
AI and IT jobs India: ইলেভেন-টুয়েলভে সায়েন্স। জয়েন্ট এন্ট্রান্স। ইঞ্জিনিয়ারিং। IT সেক্টরে চাকরি। এই চেনা, পরীক্ষিত রুটেই স্বচ্ছলতার মুখ দেখেছেন এদেশের লক্ষ লক্ষ মেধাবী যুবক-যুবতী। ভারত তথা পশ্চিমবঙ্গে তথ্যপ্রযুক্তি শুধু শিল্প নয়। এটি বহু পরিবারের আর্থিক নিরাপত্তার ভিত। সল্টলেকের সেক্টর ফাইভ বা নিউটাউনের তথ্যপ্রযুক্তি হাব; হাজার হাজার যুবক-যুবতী এখান থেকেই কর্মজীবন শুরু করেছেন। কিন্তু সেই IT র স্বর্ণযুগই কি এবার ইতির মুখে? কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তা বা AI কি আইটি ইঞ্জিনিয়ারদের সুসময়ে দাড়ি টানতে চলেছে?
প্রশ্নটা শুধু সিলিকন ভ্যালির নয়। সেক্টর ফাইভ থেকে বেঙ্গালুরুও এখন ঠিক একই দুশ্চিন্তায় ভুগছে।
সম্প্রতি মাইক্রোসফটের AI প্রধান মুস্তাফা সুলেমান দাবি করেছেন, আগামী ১২ থেকে ১৮ মাসের মধ্যে অধিকাংশ 'হোয়াইট কলার' জবই AI স্বয়ংক্রিয়ভাবে করতে পারবে। আইনজীবী থেকে অ্যাকাউন্ট্যান্ট, প্রোজেক্ট ম্যানেজার থেকে সফটওয়্যার ইঞ্জিনিয়ার; ডেস্কে বসে কম্পিউটারে কাজের দিন নাকি শেষ। একই সুর OpenAI এবং অ্যানথ্রপিকের শীর্ষ কর্তাদের মুখেও।
এহেন প্রেক্ষাপটে ভারতে উদ্বেগ বাড়াচ্ছে সাম্প্রতিক পরিসংখ্যান। দেশের শীর্ষ পাঁচ IT সংস্থায় চলতি অর্থবর্ষের প্রথম নয় মাসে মাত্র ১৭ জন নেট নিয়োগ হয়েছে। গত বছর এই একই সময়ে নেট নিয়োগ হয়েছিল ১৭ হাজারেরও বেশি।
শিল্পমহলের একাংশের মতে, এটি সাময়িক মন্দা নয়। IT সেক্টরের সম্পূর্ণ কাঠামোতেই পরিবর্তনের ইঙ্গিত। AI এর দাপটে জুনিয়র ইঞ্জিনিয়ারদের চাহিদা কমছে প্রতিনিয়ত।
এই বিষয়ে IT ও AI বিশেষজ্ঞরা কী বলছেন? আসুন জেনে নেওয়া যাক,
আইটি সেক্টরে 'বড় মোড়'
সুজয় কংসবণিক, AI/ML Executive Masters করছেন, IIT Kanpur থেকে। তাঁর মতে, 'চাকরির ক্ষেত্রে পরিবর্তন আসবে। IT সংস্থাগুলিতে যেমন নেট হায়ারিং কম হচ্ছে। IT ইঞ্জিনিয়ারদের চাকরির ধরণে পরিবর্তন হবে। AI ডোমেইনে আরও বেশি প্রশিক্ষিত ইঞ্জিনিয়ারদের চাকরি হবে। তাই এটাকে ইন্ডাস্ট্রিতে একটা বড় মোড় বলা যেতে পারে।'
যাদবপুর বিশ্ববিদ্যালয়ের B.Tech, CSE সুজয় একাধিক প্রথম সারির তথ্যপ্রযুক্তি সংস্থায় কাজ করেছেন। সেই অভিজ্ঞতা থেকেই বললেন, 'বর্তমানে বহু সফটওয়্যার ইঞ্জিনিয়ার Claude, Cursor এর মতো AI টুল ব্যবহার করছেন। তবে এখনও AI নির্ভুল কোড লিখতে পারে না। প্রাথমিক স্তরের কোড তৈরি করতে পারে। তবে শেষ পর্যন্ত মানুষের তদারকি প্রয়োজন। তাই এখনও একেবারে নির্ভুল কোডের জন্য সফ্টওয়্যার ইঞ্জিনিয়ারদেরই দরকার। তবে ভবিষ্যতে AI আরও ভাল কোডিং করবে। তাই তখন পরিস্থিতি কী হবে, তা বলা কঠিন। '
ফলে প্রশ্ন থেকেই যায়। আরও ৫ বা ১০ বছর পরে কী হবে? যাঁরা এখন সফটওয়্যার ইঞ্জিনিয়ারিং পড়ার পরিকল্পনা করছেন, তাঁদেরই বা ভবিষ্যত কী?
