মকর সংক্রান্তির এই পুণ্যদিনে গঙ্গাসাগরে কত ভক্ত শাহি স্নান সারলেন? এই প্রশ্নের উত্তর খুঁজতে যাওয়া বৃথা সময়যাপন। যুগ যুগ ধরে যে বিশ্বাসে লক্ষ লক্ষ ভক্তের সমাগম হয় সাগর সঙ্গমে, তার সংখ্যা গুনে কী লাভ!
গঙ্গা যেখানে বঙ্গোপসাগরে মিশছে, সেই মিলনস্থানে ডুব দিলেই মোক্ষ লাভ। কথায় বলে, 'যা নেই মহাভারতে, তা নেই ভারতে'। সেই মহাভারতেও তো গঙ্গাসাগরের উল্লেখ রয়েছে। মহাভারতের বনপর্বে পাণ্ডবদের গঙ্গাসাগর সঙ্গমে আগমনের উল্লেখ আছে। কপিল মুনির অভিশাপ থেকে রাজা সাগরের ৬০,০০০ পুত্রকে মোক্ষ দিতে রাজা ভগীরথ গঙ্গাকে মর্তে নিয়ে আসেন।
আবার প্রাচীন প্রবাদ রয়েছে, 'সব তীর্থ বারবার, গঙ্গাসাগর একবার'। নানা রকম অর্থবহন করে এই প্রবাদ। কারও মতে, গঙ্গাসাগরে পুণ্যস্নান করতে যাওয়া খুব কষ্টসাধ্য। কঠিন, বিপদসঙ্কুল পথ পেরিয়ে, জল পেরিয়ে যেতে হয়। তাই গঙ্গাসাগর একবার।
আবার আরেক মত হল, তীর্থে মানুষ যান, সব পাপ মুছে ফেলতে। গঙ্গাসাগর এমন এক তীর্থস্থান, যেখানে মকর সংক্রান্তির ভোরে ডুব দিলে, সব পাপ ধুয়ে যায়। আর কোনও তীর্থেই যেতে হয় না। শুধু গঙ্গাসাগরে একবার ডুবল দিলেই পাপমুক্তি। শাপমুক্তি। তাই গঙ্গাসাগর একবার।
গঙ্গাসাগরের ওয়েবসাইটের তথ্য অনুযায়ী, জীবন ও মৃত্যুর বৃত্ত এবং মোক্ষ সম্পর্কে আর এই ভক্তির মুখ্য কেন্দ্রস্থল হল কপিল মুনির মন্দির। ভাগবত পুরাণ অনুযায়ী, কপিল মুনির পিতা ছিলেন মহর্ষি কর্দম মুনি এবং মাতা ছিলেন পৃথিবী শাসক স্বয়ম্ভব মনুর কন্যা দেবাহূতি।
কর্দম মুনি তাঁর পিতা ভগবান ব্রহ্মার আদেশ অনুযায়ী কঠোর তপস্যা করেছিলেন। তাঁর তপস্যায় সন্তুষ্ট হয়ে ভগবান বিষ্ণু তাঁর সামনে আবির্ভূত হন এবং কর্দম মুনিকে স্বয়ম্ভব মনুর কন্যা দেবহূতিকে বিবাহ করতে বলেন এবং ভবিষদ্বাণী করেন, কর্দম মুনি ও দেবাহূতির ৯টি কন্যা হবে এবং সময়ের সঙ্গে সমগ্র সৃষ্টিকে জীবিত সত্ত্বা দিয়ে পূর্ণ করবে।
এছাড়াও ভগবান বিষ্ণু জানান, তিনি নিজে অবতার রূপে কর্দম মুনি ও দেবহূতির সন্তান হয়ে জন্মগ্রহণ করবেন এবং সমগ্র বিশ্বকে সাংখ্য দর্শন প্রদান করবেন। কপিল মুনি প্রথম জীবনে বেদের অগাধ জ্ঞান অর্জন করেন এবং সাংখ্য দর্শনকে সারা বিশ্বে প্রসিদ্ধ করেন।
২০২৬ সালের মকর সংক্রান্তিতেও গঙ্গাসাগরে একই দৃশ্য। নাগা সাধুদের আখড়া ও লক্ষ লক্ষ ভক্তের সমাগম। জ্যোতিষশাস্ত্রে মকর সংক্রান্তিতে শাহি স্নানের বিষয়ে বলা হয়েছে,মকর সংক্রান্তি শুরু হয় যখন সূর্য মকর রাশিতে প্রবেশ করে এবং প্রায় এক মাস সেখানে অবস্থান করে।
মকর হল শনিদেবের অধিষ্ঠিত রাশি। শনি ও সূর্যের মধ্যে সম্পর্ক সাধারণত বিরোধপূর্ণ বলেই ধরা হয়, শনি হল সূর্যের পুত্র, তবুও দু’জনের মধ্যে মতানৈক্য রয়েছে। মকর সংক্রান্তিতে বিশ্বাস করা হয়, সূর্য এ সময় পুত্র শনির প্রতি অভিমান ভুলে মিলনের পথ তৈরি হয়। সেই কারণেই এই সময় শুভ মুহূর্ত।
পুণ্যার্থীদের যাতে কোনও অসুবিধা না হয়, সে দিকে নজর রেখেছে প্রশাসন। নিরাপত্তার স্বার্থে জাতীয় সড়কের যে সব অংশে স্থায়ী স্ট্রিট লাইট নেই, সেখানে অস্থায়ী ভাবে পর্যাপ্ত আলোর ব্যবস্থা করা হয়েছে।
উস্তি রোড, খড়িবেড়িয়া থেকে বিষ্ণুপুর থানা, শিরাকল থেকে কপাটহাট, ফলতার বিস্তীর্ণ এলাকা এবং বঙ্গনগর, এই সব জায়গায় অতিরিক্ত আলো বসানো হয়েছে। পাশাপাশি গুরুত্বপূর্ণ মোড়গুলিতে ওয়াচ টাওয়ার তৈরি করে দিনে-রাতে নজরদারি চালানো হচ্ছে।
গঙ্গাসাগর মেলায় যাওয়ার জন্য ২৭টি বিশেষ ট্রেন দিয়েছে রেল। প্রতিটি ট্রেনে গড়ে ২,৫০০-রও বেশি যাত্রী সফর করছেন।