
বাঙালির বারো মাসে তের পার্বণ। দুর্গাপুজো, লক্ষ্মীপুজো, কালীপুজো, ভাইফোঁটা, জগদ্ধাত্রী পুজোর পরই সকলে অপেক্ষা করে থাকেন, সরস্বতী পুজোর। মূলত মাঘ মাসের শুক্লা পঞ্চমী তিথিতে বসন্ত পঞ্চমী বা সরস্বতী পুজো হয়। ইংরাজী নতুন বছরের একেবারে শুরুর দিকেই পড়ে সরস্বতী পুজোর দিন। উত্তর ভারত, পশ্চিমবঙ্গ, ওড়িশা, নেপাল, ভুটান ও বাংলাদেশে সরস্বতী পুজো উপলক্ষ্যে বিশেষ উৎসাহ উদ্দীপনা পরিলক্ষিত হয়।
এই পুজোর জন্যে সকলে সারা বছর ধরে অপেক্ষা করে থাকেন। বিশেষত শিক্ষার্থীদের জন্যে সরস্বতী পুজো খুবই স্পেশাল। সকাল থেকেই উপোস থেকে বাগদেবীর উদ্দেশ্যে অঞ্জলি দেন তারা। বিদ্যা, বুদ্ধি, জ্ঞানের প্রার্থনা করেন সরস্বতী মায়ের কাছে। ২০২৫-র বিদায় ঘণ্টা বেজে গেছে। জেনে নিন ২০২৬-র বসন্ত পঞ্চমীর কবে পড়েছে এবং শুভ তিথি কখন।
সরস্বতী পুজো ২০২৬-র তারিখ
২০২৬ সালের ২৩ জানুয়ারি, শুক্রবার (বাংলায় ৯ মাঘ) সরস্বতী পুজো পড়েছে।
সরস্বতী পুজোর পঞ্চমী তিথি
২২ জানুয়ারি রাত ১:৩৯ মিনিট থেকে ২৩ জানুয়ারি রাত ১২:২৯ মিনিট পর্যন্ত থাকবে পঞ্চমী তিথি।
সরস্বতী পুজোর পুষ্পাঞ্জলি মন্ত্র
ওঁ জয় জয় দেবী চরাচরসারে, কুচযুগ-শোভিত মুক্তাহারে। বীণারঞ্জিত পুস্তক হস্তে, ভগবতী ভারতী দেবী নমোহস্তুতে।।
নমঃ সরস্বত্যৈ নমো নমঃ নিত্যং ভদ্রকাল্যৈ নমো নমঃ। বেদ- বেদাঙ্গ- বেদান্ত- বিদ্যাস্থানেভ্য এব চ।। এষ সচন্দন পুষ্পবিল্ব পত্রাঞ্জলি সরস্বত্যৈ নমঃ।।- এই মন্ত্রে তিনবার অঞ্জলি দেওয়ার নিয়ম রয়েছে।
সরস্বতী পুজোর প্রণাম মন্ত্র
নমো সরস্বতী মহাভাগে বিদ্যে কমল-লোচনে। বিশ্বরূপে বিশালাক্ষ্মী বিদ্যাং দেহি নমোহস্তুতে।। জয় জয় দেবী চরাচরসারে, কুচযুগশোভিত মুক্তাহারে। বীণারঞ্জিত পুস্তক হস্তে, ভগবতী ভারতী দেবী নমোহস্তুতে।।
পুজোর গুরুত্বপূর্ণ সামগ্রী
শ্রী পঞ্চমীর দিনি সকালেই সরস্বতী পুজো সম্পন্ন করা হয়। সাধারণত নিয়মে পুজো হলেও বেশ কয়েকটি সামগ্রির প্রয়োজন হয়। যেমন- আমের মুকুল, অভ্র- আবির, দোয়াত- খাগের কলম, পলাশ ফুল, বই ও বাদ্যযন্ত্রাদি। এছাড়াও বাসন্তী রঙের গাঁদা ফুল ও মালা প্রয়োজন হয়।
আরও পড়ুন: 'S' দিয়ে নাম শুরু হওয়া ব্যক্তিদের নতুন বছরে ভাগ্য চমকাবে! অর্থ, প্রেম,কর্মজীবন কেমন কাটবে?
