গত কয়েকদিন ধরেই খবরের শিরোনামে তৃণমূলের বসিরহাটের সাংসদ অভিনেত্রী নুসরত জাহান। সূত্র থেকে জানা যাচ্ছে আগামী সেপ্টেম্বরেই নাকি আসতে চলেছে নুসরতের গর্ভের সন্তান। রাজনীতির মঞ্চ থেকে টলিপাড়া সব জায়গাই উত্তাল এই খবরে। প্রকাশ্যে এসেছে নুসরতের বেবি বাম্পের ছবিও। অন্যদিকে নিখিল জৈনের দাবি তিনি ৬ মাস ধরে নুসরতের থেকে আলাদা রয়েছেন। ফলত এই সন্তানের বাবা তিনি নন। সন্তানের বাবা কে? প্রশ্নের উত্তর দেননি নুসরতও। অভিনেতা যশ দাশগুপ্তের সঙ্গে নুসরতের সম্পর্কের গুঞ্জন শোনা গেলেও সেই নিয়েও মুখ খোলেননি টলি কুইন। অনেকেই নুসরতের মা হওয়া নিয়ে প্রশ্ন তুলেছেন। তাহলে নুসরতের গর্ভের সন্তানের বাবা কে? এই নিয়ে চায়ের কাপে ঝড় উঠেছে। বর্তমান সমাজে অনেকেই সিঙ্গল মাদার হিসেবে নিজেকে প্রমাণ করেছেন। হয়তো নুসরতও তেমনটাই করতে চলেছেন বল মনে করছেন অনেকেই। নুসরত যতদিন না মুখ খুলবেন তাঁকে নিয়ে বিতর্ক চলবে। তবে বছর খানেক আগে এদেশের সুপ্রিক কোর্ট কিন্তু যুগান্তকারী রায় দিয়েছিল। যাতে বলা হয়েছে, অবিবাহিত মা সন্তানের একমাত্র অভিভাবক হতে পারেন। এদেশে এবং বিদেশে বহু সাহসিনী নারী রয়েছেন যাঁরা পুরুষতান্ত্রিক এই সমাজে চ্যালেঞ্জ অ্যাকসেপ্ট করে সাফল্যের সঙ্গে সিঙ্গল প্যারেন্ট হিসেবে নিজেকে প্রমাণ করেছেন। বহু যুগ ধরে ‘সিঙ্গল মাদার’ কনসেপ্ট চলে আসছে বিশ্বে।
সিঙ্গল মাদাররাই যেখানে সমাজ চালান
তিব্বত সীমান্তের কাছে, চিনের ইয়ুনান ও সিচুয়ান প্রদেশে এমন এক প্রাচীন জাতিগোষ্ঠী বসবাস করে যারা শত শত বছর ধরে এই ‘সিঙ্গল মাদার’ বা একক মাতৃত্বের অধিকারকেই প্রাধান্য দিয়ে আসছে। একক মাতৃত্বই এই জাতিগোষ্ঠীর অন্যতম সামাজিক রীতি বা বৈশিষ্ট্য। সমুদ্রপৃষ্ঠ থেকে প্রায় ২৭০০ কিলোমিটার উচ্চতায় লুগুর হ্রদের পাড়ে বসবাস করে মোসুও (Musuo) উপজাতি। বিশ্বের প্রায় ৪০ হাজার মোসুও নিজেদের ‘না’ নামেও পরিচয় দিয়ে থাকেন। মোসুওরা সম্ভবত বিশ্বের মাতৃতান্ত্রিক সমাজ ব্যবস্থার অন্যতম সেরা দৃষ্টান্ত। প্রতিটি পরিবার এখানে নিজস্ব পৃথক পৃথক বাড়িতে বসবাস করে এবং প্রত্যেকটি পরিবারের প্রধান এখানে একজন মহিলা। বংশানুক্রমিকভাবে এই মহিলারাই পরিবারের প্রধান হওয়ার দাবিদার হন এবং সম্পত্তির অধিকারী হয়ে থাকেন। মোসুয়া মহিলারা পরিবার, ব্যবসা এবং গোষ্ঠীর প্রশাসনিক দায়-দায়িত্ব, সব সিদ্ধান্ত নিয়ে থাকেন। এই সম্প্রোদায়ের