
আরবল্লী ভারতের অন্যতম প্রাচীণ পর্বতমালা। পরিবেশ বিজ্ঞানীদের মতে, এই পর্বতমালা কেবল উত্তর ভারতকে থর মরুভূমির হাত থেকে রক্ষা করছে না, বরং জলবায়ুগত ভারসাম্য, ভূগর্ভস্থ জল সংরক্ষণ এবং জীববৈচিত্র অর্থাৎ প্রাণী ও উদ্ভিদ জগতের মধ্যে ভারসাম্যও বজায় রাখতে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা পালন করে।
সুপ্রিম কোর্টের সাম্প্রতিক এক রায় আরাবল্লী পর্বতমালা নিয়ে বিতর্কের জন্ম দিয়েছে। এতে বলা হয়েছে, শুধুমাত্র ১০০ মিটারের বেশি উঁচু পাহাড়গুলিকেই আরাবল্লী হিসবে বিবেচনা করা হবে। এর ফলে ৯০%-এরও বেশি পাহাড় বিপন্ন হয়ে পড়েছে। কেন্দ্রীয় পরিবেশমন্ত্রী ভূপেন্দ্র যাদব এই নিয়ে বিস্তারিত ব্যাখ্যা দিলেও তা আরাবল্লী সমস্যার সমাধান করেনি।
আরাবল্লী না থাকলে কী হত?
মৌসুমী বায়ু পূর্ব দিকে নির্বিঘ্নে প্রবাহিত হবে যার ফলে রাজস্থানে বৃষ্টিপাতের পরিমাণ কমবে। দিল্লিতেও ২০% কমবে বৃষ্টিপাত। থর মরুভূমি পূর্ব দিকে প্রসারিত হবে। উত্তপ ভারতে খরা দেখা দেবে। যদি আরাবল্লী পর্বতমালা সম্পূর্ণরূপে ধ্বংস হয়ে যায় তবে উত্তর ভারতের জলবায়ুর আমূল পরিবর্তন হবে।
অবৈধ খনন এবং নগরায়নের কারণে আরাবল্লী অঞ্চল বিপন্ন। সুপ্রিম কোর্ট সম্প্রতি আরাবল্লী অঞ্চলের সংজ্ঞাই সংশোধন করে দিয়েছে। শুধুমাত্র ১০০ মিটারের বেশি উঁচু পাহাড়গুলিকেই রক্ষা করার অনুমতি দেওয়া হয়েছে। বিজ্ঞানীরা সতর্ক করেছেন, এমনটা যদি চলতে থাকবে তাহলে উত্তর ভারত ১০ থেকে ২০ বছরের মধ্যে জলবায়ু সঙ্কটের সম্মুখীন হবে।
আরবল্লীর বিস্তার
আরাবল্লী পর্বতমালা প্রায় ৬৭০ কিমি দীর্ঘ। এটি প্রায় ২৫০ কোটি বছর পুরনো। এটি উত্তর ভারতকে থর মরুভূমির হাত থেকে রক্ষা করে। এটি জলবায়ু নিয়ন্ত্রণ এবং বৃষ্টিপাত ঘটায়। আরাবল্লী পর্বতমালা ৪টি রাজ্যের ২৯টি জেলা জুড়ে বিস্তৃত। গুজরাতের আরাবল্লী জেলা, রাজস্থানের উদয়পুর, রাজসমন্দ, আলওয়ার, জয়পুর, হরিয়ানার গুরুগ্রাম, ফরিদাবাদ, ভিওয়ানি, মহেন্দ্রগড়, রেউড়ি এবং দিল্লি রয়েছে এই তালিকায়।
আরাবল্লী পর্বতমালা না থাকলে উত্তর ভারত খরা এবং ধুলো ঝড়ে বিপন্ন হত। মাটির ক্ষয় রোধ করা যেত না। আরাবল্লী বনজঙ্গল কার্বন শুষে নেয় বায়ুমণ্ডল থেকে। এটি জলবায়ু পরিবর্তনের বিরুদ্ধে লড়াই করতে সহায়তা করে।
