাতে চলাচল ভয়ংকর।' রিতু সালুজার দাবি, দুর্ঘটনার ঠিক আগের দিনই গর্ত খোঁড়া হয়েছিল। 'সন্ধে পর্যন্ত কোনও ব্যারিকেড ছিল না। এটা আমাদের ব্লকের একমাত্র রাস্তা।'