শিশুরা মায়ের কাছেই বড় হয় এবং মায়ের পরিচয়েই বেড়ে ওঠে। জানা যায়, মোসুও মেয়েরা যখন তেরো বছর বয়স পার করে ফেলে, তখন তারা তাদের সঙ্গী নির্বাচনের যোগ্যতা অর্জন করে। মোসুও মেয়েরা নিজেরাই নিজেদের পছন্দের পুরুষ সঙ্গী নির্বাচন করেন। পুরুষ সঙ্গীটি মেয়েটির ইচ্ছা অনুযায়ী, মেয়ের বাড়িতেই এক বা একাধিকবার রাত্রিযাপন করেন। কজন মোসুও মহিলা তাঁর সম্পূর্ণ জীবলকালে এ ভাবে একাধিক পুরুষ সঙ্গী নির্বাচন করে থাকেন বা করতে পারেন। কোনও মোসুও মহিলা অন্তঃসত্তা হলে, তার সন্তানের পিতৃ পরিচয়ের কোনও প্রয়োজন হয় না। শিশুটি বেড়ে ওঠে তার মায়ের কাছেই।
ভারতে সিঙ্গল মাদার কনসেপ্ট
"সিঙ্গেল মাদার" হল সেসব মহিলা যারা নিজেদের সন্তানকে নিজেরাই লালন-পালন এবং বড় করে তুলছে কোন রকম সঙ্গী ছাড়াই। হতে পারে তারা ডিভোর্সি, আলাদা থাকেন কিংবা অবিবাহিত হয়ে কোন বাচ্চা দওক নিয়েছেন। সরকারি নিয়মে এখন আধার কার্ড, ভোটার কার্ডে বাবার নাম না দিলেও সমস্যা হয় না। সাম্প্রতিক অতীতে ‘সিঙ্গল মাদার’ বা একক মাতৃত্বের অধিকারকে এ ভাবেই স্বীকৃতি দিয়েছে ভারতের শীর্ষ আদালত। তবে আইনি স্বীকৃতি সত্ত্বেও এখনও অনেক মহিলাকেই সন্তান পালনের ক্ষেত্রে নানা বাধার সম্মুখীন হতে হয়। তার কারণ, আমাদের সমাজ এখনও একক মাতৃত্বের বিষয়টির সঙ্গে ধাতস্থ বা অভ্যস্ত হয়ে উঠতে পারেনি। হয়ত আরও কিছুটা সম লাগবে! তবে দিনদিন বাড়ছে একক মায়েদের সংখ্যা। তবে এটাও ঠিক আমাদের দেশের সমাজ একক মায়েদের জন্য খুব সহজ নয়। একাকী সন্তান পালন করতে গিয়ে সংগ্রামী হতে হয় নারীকে।
দেশের প্রথম স্বীকৃত সিঙ্গল মাদার
ভারতীয় সিনেমার প্রথম মহিলা অভিনেত্রী দুর্গাবাই কামাত। নারী স্বাধীনতার দৃষ্টান্ত হয়ে ইতিহাসের খাতায় জ্বলজ্বল করছে দুর্গাবাই। তবু তাঁর সম্পর্কে বিশেষ তথ্য মেলে না। জানা যায় দুর্গাবাই-এর বিয়ে বেশিদিন টেকেনি। ১৯০৩ সালে ঘর ছেড়ে সন্তানকে নিয়ে বেড়িয়ে আসেন তিনি। নিজের সন্তানকে একাই মানুষ করার সিদ্ধান্ত নেন। সেই সময় মহিলাদের জন্য কোনও চাকরি ছিল না। ফলে সন্তান মানুষ করা কঠিন হয়ে পড়ে তাঁর কাছে। একমাত্র গৃহ সহায়িকা হিসেবে কাজ করার সুযোগ ছিল তাঁর সামনে। তবে তা না করে তিনি অভিনয়কে বেছে নেন নিজের জীবিকা হিসেবে। যদিও সেই কাজ সহজ ছিল না। একা লড়ে গিয়েছিলেন পুরুষ একাধিপত্যের বিরুদ্ধে। তবে আজ সেভাবে উচ্চারিত হয় না তাঁর নাম। কালের অতলে প্রায় বিস্মৃত দেশের প্রথম মহিলা অভিনেত্রী ও সিঙ্গল মাদার দুর্গাবাই কামাত।
