
এক সময় ইঞ্জিনিয়ারিং বলতে সবাই সিভিল, মেকানিক্যাল বা ইলেকট্রিক্যালই বুঝতেন। কিন্তু গত এক দশকে সেই ছবিটা আমূল বদলে দিয়েছে IT সেক্টর। এখন অধিকাংশ ইঞ্জিনিয়ারিং পড়ুয়ার লক্ষ্য সফ্টওয়্যার কোম্পানির চাকরি। তবে আর্টিফিশিয়াল ইন্টেলিজেন্সের (AI) দ্রুত অগ্রগতির ফলে সেই IT র চাকরি নিয়েই তৈরি হয়েছে অনিশ্চয়তা। ফলে প্রশ্ন উঠছে; আবার কি কোর ইঞ্জিনিয়ারিংয়ের বাজার ফিরবে?
দেশের শীর্ষ পাঁচ IT সংস্থায় চলতি অর্থবর্ষের প্রথম নয় মাসে মোট নেট নিয়োগ হয়েছে মাত্র ১৭ জন। গত বছর একই সময়ে যেখানে ১৭ হাজারের বেশি নতুন কর্মী নিয়োগ করা হয়েছিল। শিল্পমহলের মতে, এটি সাময়িক মন্দা নয়, বরং IT শিল্পের কাঠামোগত পরিবর্তনের ইঙ্গিত।
AI-র প্রভাবে কমছে ফ্রেশার নিয়োগ
বিশেষজ্ঞদের মতে, AI এখন এমন অনেক কাজ করতে পারছে, যা আগে জুনিয়র সফ্টওয়্যার ইঞ্জিনিয়াররা করতেন। ফলে সংস্থাগুলি নতুন ফ্রেশার নিয়োগ কমিয়ে অভিজ্ঞ কর্মী বা AI-বেসড সমাধানের উপর বেশি নির্ভর করছে।
IIT কানপুরের AIML এক্সিকিউটিভ মাস্টার্সের ছাত্র এবং সফ্টওয়্যার ইঞ্জিনিয়ার সুজয় কংসবণিক বলেন, 'এখন যাঁরা সফ্টওয়্যার ইঞ্জিনিয়ারিং পড়ছেন, তাঁদের চাকরির বাজার আগামী ৩-৪ বছরে আরও বদলে যাবে। ফ্রেশার নিয়োগ ইতিমধ্যেই কমছে। তাই AI সংক্রান্ত দক্ষতা অর্জন এখন অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ।'
কেন এখনও IT-র দিকেই ঝোঁক বেশি?
চাকরির বাজার বিশ্লেষণকারী সংস্থা ভারত ট্যালেন্ট ব্রিজ কনসালটিং-এর নেহা গারওয়াল বলেন, 'ভারতে কম্পিউটার সায়েন্স এখন অত্যন্ত স্যাচুরেটেড। তবুও পড়ুয়ারা IT-তেই যেতে চাইছেন। কারণ বেতনের পার্থক্য অনেক বেশি।' NIT ফ্রেশারদের একটি উদাহরণও দিলেন নেহা। বললেন, 'কোর ইঞ্জিনিয়ারিংয়ের কোম্পানিগুলি এন্ট্রি লেভেলে বছরে ৪-৮ লক্ষ টাকা CTC দিচ্ছে। এদিকে IT সেক্টরে সেই অঙ্ক ৮-২০ লক্ষ টাকা বা তারও বেশি।'
টিয়ার থ্রি কলেজে ছবিটা আরও খারাপ। নেহা জানালেন, যাঁরা তুলনামূলকভাবে খারাপ ব়্যাঙ্ক করে অনামী প্রাইভেট কলেজে পড়ছেন, তাঁদের কাছে অপশন কম। বলেন, 'এই সব কলেজের কোর পাসআউটরা ছোটখাটো কোম্পানিতেই প্লেসমেন্ট পান। সেখানে মাইনে বড়জোর মাসে ১৫ থেকে ২০ হাজার টাকা। এদিকে সেই স্টুডেন্টই কোডিং শিখে IT তে ২৮-৩০ হাজার টাকা ইন-হ্যান্ড পাচ্ছেন শুরুতেই।'
তিনি আরও বলেন, 'অনেক কোর ইঞ্জিনিয়ারিং চাকরিতে বন্ড থাকে। ২-৩ বছরের আগে সুইচ করা যায় না। তাছাড়া কোরে প্রথম কয়েক বছরে বেতনও সেভাবে বাড়ে না। অন্যদিকে IT সেক্টরে সহজেই চাকরি বদল করা যায়। টুকটাক কোর্স করে স্কিল অল্প বাড়াতে পারলেই বেতন লাফিয়ে লাফিয়ে বাড়ে।'
কোর ইঞ্জিনিয়ারিং কি ফের গুরুত্ব পাবে?
