
নীরব, নিস্তব্ধ চারপাশ। বিছানায় শুয়ে নিস্পৃহ হরিশ রানা। চোখ ছলছল। হাল্কা ঠোঁট নাড়ানোর চেষ্টা। তবে জীবন সায়াহ্নে এসেও তাঁর কথা বলার প্রবল চেষ্টা কিংবা অভিব্যক্তি ব্যক্ত করার ইচ্ছা বিফলই হচ্ছিল। ঠিক যেমনটা হয়ে এসেছে বিগত ১৩টা বছর ধরে।
পরোক্ষ নিষ্কৃতি মৃত্যুর অধিকার পেয়েছেন তিনি। দেশের মধ্যে প্রথম ব্যক্তি হিসেবে সে অধিকার বাস্তবায়িত হল হরিশ রানার জীবনে। ঘরের সকলে এক দৃষ্টিতে তাকিয়ে ছিল তাঁর দিকে। আধ্যাত্মিক ভাবনার মাধ্যমেই তাঁকে বিদায় জানানো হল। এক বোন কপালে তিলক এঁকে দিলেন। মাথায় হাত রেখে মৃদুস্বরে বললেন, 'সকলকে ক্ষমা করে দাও, সকলের থেকে ক্ষমা চেয়ে নিয়ে বিদায় নাও।'
গাজিয়াবাদের হরিশ রানার অন্তিম মুহূর্তের এই ভিডিও এখন সোশ্যাল মিডিয়ায় ভাইরাল। বলা হচ্ছে, এরপরই ধীরে ধীরে তাঁর লাইফ সাপোর্ট থামিয়ে দেওয়ার প্রক্রিয়া শুরু হয় AIIMS হাসপাতালে। যদিও সে ভিডিওর সত্যতা যাচাই করেনি bangla.aajtak.in। আবেগঘন সেই মুহূর্তে দেখে চোখের জল ধরে রাখতে পারেনি কেউই।
এই সেই হরিশ রানা, যিনি প্রথম নিষ্কৃতি মৃত্যুর অধিকার পেয়ে ইতিহাস সৃষ্টি করলেন দেশে। সুপ্রিম কোর্টের অনুমতি পাওয়ার পর তাঁকে AIIMS হাসপাতালে স্থানান্তরিত করা হয়েছিল। গত ১৩ বছর ধরে তিনি কোমায়। ২১ সেকেন্ডের ভাইরাল ভিডিওতে হরিশ রানাকে ঘিরে থাকতে দেখা গিয়েছে পরিবারের সকলকে। তবে সব কিছুর মধ্যে তাঁর চোখ দৃষ্টি আকর্ষণ করেছে। মাঝে মাঝে পলক ফেলছিলেন তিনি। জীবনের শেষ এই মুহূর্তে এসে যেন অনেককিছু বলে বোঝাতে চাইছিলেন দৃষ্টির মাধ্যমেই।
অনেকে বলছেন, এই ভিডিও AIIMS হাসপাতালে যাওয়ার আগের মুহূর্ত। সে সময়ে হরিশ রানার বাড়িতে পৌঁছেছিলেন ব্রহ্মকুমারীর কয়েকজন বোন। বহু বছর
ধরে রানা পরিবার ব্রহ্মকুমারী কেন্দ্রের সঙ্গে যুক্ত। কঠিন সময়ে পরিবারটি তাই এই আধ্যাত্মিক আবহের মধ্যেই হরিশ রানাকে শেষ বিদায় জানাতে চেয়েছে।
ঠিক ১৩ বছর আগে বাড়ির ৪ তলা থেকে পড়ে যাওয়ার পর আর কখনও দাঁড়াতে পারেনি হরিশ রানা। সম্পূর্ণ বদলে গিয়েছে তাঁর জীবন। চিকিৎসকরা তাঁর সুস্থ হওয়ার সমস্ত আশা ত্যাগ করেছিলেন। কোমায় ছিলেন তিনি। ভেন্টিলেটরে মাধ্যমে তাঁকে বাঁচিয়ে রাখা হয়েছিল। বছরের পর বছর তাঁর বাবা অশোক রানা, মা এবং পরিবারের অন্যান্য সদস্যের সঙ্গে যত্ন নেওয়ার দায়িত্বে ছিলেন। ওষুধ থেকে শুরু করে দৈনন্দিন যত্ন, সবটাই সামলাতেন মা-বাবা।
সুপ্রিম কোর্ট হরিশ রানাকে প্যাসিভ ইউথেনেশিয়ার অনুমতি দেয়। এরপর শনিবার হরিশ রানাকে গাজিয়াবাদ থেকে দিল্লির AIIMS-এ স্থানান্তরিত করা হয়। ডাক্তারদের তত্ত্বাবধানে ধীরে ধীরে তাঁর লাইফ সাপোর্ট অপসাপণের প্রক্রিয়া চলছে। প্যাসিভি ইউথেনেশিয়ার এই রায় এখন বিশ্বজুড়ে চর্চার কেন্দ্রবিন্দুতে।
হরিশ রানার পরিবার যেখানে থাকে, সেই রাজনগর এক্সটেনশন সোস্যাটির বাসিন্দারাও গভীর ভাবে অনুপ্রাণিত। প্রতিবেশীরা বলছেন, পরিবারটি বছরের পর বছর ধরে হরিশ রানার যত্ন নেওয়ার জন্য যে নিষ্ঠা দেখিয়েছে, তা অনুকরণীয়। সোস্যাইটির বাসিন্দা তেজস চতুর্বেদী ব্যাখ্যা করেন, 'রানা পরিবারের দৈন্যন্দিন রুটিন, হরিশের যত্ন নেওয়া থেকেই শুরু হত, তাতেই শেষ হত।' দীপাশু মিত্তল বলেন, 'ভিডিওটি দেখে আমরা আবেগপ্রবণ হয়ে পড়েছি।'
ভিডিওটি ভাইরাল হতেই সোশ্যাল মিডিয়ার বিভিন্ন প্ল্যাটফর্মে তা শেয়ার হতে শুরু করে। অনেকেই লিখছেন, এই ভিডিও কেবল এক ব্যক্তির কাহিনি বর্ণনা করছে না বরং এক পরিবারের ধৈর্য, সেবা এবং করুণাও ব্যক্ত করছে। গভীর স্পর্শকাতর এই ভিডিও দেখে অঝোরে কেঁদেছেন অনেকে।