আরাবল্লী আশপাশে ৫ কোটি লোকের বাস
আরবল্লী পর্বতমালার আশপাশে প্রায় ৫ কোটি মানুষের বসবাস। এই জনসংখ্যা রাজস্থান, হরিয়ানা, গুজরাত এবং দিল্লি জুড়ে বিস্তৃত। এই অঞ্চলের গ্রামীণ এবং শহুরে উভয় জনসংখ্যাই আরাবল্লি পর্বতমালার উপর নির্ভরশীল। ২০১১ সালের আদমসুমারি অনুযায়ী, গুজরাতের আরাবল্লী জেলায় ১০ লক্ষেরও বেশি মানুষ বাস করে, যাদের মধ্যে ১২% শহরাঞ্চলীয়। এই মানুষ আরাবল্লী পর্বতমালার দ্বারা সরবরাহ হওয়া বিশুদ্ধ বায়ু এবং জল থেকে উপকৃত হন। কিন্তু এই এলাকায় খনন স্বাস্থ্য বিপন্ন করে তুলতে পারে তাদের।
মধ্য আরাবল্লী অঞ্চল ৩১টি প্রজাতির ছোট ও বড় স্তন্যপায়ী প্রাণীর আবাসস্থল। যার মধ্যে রয়েছে লেপার্ড, ভাল্লুক, পাখি, শিয়াল এবং মঙ্গুস। দিল্লি এবং হরিয়ানার আরাবল্লীতে ১৫ প্রজাতির স্তন্যপায়ী প্রাণী, ৩০০টিরও বেশি পাখির প্রজাতি এবং অসংখ্য সরীসৃপ রয়েছে। এছাড়াও ৪৭টি প্রজাতির কোলিওরপ্টেরা বিটল পোকা রয়েছে। যদি পাহাড় কাটা অব্যাহত থাকে তাহলে এই প্রাণীগুলি বিলুপ্ত হয়ে যেতে পারে অথবা শহর ও গ্রামে চলে যেতে পারে।
আরাবল্লী হল শুষ্ক ও পর্ণমোচী বন। যেখানে বাবলা ও নিমের মতো প্রজাতি রয়েছে। এখানে ২০০টিরও বেশি প্রজাতির গাছ রয়েছে। ঔষুধি গাছও রয়েছে এই তালিকায়।
কর্মসংস্থান ও আর্থিক সুবিধা
আরাবল্লী অঞ্চলের খনি, পর্যটন এবং বনজ সম্পদ কর্মসংস্থানের সুযোগ করে দেয়। ফরিদাবাদের জনসংখ্যার ৩৮.৮% মানুষ আগে খনির কাজে যুক্ত ছিলেন। যেগুলি এখন অবৈধ খননকার্য চালায়। পর্যটন লক্ষ লক্ষ মানুষের কর্মসংস্থানের সুযোগ করে দেয়। খনিজ ও পর্যটন থেকে মোট হাজার হাজার কোটি টাকার আয় হয়।
জাতীয় উদ্যান এবং অভয়ারণ্য
আরাবল্লী রেঞ্জে সরিস্কা টাইগার রিজার্ভ, অসোলা ভাট্টি বন্যপ্রাণী অভয়ারণ্য, রনথম্বোর জাতীয় উদ্যান, কৈলা দেবী অভয়ারণ্য এবং ফুলওয়ারি কি নল সহ অসংখ্য বন রয়েছে। মোট ২০টির বেশি অভয়ারণ্য রয়েছে।
পাহাড় কেটে ফেললে কী ক্ষতি?
যদি ১০০ মিটারের নীচের পাহাড়গুলি কেটে ফেলা হয় তবে প্রাণীদের আবাসস্থল ধ্বংস হয়ে যাবে। তারা শহরাঞ্চলে স্থানান্তরিত হবে। ফলে মানুষের বিপদ বাড়বে।