
হিন্দুদের বারো মাসে তের পার্বণ। এর মধ্যে চৈত্র মাসের শুক্লাষ্টমী তিথিতে পুজো হয় দেবী অন্নপূর্ণার। বিশ্বাস অনুযায়ী, অন্নপূর্ণার পুজো করলে গৃহে অন্নাভাব থাকে না। কাশীতে (বারাণসী, উত্তর প্রদেশ) অন্নপূর্ণার একটি মন্দির আছে। যেখানের, অন্নকূট উৎসব প্রসিদ্ধ।
পশ্চিমবঙ্গে অন্নপূর্ণা পুজোর বিশেষ প্রচলন রয়েছে। প্রচলিত, কিংবদন্তি নদিয়া রাজবংশের প্রতিষ্ঠাতা ভবানন্দ মজুমদার বাংলায় অন্নপূর্ণা পুজোর প্রচলন করেন।
অন্নপূর্ণা পুজোর দিনক্ষণ
এবছর অন্নপূর্ণা পুজো পড়েছে ২৬ মার্চ। ২৫ মার্চ বিকেল ৪/৪৭ থেকে ২৬ মার্চ দুপুর ২/২৮ পর্যন্ত থাকবে অষ্টমী তিথি।
দেবী অন্নপূর্ণার মাহাত্ম্য
হিন্দু ধর্ম মতে, মা অন্নপূর্ণা সন্তুষ্ট হলে গৃহে কখনও অন্নের অভাব ঘটে না। পশ্চিমবাংলার বিভিন্ন স্থানে তাই ভক্তি ভরে দেবীর পুজো করা হয়। মা অন্নপূর্ণাকে অনেকে অন্নদা দেবী নামেও ডাকেন। দেবী অন্নপূর্ণার দুই হাতে অন্নপাত্র ও দর্বী থাকে, মাথায় থাকে নবচন্দ্র। এছাড়া একপাশে থাকে ভূমি এবং আর এক পাশে থাকে শ্রী। বিশ্বাস করা হয় যে, দেবীর নৃত্যপরায়ণ মহাদেব শিবকে দেখে সন্তুষ্ট হন।
এছাড়াও পুরাণে আছে, বিয়ের পর দেবাদিদেব শিব এবং পার্বতীর সংসারে এক সময়ে অন্নকষ্ট দেখা দেয়। সেই সময়ে তখন পার্বতীর থেকে তিরস্কৃত হয়ে মহাদেব ভিক্ষা করতে বেড়িয়ে পড়েন। কিন্তু পার্বতীর মায়ায় তিনি ভিক্ষা না পেয়ে, শেষে কৈলাশে ফিরে আসেন। ফিরে এসে পায়েস, পিঠে ইত্যাদি আহার করেন। এরপরই দেবী এই মহিমাবৃদ্ধির জন্য কাশীতে অন্নপূর্ণা দেবীর মন্দির প্রতিষ্ঠা হয়।
কৃষ্ণানন্দ রচিত তন্ত্রসার গ্রন্থ এবং দক্ষিণামূর্তি সংহিতা গ্রন্থে মা অন্নপূর্ণার পূজার উল্লেখ পাওয়া যায়। এছাড়াও কাশীতে অন্নপূর্ণা পূজা ও অন্নকূট পালন করা হয়।
অন্নপূর্ণা পূজোয় অন্নকূট
রানি রাসমণির কনিষ্ঠা কন্যা জগদম্বা ১৮৭৫ খ্রিস্টাব্দে ব্যারাকপুরে দক্ষিণেশ্বর মন্দিরের আদলে অন্নপূর্ণা মন্দির প্রতিষ্ঠা করেন। এই মন্দিরে বিরাজমান অষ্টধাতুর অন্নপূর্ণা ও মহাদেব। এই মন্দিরে অন্নপূর্ণা পুজোর দিন হয় অন্নকূট মহোৎসব। উত্তর কলকাতার শ্যামপুকুরের বলরাম ঘোষ স্ট্রিটের ভট্টাচার্য বাড়িতে ও কলকাতা-র রামমোহন রায় রোডের শ্রীশ্রীনগেন্দ্র মঠ এবং নগেন্দ্র মিশনে দেবী অন্নপূর্ণার অন্নকূট মহাসমারোহে উদযাপিত হয়।
অন্নপূর্ণা পুজোর নিয়মাবলী
* পুজোর দিন সকালে শুদ্ধ বস্ত্র পরে দেবী অন্নপূর্ণার ধ্যান করতে হয়। অনেকে সারা দিন উপবাস বা ফলাহার করেন।
* সকালে স্নান সেরে উপবাস রেখে দেবীর মূর্তিতে বা চিত্রে শাড়ি, অলঙ্কার, ফুল, ধূপ দিয়ে সাজানো হয়।
* এই পুজো সাধারণত রান্নাঘরে বা ঠাকুরঘরে করা হয়। পুজোর স্থানে হলুদ ও জল দিয়ে পবিত্র করে চালের গুঁড়ো দিয়ে আল্পনা আঁকা হয়।
* দেবীর সামনে চাল, ডাল, ভোগ ও মিষ্টি নিবেদন করে অন্নপূর্ণা স্তোত্র পাঠ এবং আরতি করা হয়।
* একটি পাত্রে চাল রেখে তার ওপর দেবীর মূর্তি স্থাপন করা হয়, যা অন্নের প্রাচুর্য নির্দেশ করে।
* দেবী অন্নপূর্ণাকে মূলত অন্ন বা ক্ষীর, পায়েস, মিষ্টি ভোগ দেওয়া হয়। ঘরে তৈরি নিরামিষ রান্নাও নিবেদন করা যায়।
* শ্রী অন্নপূর্ণা স্তোত্র, বা শ্রী অন্নপূর্ণা অষ্টকম পাঠ করা অত্যন্ত শুভ বলে মনে করা হয়।
* পুজোর শেষে দেবীকে প্রণাম করে পরিবারে সুখ-শান্তি ও অন্নের জন্য প্রার্থনা করা হয়।
অন্নপূর্ণা পুজোর মন্ত্র
"ওঁ সায়ুধায়ৈ সবাহনায়ৈ সালঙ্কারায়ৈ সপরিবারায়ৈ ওঁ হ্রীং অন্নপূর্ণায়ৈ পরমেশ্বর্য্যৈ নমঃ॥" মনে করা হয় এই মন্ত্র উচ্চারণে পরিবারে অন্নের অভাব মেটে।
অন্নপূর্ণার ধ্যানের মন্ত্র
"ওঁ রক্তাং বিচিত্র-বসনাং নবচন্দ্রচূড়ামন্নপ্রদাননিরতাং স্তনভারনম্রাম্।
নৃত্যন্তমিন্দুশকলাভরণং বিলোক্য হৃষ্টাং ভজে ভগবতীং ভবদুঃখহন্ত্রীম্॥"
প্রণাম মন্ত্র
"অন্নপূর্ণে নমস্তুভ্যং নমস্তে পরমম্বিকে।
তচ্চারুচরণে ভক্তিং দেহি দীনদয়াময়ি॥
অন্নপূর্ণে সদাপূর্ণে শঙ্করপ্রাণবল্লভে।
জ্ঞানবৈরাগ্যসিদ্ধ্যর্থং ভিক্ষাং দেহি নমোহস্তুতে।"