
বাংলাদেশে একের পর এক হিন্দু সংখ্যালঘুকে খুনের অভিযোগ উঠছে। সেই আবহে আইপিএলে বাংলাদেশি ফাস্ট বোলার মুস্তাফিজুর রহমানকে দলে নেওয়া ও পরে বাদ দেওয়ার সিদ্ধান্ত ঘিরে বিতর্ক তুঙ্গে। এই প্রেক্ষিতে ভারতীয় ক্রিকেট বোর্ড (বিসিসিআই) ও কলকাতা নাইট রাইডার্সের (কেকেআর) সিদ্ধান্তের কড়া সমালোচনা করলেন কংগ্রেস সাংসদ শশী থারুর।
মুস্তাফিজুর রহমানকে ৯.২ কোটি টাকায় দলে নিয়েছিল কেকেআর। তবে বাংলাদেশে সংখ্যালঘু হিন্দুদের ওপর হিংসার অভিযোগ সামনে আসতেই সোশ্যাল মিডিয়ায় প্রশ্ন উঠতে শুরু করে, এই পরিস্থিতিতে একজন বাংলাদেশি ক্রিকেটারকে আইপিএলে খেলানো উচিত কি না। চাপ বাড়তেই বিসিসিআই কেকেআরকে মুস্তাফিজুরকে ছেড়ে দেওয়ার নির্দেশ দেয়। বোর্ড জানায়, প্রয়োজনে ফ্র্যাঞ্চাইজি বিকল্প খেলোয়াড় নিতে পারবে। শেষ পর্যন্ত কেকেআর মুস্তাফিজুর রহমানকে দল থেকে বাদ দেয়।
এই সিদ্ধান্তের তীব্র বিরোধিতা করে শশী থারুর সোশ্যাল মিডিয়া প্ল্যাটফর্ম এক্স-এ প্রশ্ন তোলেন, একজন খেলোয়াড়কে দেশের রাজনৈতিক পরিস্থিতির জন্য শাস্তি দেওয়া কতটা যুক্তিযুক্ত? তিনি লেখেন, 'যদি এই খেলোয়াড় মুস্তাফিজুর না হয়ে লিটন দাস বা সৌম্য সরকার হতেন, তাহলেও কি একই সিদ্ধান্ত নেওয়া হতো? আমরা এখানে কাকে শাস্তি দিচ্ছি, একটি দেশ, একজন ব্যক্তি, না কি তার ধর্মকে?' শশী থারুরের মতে, খেলাধুলার এই ধরনের রাজনৈতিক ব্যবহার বিপজ্জনক এবং অযৌক্তিক।
তবে এই বিতর্কে ভিন্নমতও উঠে এসেছে। প্রাক্তন ভারতীয় ক্রিকেটার অতুল ওয়াসান কেকেআর ও শাহরুখ খানের পাশে দাঁড়িয়ে বলেন, কেবলমাত্র একটি দল বা একজন মালিককে দোষারোপ করা ঠিক নয়। তাঁর বক্তব্য, 'শাহরুখ খান একমাত্র মালিক নন, আর কেকেআরই একমাত্র দল নয় যারা দরপত্রে অংশ নিয়েছিল। একজন খেলোয়াড় বাদ পড়লে সামগ্রিক পরিস্থিতির কোনও পরিবর্তন হবে না।'
অন্যদিকে, ভারতের প্রাক্তন অধিনায়ক ও তেলেঙ্গানার মন্ত্রী মহম্মদ আজহারউদ্দিন বলেন, 'বাংলাদেশে যা ঘটছে তা নিঃসন্দেহে উদ্বেগজনক। তবে খেলাধুলা আলাদা বিষয়। বোর্ড যদি এমন সিদ্ধান্ত নেয়, তা অবশ্যই বিদেশ মন্ত্রক ও স্বরাষ্ট্র মন্ত্রকের সঙ্গে পরামর্শ করেই নেওয়া উচিত।'
এই বিষয়ে আরও কঠোর অবস্থান নিয়েছেন মন্ত্রী ও প্রাক্তন ক্রিকেটার মনোজ তিওয়ারি। তাঁর মতে, বিসিসিআইয়ের সিদ্ধান্ত আরও আগেই নেওয়া উচিত ছিল। তিনি বলেন, 'বাংলাদেশে সংখ্যালঘু হিন্দুদের উপর নির্যাতনের শিকার পরিবারগুলির ন্যায়বিচার না পাওয়া পর্যন্ত সেই দেশের সঙ্গে কোনও ক্রিকেটীয় সম্পর্ক রাখা উচিত নয়।'
উল্লেখ্য, হিউম্যান রাইটস কংগ্রেস ফর বাংলাদেশ মাইনরিটিজ (HRCBM)-এর একটি প্রতিবেদনে দাবি করা হয়েছে, ২০২৫ সালের জুন থেকে ডিসেম্বরের মধ্যে বাংলাদেশে হিন্দু সংখ্যালঘুদের বিরুদ্ধে ধর্ম অবমাননার অন্তত ৭১টি মামলা নথিভুক্ত হয়েছে। দেশের ৩০টিরও বেশি জেলায় এই ধরনের ঘটনার অভিযোগ উঠেছে, যার মধ্যে রয়েছে গ্রেফতার, গণ হিংসা, মন্দির ও সম্পত্তি ভাঙচুর, শিক্ষা প্রতিষ্ঠান থেকে বহিষ্কার এবং প্রাণঘাতী হামলা। কয়েকটি ঘটনায় নাবালকরাও আক্রান্ত হয়েছে বলে উল্লেখ করা হয়েছে।
এই পরিস্থিতিতে মুস্তাফিজুর রহমানকে ঘিরে তৈরি হওয়া বিতর্ক শুধুমাত্র ক্রিকেটের মধ্যেই সীমাবদ্ধ নেই, বরং তা রাজনীতি, মানবাধিকার ও কূটনৈতিক প্রশ্নকেও সামনে এনে দিয়েছে।