সিঙ্গল মাদার হিসেবে নজর কেড়েছেন যারা
উন্নত বিশ্বে ‘সিঙ্গেল মাদার’ শব্দটি বেশ পুরনো। সেই তুলনায় আমাদের দেশে এখনো সেভাবে স্বীকৃতি পায়নি ‘সিঙ্গেল মাদার’ প্রথা। তার উপর এই পরিচয়টি অনেক সময় আমাদের সমাজে মেয়েদের জন্য কিছুটা তিক্ত অভিজ্ঞতারও। পুরুষতান্ত্রিক সমাজে বাবাহীন সন্তান মানুষ করা চারটিখানি কথা তো আর নয়! তবে এদেশেই অনেক নামি-দামী ব্যক্তিত্বই ‘সিঙ্গেল মাদার’ হয়ে দৃষ্টান্ত স্থাপন করেছেন। দেখে নেওয়া যাক তাঁদের।
সুস্মিতা সেন
সিঙ্গল মায়েদের কথা বলতে গেলে সবার প্রথমেই বলতে হয় প্রাক্তন মিস ইউনিভার্স সুস্মিতা সেনের কথা। এখনো যাকে বলিউডের অন্যতম সুন্দরী ও ফ্যাশন সচেতন তারকা হিসেবে ধরা হয়। মাত্র ২৫ বয়সে প্রথম কন্যাসন্তান দত্তক নেন এই তারকা। এবং তার প্রায় ১০ বছর পর তিন মাস বয়সী আরেকটি কন্যাশিশু দত্তক নেন। দত্তক নেয়া দুই সন্তানকেই নিজ সন্তানের পরিচয়ে বড় করছেন এই তারকা। যার কারণে ব্যাক্তিগত জীবনে এখনও পর্যন্ত বিয়ে করেননি তিনি। মাতৃপরিচয়েই ভারতীয় সমাজে নিজ সন্তানদের দেখাশোনা করে যাচ্ছেন তিনি।
রবিনা ট্যান্ডন
নব্বই দশকে বলিউডের পর্দা কাঁপানো অভিনেত্রী রাবিনা ট্যান্ডন। বিয়ে করেন নামকরা ব্যাবসায়ী অনিল থাডনিকে। তবে বিয়ের আগেই দত্তক নিয়েছিলেন দু'টি সন্তান। বিবাহিত জীবনে নিজে জন্ম দিয়েছিলেন আরো দুই সন্তানের। এরইমধ্যে বড় মেয়ে পূজার বিয়েও দিয়েছেন রবিনা।
নীনা গুপ্তা
বেশ বৈচিত্রময় জীবন বর্ষীয়ান অভিনেত্রী নীনা গুপ্তার । বিয়ের আগেই গর্ভবতী হয়ে সন্তানের জন্ম দেওয়া, তারপর সেই সন্তানকে একাই বড় করে তোলা। আশির দশকেও ‘সিঙ্গল মাদার’ হওয়ার ‘দুঃসাহস’ দেখিয়েছিলেন নীনা। এমনকি এই বয়সেও তিনি একই রকম বোল্ড ও সাহসী। ক্যারিয়ারের ভরা প্রাচুর্যেও ‘বোল্ড লেডি’ হিসেবে খ্যাতি ছিলো বলিউড তারকা নীনা গুপ্তা। আর সেই সুবাদেই প্রেম গড়ে উঠেছিলো ওয়েস্ট ইন্ডিজের কিংবদন্তী ক্রিকেটার ভিভ রিচার্ডসের সঙ্গে। রিচার্ডের সন্তানই গর্ভে আসে নীনার। বিয়ে ছাড়াই জন্ম নেয় কন্যা। সেই সন্তানই এখন ভারতের বিখ্যাত ফ্যাশন ডিজাইনার মাসাবা গুপ্তা।
সারিকা