রিক্রুটারদের মতে, AI-এর প্রভাবে IT চাকরিতে অনিশ্চয়তা বাড়ছে। কিন্তু কোর ইঞ্জিনিয়ারিংয়ের সেই ভয় নেই। কারণ, AI সফ্টওয়্যার তৈরি করতে পারলেও সেতু, রাস্তা, কারখানা বা বিদ্যুৎ কেন্দ্র তৈরির কাজে এখনও সেভাবে প্রভাব ফেলতে পারেনি। পরিকাঠামো উন্নয়ন, উৎপাদন শিল্প এবং প্রতিরক্ষা ক্ষেত্রে এখনও দক্ষ কোর ইঞ্জিনিয়ারের প্রয়োজন অপরিহার্য।
ভারতে পরিকাঠামো, ম্যানুফ্যাকচারিং এবং সেমিকন্ডাক্টর শিল্পও বাড়ছে। এই সেক্টরগুলিতে সিভিল, মেকানিক্যাল এবং ইলেকট্রিক্যাল ইঞ্জিনিয়ারদের চাহিদা ভবিষ্যতে বাড়তে পারে বলে মনে করছেন বিশেষজ্ঞরা।
সামাজিক ভাবমূর্তিও বড় কারণ
বিশেষজ্ঞদের মতে, IT সেক্টরকে এখনও 'মডার্ন' এবং 'হাই ইনকাম' ফিল্ড হিসাবে দেখা হয়। তুলনায় কোর ইঞ্জিনিয়ারিংকে অনেক সময় 'ওল্ড স্কুল' মনে করা হয়। ফলে পড়ুয়ারা IT-র দিকে ঝুঁকছেন।
তবে AI-এর যুগে IT-র চাকরির নিরাপত্তা একটি বড় প্রশ্ন হয়ে দাঁড়িয়েছে। অনেকেই এখন বুঝতে পারছেন, শুধুমাত্র সফ্টওয়্যার দক্ষতার উপর নির্ভর করা ঝুঁকিপূর্ণ হতে পারে।
ভবিষ্যতের চাকরির বাজার কোন দিকে?
বিশেষজ্ঞদের মতে, ভবিষ্যতে AI ডোমেনে কাজ করা ইঞ্জিনিয়ারদেরই সবচেয়ে বেশি চাহিদা থাকবে। আর দীর্ঘমেয়াদে কেরিয়ারের দিক থেকে কোর ইঞ্জিনিয়ারিং তুলমানূলকভাবে 'সেফ অপশন'। তবে IT ও কোরের বিভাজন এখনই কমার সম্ভাবনা কম।
ফলে একটি বিষয় স্পষ্ট। চাকরির বাজারে বড় পরিবর্তন আসতে চলেছে। সেই পরিবর্তনে কোর ইঞ্জিনিয়ারিং ফের গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা নিতে পারে বলেই মনে করছেন বিশেষজ্ঞরা।