সরস্বতী পুজোর সঙ্গে জড়িত লোকাচার
প্রচলিত লোকাচার অনুযায়ী, সরস্বতী পুজো সম্পন্ন হওয়ার আগে পর্যন্ত কুল খেতে নেই। যদিও এর পেছনে রয়েছে আরও অনেক ব্যাখ্যা। তবে স্কুল- কলেজ ও বিভিন্ন শিক্ষা প্রতিষ্ঠানে বাগদেবীর আরাধনার করার পরে অঞ্জলি দিয়ে ছাত্র-ছাত্রীরা কুল খাওয়ার রীতি বহুদিন ধরে।
সরস্বতী বৈদিক দেবী
সরস্বতী বৈদিক দেবী হলেও সরস্বতী পুজো বর্তমান রূপটি আধুনিক কালে প্রচলিত হয়েছে। তবে প্রাচীন কালে তান্ত্রিক সাধকেরা সরস্বতী-সদৃশ দেবী বাগেশ্বরীর পুজো করতেন বলে জানা যায়। ঊনবিংশ শতাব্দীতে পাঠশালায় প্রতি মাসের শুক্লা পঞ্চমী তিথিতে ধোয়া চৌকির উপর তালপাতার তাড়ি ও দোয়াতকলম রেখে পুজো করার প্রথা ছিল। শ্রীপঞ্চমী তিথিতে ছাত্রেরা বাড়িতে বাংলা বা সংস্কৃত গ্রন্থ, শ্লেট, দোয়াত ও কলমে সরস্বতী পূজা করত। গ্রামাঞ্চলে এই প্রথা বিংশ শতাব্দীতেও প্রচলিত ছিল। শহরে ধনাঢ্য ব্যক্তিরাই সরস্বতীর প্রতিমা নির্মাণ করে পুজো করতেন।
সরস্বতী শব্দের অর্থ
'সরস' শব্দের অর্থ হল জল। সুতরাং সরস্বতী শব্দের অর্থ হলো জনবতী বা নদী। অনেক পণ্ডিতই মনে করেন দেবী সরস্বতী প্রথমে ছিলেন নদী। পরে তিনি দেবী হিসেবে পূজিত হন। তিনি চেতনা ও জ্ঞানের দেবী। দূর দুরান্ত থেকে মানুষ এই পুজোর বিসর্জন দেখতে আসত। পুজো উপলক্ষ্যে প্রায় দু'ঘণ্টা আতশবাজিও পোড়ানো হত। আধুনিক শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানে সরস্বতী পুজোর প্রচলন হয় বিংশ শতাব্দীর প্রথমার্ধে।
দেবী সরস্বতীর তান্ত্রিক রূপ
দেবী সরস্বতী সম্পর্কে বেশিরভাগ মানুষই জানেন। তবে দেবী মাতঙ্গীর কথা অজানা প্রায় সকলের। দেশের কিছু অঞ্চলে সরস্বতী পূজিত হন সম্পূর্ণ অন্য রূপে, যার নাম মাতঙ্গী। দশমহাবিদ্যার নবম রূপ এবং দেবী সরস্বতীর তান্ত্রিক রূপই হলেন দেবী মাতঙ্গী। বাগদেবীর মতো তিনিও বিদ্যা ও সঙ্গীতের দেবী। কিন্তু সরস্বতীর সঙ্গে মাতঙ্গীর রয়েছে বেশ কিছু পার্থক্য। তন্ত্র ধর্ম মতে, মাতঙ্গীর বাহ্যিক রূপ, ভোগ এবং অন্যান্য বৈশিষ্টের সঙ্গে জড়িয়ে রয়েছে নানা কাহিনি। দেবী মাতঙ্গীর আরেক নাম উচ্ছিষ্টা চণ্ডালিনী। পুরাণ অনুযায়ী, মাতঙ্গ নামের এক মুনির আশ্রমে দেবতারা যখন সাধনা করছিলেন, তখন দেবী মাতঙ্গী আবির্ভূতা হয়ে শুম্ভ ও নিশুম্ভকে বধ করেন। তাই এই দেবীর মাথায় চাঁদ শোভিত।
শাস্ত্রজ্ঞরা বিশ্লেষণ করেন, যখন দেবী মহাকালীর রুদ্ররূপিণী পাপনাশিনী রূপ এবং দেবী সরস্বতীর অসীম জ্ঞান একইরূপে মিলিত হয়, তখন সৃষ্টি হয় দেবী মাতঙ্গীর। এজন্যে একমাত্র জ্ঞান ও শক্তির মিলিত রূপই পারে পাপকে ধ্বংস করে পৃথিবীতে পুণ্যের আলো ছড়িয়ে দিতে। দেবী মাতঙ্গী তার ভক্তদের অন্তরের দুর্নীতি, পরশ্রীকাতরতা এবং কুণ্ঠাবোধের সমস্ত ক্লেদ নিজ অঙ্গে গ্রহণ করে মানুষের অন্তর শুদ্ধি করেন। মানুষের মধ্যেই তার উপস্থিতি। তাই মানুষকে অবহেলা করে উৎকৃষ্ট ভোগ তাকে নিবেদন করলেও, তিনি সন্তুষ্ট হবেন না।
অসমের কামাখ্যার মূল মন্দিরের ভিতরে তান্ত্রিক দশমহাবিদ্যার দশ দেবীর আলাদা মন্দির রয়েছে। যার মধ্যে নবম মহাবিদ্যা- দেবী মাতঙ্গী কন্যারূপে। কর্ণাটকের বেলেগাওঁ, অন্ধ্রপ্রদেশের মাদানাপাল্লাতে, তামিলনাড়ুর নাঙ্গুর এবং মধ্যপ্রদেশের ঝাবুয়াতে রয়েছে দেবী মাতঙ্গীর মন্দির।