
ভারতের গভীর সমুদ্র অনুসন্ধান কর্মসূচি নতুন গতি পেয়েছে। জাতীয় মহাসাগর প্রযুক্তি ইনস্টিটিউট (NIOT) জানিয়েছে, ২০২৬ সালের মে মাসে ‘সমুদ্রযান’ ডুবোজাহাজের প্রথম পরীক্ষামূলক ডাইভ করা হবে ৫০০ মিটার গভীরতায়। এই অভিযান ভবিষ্যতে ৬,০০০ মিটার গভীরে মানববাহী ডাইভের লক্ষ্যে একটি অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ ধাপ।
চেন্নাইয়ের NIOT কারখানায় বর্তমানে জোরকদমে চলছে সমুদ্রযানের ইন্টিগ্রেশন কাজ। প্রায় ২৫ টন ওজনের ‘মৎস্য-৬০০০’ (Matsya-6000) ডুবোজাহাজটিকে অত্যন্ত সূক্ষ্ম প্রযুক্তিতে প্রস্তুত করছেন বিজ্ঞানী ও টেকনিশিয়ানরা। NIOT-এর পরিচালক অধ্যাপক বালাজি রামকৃষ্ণান জানান, প্রাথমিকভাবে যে অগভীর জলে পরীক্ষার পরিকল্পনা ছিল, তা এড়িয়ে সরাসরি ৫০০ মিটারে ডাইভ করার সিদ্ধান্ত নেওয়া হতে পারে। এতে চাপ সহনশীল হাল, লাইফ সাপোর্ট সিস্টেম, নেভিগেশন ও সেন্সর ব্যবস্থার বাস্তব পরীক্ষা একসঙ্গে করা সম্ভব হবে।
এই দ্রুতগতির পরিকল্পনা ২০২১ সালে শুরু হওয়া ‘ডিপ ওশান মিশন’-এর (DOM) উপর সরকারের আস্থারই প্রতিফলন। প্রায় ৪,০৭৭ কোটি টাকা ব্যয়ে চালু হওয়া এই প্রকল্পটি ভূ-বিজ্ঞান মন্ত্রকের তত্ত্বাবধানে পরিচালিত হচ্ছে। এর মাধ্যমে মানবচালিত ডুবোজাহাজ প্রযুক্তিতে ভারত যুক্তরাষ্ট্র, রাশিয়া, চিন, ফ্রান্স ও জাপানের মতো অগ্রণী দেশের কাতারে জায়গা করে নিতে চলেছে।
সমুদ্রযান কী?
ডিপ ওশান মিশনের অন্যতম মূল উপাদান হল ‘সমুদ্রযান’। টাইটানিয়াম হালযুক্ত মৎস্য-৬০০০ ডুবোজাহাজে একসঙ্গে তিন জন অ্যাকোয়ানট ১২ ঘণ্টা পর্যন্ত (জরুরি অবস্থায় ৯৬ ঘণ্টা) কাজ করতে পারবেন। গবেষণা জাহাজ ‘সাগর নিধি’ থেকে এটি নামানো হবে। সমুদ্রের জীববৈচিত্র্য পর্যবেক্ষণ, ভূতাত্ত্বিক মানচিত্র তৈরি এবং বিশেষ করে ভারতের এক্সক্লুসিভ ইকোনমিক জোনে পলিমেটালিক নোডিউল অনুসন্ধানে এই ডুবোজাহাজ গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা নেবে।
সম্প্রতি ইন্দো-ফরাসি সহযোগিতায় ৫,০০০ মিটারেরও বেশি গভীরে মানব ডাইভিংয়ের অভিজ্ঞতা ভারতের দক্ষতা আরও বাড়িয়েছে। ফলে ২০২৬ সালের মে মাসের এই ডাইভ কেবল একটি পরীক্ষা নয়, বরং কৌশলগত দিক থেকেও অত্যন্ত তাৎপর্যপূর্ণ।
এই অভিযান সফল হলে ২০২৬ সালের শেষ দিকে বা ২০২৭ সালের মধ্যে ৬,০০০ মিটারের পূর্ণাঙ্গ ডাইভের পথ খুলে যাবে। তার ফলে টেকসই সমুদ্র খনন, জলবায়ু গবেষণা, নীল অর্থনীতির প্রসার এবং ভবিষ্যতে গভীর সমুদ্র পর্যটনের সম্ভাবনাও উজ্জ্বল হবে। পাশাপাশি, জলের নীচে মাছচাষের মতো NIOT-এর উদ্ভাবন খাদ্য নিরাপত্তাতেও নতুন দিগন্ত খুলে দিতে পারে।
যদিও উচ্চচাপ সহনশীল প্রকৌশল ও জৈব দূষণ প্রতিরোধের মতো চ্যালেঞ্জ এখনও রয়ে গেছে, তবু সমুদ্রযান প্রকল্প ভারতের ক্রমবর্ধমান সমুদ্রবিজ্ঞানী দক্ষতার স্পষ্ট প্রমাণ। চেন্নাইয়ে প্রস্তুতি যত এগোচ্ছে, ততই ২০২৬ সালের মে মাসের ঐতিহাসিক ডাইভের দিকে তাকিয়ে রয়েছে গোটা বিশ্ব।