দক্ষিণী সুপারস্টার কমল হাসনের সঙ্গে একসময় লিভ ইন সম্পর্কে ছিলেন সারিকা। অভিনয় সূত্রেই সুপারস্টার কমল হাসানের সঙ্গে আলাপ সারিকার। ক্রমে আলাপ থেকে প্রণয়। তখন কমল হাসান আর বাণী গণপতির দাম্পত্যের বয়স এক দশকের কাছাকাছি। সব জেনেই কমলের সঙ্গে সম্পর্কে জড়িয়ে পড়েন সারিকা। দু’জনের কেউ তাঁদের সম্পর্ক গোপনও করেননি। এ দিকে বাণী গণপতির সঙ্গে বিচ্ছেদ হয়নি, অন্যদিকে সারিকার সঙ্গে লিভ ইন শুরু করে দেন কমল হাসান। তাঁদের প্রথম সন্তান শ্রুতির জন্ম ১৯৮৬ সালে। তারও দু’বছর পরে কমল হাসান সারিকাকে বিয়ে করেন। তখনও প্রথম স্ত্রী বাণীর সঙ্গে বিচ্ছেদ হয়নি কমলের। ১৯৯১ সালে জন্ম কমল-সারিকার দ্বিতীয় মেয়ে অক্ষরার। দুই মেয়েকে নিয়ে কমল-সারিকার দাম্পত্যকে বলিউডে আদর্শ হিসেবে ধরা হত। কিন্তু সবাইকে হতবাক করে তাঁদের ষোলো বছরের দাম্পত্য ভেঙে যায় ২০০৪ সালে।
রিহা পিল্লাই
স্বাধীনচেতা নারী হিসেবেই তাঁর পরিচিতি রিহা পিল্লাইয়ের। জীবনে এগিয়েছেন নিজের শর্তেই। বলিউডে মডেলিংয়ের দুনিয়ায় দ্রুত জনপ্রিয় হয়ে ওঠা রিহা প্রথম বিয়ে করেন ৯৮৪ সালে আমেরিকার নাগরিক মাইকেল ভাজকে। ১৯৯৮ সালে বিয়ে করেন সঞ্জয় দত্তকে। এর পর রিয়ার জীবনে আসেন লিয়েন্ডার পেজ। ২০০৫ থেকে লি-রিহা একঙ্গে থাকতে শুরু করেন। সেই সম্পর্ক থেকেই জন্ম মেয়ে আইয়ানার। লিভ ইন থেকে বেরিয়ে এসে ২০১৪ সাল থেকেই আলাদা থাকতে শুরু করেন লিয়েন্ডার এবং রিহা।
জানলে অবাক হবেন আমেরিকার প্রাক্তন প্রেসিডেন্ট বারাক ওবামা থেকে অস্কার বিজয়ী অভিনেতা লিওনার্দো ডিক্যাপ্রিও সকলেই সিঙ্গল মাদারের কাছে বেড়ে উঠেছেন। এই দলে রয়েছেন অভিনেত্রী অ্যাঞ্জেলিনা জোলিও। প্রাক্তন স্বামী ব্র্যাডপিটের সঙ্গে সন্তানের অভিভাবকত্ব নিয়ে আইনি লড়াইয়ের পর বর্তমানে ৬ সন্তানকে সিঙ্গল মাদার হিসাবেই মানুষ করছেন জোলি। তার আগে দীর্ঘ ১০ বছর লিভ ইন করার পর ২০১৪ সালে আগস্টে বিয়ে করেছিলেন পিট-জোলি। বিয়ের আগে সন্তানের জন্ম দিয়েছিলেন গায়িকা শাকিরাও। সিঙ্গল মাদার হিসেবে বছর খানেক আগে খবরের শিরোনামে এসেছিলেন পশ্চিম বঙ্গেরই এক চিকিৎসক শিউলি মুখোপাধ্যায়। অবিবাহিত শিউলিদেবী একাকিত্ব ঘোঁচাতে পুত্র সন্তানের মা হওয়ার সিদ্ধান্ত নেন। নিজের হাসপাতালের স্পার্ম ব্যাঙ্ক থেকে শুক্রাণু নিয়ে প্রবেশ করানো হয় তার শরীরে। তবে ছেলে 'রণ'-এর জন্মের পর তিক্ত অভিজ্ঞতার সম্মুখীন হতে হয়েছিল স্ত্রী-রোগ বিশেষজ্ঞ শিউলি মুখোপাধ্যায়কে। সেই যুদ্ধ জিতে ‘রণ’কে যোগ্য মানুষ করে তোলাই তাঁর এখন লক্ষ্য।