
মুসলিম মহিলাদের জন্য পুরুষদের সঙ্গে সমান সম্পত্তির অধিকারের দাবিতে সুপ্রিম কোর্টে একটি জনস্বার্থ মামলা দায়ের করা হয়েছে। মুসলিম মহিলাদের জন্য সমান উত্তরাধিকার অধিকারের বিষয়ে শুনানির সময়, আদালত গুরুত্বপূর্ণ পর্যবেক্ষণ করেছে, যেখানে বলা হয়েছে, দেশের সকল মহিলাদের জন্য সমান উত্তরাধিকার অধিকার নিশ্চিত করার একটি উপায় হতে পারে অভিন্ন দেওয়ানি বিধি (UCC) বাস্তবায়ন করা। আদালত বলেছে, যদি সারা দেশের সকল মহিলাদের জন্য সমান উত্তরাধিকার অধিকার নিশ্চিত করতে হয়, তাহলে অভিন্ন দেওয়ানি বিধির মতো একটি বিস্তৃত আইনী ব্যবস্থা বিবেচনা করা যেতে পারে।
১৯৩৭ সালের শরিয়তি আইনের একটি ধারা মুসলিম মহিলাদের জন্য বৈষম্যমূলক, এই যুক্তিতে সেটি বাতিলের আর্জি জানিয়ে একটি মামলা দায়ের হয়েছিল শীর্ষ আদালতে। ওই মামলার শুনানিতেই গুরুত্বপূর্ণ পর্যবেক্ষণ শীর্ষ আদালতের। উল্লেখ্য, অভিন্ন দেওয়ানি বিধির পক্ষে এই প্রথম সরাসরি সওয়াল করল দেশের সর্বোচ্চ আদালত। প্রসঙ্গত, শরিয়তি আইনের বিরোধিতা করে মামলা উঠেছিল প্রধান বিচারপতি সূর্য কান্ত, বিচারপতি জয়মাল্য বাগচী এবং বিচারপতি আর মাধবনের বেঞ্চে। শরিয়তি আইনের ধারা মুসলিম মহিলাদের ক্ষেত্রে বৈষম্যমূলক, সেটি বাতিলের আর্জিতে দায়ের হওয়া মামলাকে 'ভালো মামলা' বলে মন্তব্য করে বিচারপতি সূর্য কান্তর নেতৃত্বাধীন বেঞ্চ। যদিও শুনানিতে বিচারপতিরা বলেন, আদালত যদি শরিয়তের উত্তরাধিকার আইন বাতিল করে, তা হলে একটি আইনি শূন্যতা তৈরি হবে। কারণ মুসলিম উত্তরাধিকারের কোনও বিধিবদ্ধ আইন (ভারতীয় ন্যায় সংহিতায়) নেই।
মামলাকারীদের আইনজীবী প্রশান্ত ভূষণের উদ্দেশে প্রধান বিচারপতি সূর্য কান্ত বলেন, ‘সংস্কারের প্রতি আমাদের অতিরিক্ত উদ্বেগের বশবর্তী হয়ে আমরা হয়তো তাঁদের (মুসলিম মহিলাদের) অধিকার থেকে আরও বঞ্চিত করে ফেলব। এখন তাঁরা যেটুকু পাচ্ছেন, তার থেকেও কম পেতে পারেন। যদি ১৯৩৭ সালের শরিয়ত আইন তুলে নেওয়া হয়, তবে কী হবে? এটি কি একটি অপ্রয়োজনীয় শূন্যতা তৈরি করবে না?’ প্রধান বিচারপতি বলেন, সমস্ত জটিল প্রশ্নের 'উত্তর হতে পারে অভিন্ন দেওয়ানি বিধি।' বিচারপতি বাগচী আরও বলেন, 'এক ব্যক্তির একমাত্র স্ত্রী। এই বিধি সব সমাজে প্রযুক্ত হয়নি।'
‘অভিন্ন দেওয়ানি বিধিই একমাত্র উত্তর’
শুনানিপর্বে বিচারপতি জয়মাল্য বাগচী জানান, বৈষম্যের অভিযোগের ক্ষেত্রে মামলাকারীদের যুক্তিটি অত্যন্ত জোরালো। তবে তিনি প্রশ্ন তোলেন, আদালতের কি এই বিষয়টি আইনসভার প্রজ্ঞার উপরে ছেড়ে দেওয়া উচিত নয়? কারণ সংবিধানের নির্দেশমূলক নীতি অনুযায়ী অভিন্ন দেওয়ানি বিধি প্রণয়নের অধিকার একমাত্র আইনসভারই রয়েছে। এই পরিপ্রেক্ষিতেই প্রধান বিচারপতি সূর্য কান্ত স্পষ্ট ভাষায় বলেন, ‘এর উত্তর হলো ইউনিফর্ম সিভিল কোড বা অভিন্ন দেওয়ানি বিধি।’ বিচারপতি বাগচী আরও বলেন, ‘এক পুরুষের এক স্ত্রী’ নীতিটি সব সম্প্রদায়ের জন্য সমান ভাবে প্রযোজ্য হচ্ছে না। তিনি বলেন, ‘তার মানে কি আদালত সমস্ত বহুগামিতাকে অসাংবিধানিক ঘোষণা করতে পারে? নির্দেশমূলক নীতিগুলি বাস্তবায়নের জন্য আমাদের আইনসভার ক্ষমতার উপরে নির্ভর করতে হবে।’
মামলাকারীদের দাবি
শুনানির শুরুতেই মামলাকারীদের আইনজীবী প্রশান্ত ভূষণ দাবি করেন, মুসলিম মহিলারাও পুরুষদের মতো সমান উত্তরাধিকারের যোগ্য— আদালত এই মর্মে একটি ঘোষণা করুক। তাঁর যুক্তি ছিল, আদালত যদি ১৯৩৭ সালের মুসলিম পার্সোনাল ল (শরিয়ত) অ্যাপ্লিকেশন অ্যাক্ট বাতিল করে, তবে সে ক্ষেত্রে স্বাভাবিক ভাবেই ‘ভারতীয় উত্তরাধিকার আইন’ প্রযোজ্য হবে। তবে এই জটিল আইনি প্রক্রিয়ায় আদালত এখনই সরাসরি হস্তক্ষেপ না করে বল ঠেলে দিয়েছে আইনসভার কোর্টেই। এখন দেখার, শীর্ষ আদালতের এই বার্তার পরে কেন্দ্রীয় সরকার অভিন্ন দেওয়ানি বিধি নিয়ে কী পদক্ষেপ করে।