সুজয়ের মতে, 'এখন যাঁরা সফ্টওয়্যার ইঞ্জিনিয়ারিং পড়ছেন, তাদের মার্কেট ঠিক এখনকার মতো থাকবে না। এখনই নতুন ফ্রেশারদের নিয়োগ কমছে। ফলে ৩-৪ বছর পর সেটা আরও কমবে। তাই AI সংক্রান্ত পড়াশোনা করা, ব্যবহার শেখা গুরুত্বপূর্ণ।'
'AI এর ব্যবহার শিখতে হবে', সফটওয়্যার ডেভেলপারের অভিজ্ঞতা
শ্রমনা সেনগুপ্ত, AMDOCS-এর সফটওয়্যার ডেভেলপার, জানালেন, 'যাঁরা এই সেক্টরে নতুন আসছেন, তাঁদের AI নিয়ে পড়তে হবে। কারণ আমরা যারা কাজ করছি, তাদের AI এজেন্টদের ট্রেন করতে হয় আমাদের কাজ করানোর জন্য। সত্যি বলতে এখন ওটা একটা প্ল্যাটফর্মের মতো কাজ করছে, যেখানে সমস্ত ডেটাবেস থেকে একটা সামারাইজড রেজাল্ট দেখাচ্ছে। কিন্তু AI নিজে নিজেই সব কাজ সেরে ফেলবে, এমন পর্যায়ে পৌঁছায়নি। তবে ভবিষ্যতে AI এর ব্যবহার বাড়বে। তাই যাঁরা নতুন পড়াশোনা করছেন, তাঁদের AI সংক্রান্ত বিষয়ে পড়তে হবে।'
অর্থাৎ, AI এখনও সম্পূর্ণ বিকল্প নয়, বরং 'সহকারী' বলা যেতে পারে। কিন্তু সেই সহকারীকে ব্যবহার করাটাও আপনাকেই শিখতে হবে।
'অনেক চাকরি যাবে, আবার নতুন চাকরিও তৈরি হবে'
অর্ণব ঘোষের(Applied Data Scientist, Deloitte (M.Tech, AIML, BITS Pilani)) মতে, পরিবর্তন অনিবার্য।
'খুব সংক্ষেপে বললে, AI এসে যাওয়াতে সবকিছুতেই একটা বড়সড় পরিবর্তন ঘটতে চলেছে। যেকোনও প্রসেস সংক্রান্ত কাজ আর আগামী ১০ বছরে থাকবে না। যেমন ধরুন, কেউ সারাদিন টিকিট সলভ করছে, বা অপারেশন সংক্রান্ত কাজ করছে... সেগুলি কমে যাবে। সফটওয়্যার ডেভেলপমেন্টের কাজও কমবে। যাঁরা AI ব্যবহার করে সেই কাজগুলো করতে পারবেন, তাঁদেরই চাকরি টিকে থাকবে।'
তিনি আরও বলেন, 'নেট হায়ারিং কমছে ঠিকই। তবে অনেকের চাকরিও হচ্ছে। আবার অনেকের চাকরি যাচ্ছেও। সেই কারণে নেট হায়ারিংয়ের সংখ্যাটা এত কম। নতুন নতুন জব রোলও তৈরি হবে। তবে অনেক চাকরিও যাবে। কারণ আমাদের দেশে সবাই খুব দ্রুত নিজেদের আপস্কিল করতে পারেন না।'
অর্থাৎ, বদল হবে দ্বিমুখী। যেমন নতুন সুযোগও আসবে, তেমন চাকরি যাওয়ার ঝুঁকিও বাড়বে। পুরোটাই নির্ভর করছে আপনি কীভাবে নিজেকে তৈরি করবেন, তার উপর।
ফ্রেশারদের সামনে কঠিন সময়?
বিশেষজ্ঞদের মতে, এখন যাঁরা সফটওয়্যার ইঞ্জিনিয়ারিং পড়ছেন, তাঁদের বাজার ৩-৪ বছর পরে একেবারেই বদলে যেতে পারে। ইতিমধ্যেই ফ্রেশার নিয়োগ কমেছে। ফলে ভবিষ্যতে প্রতিযোগিতা আরও তীব্র হবে।
তবে এটিই কি 'স্বর্ণযুগের' অবসান? নাকি নতুন যুগের সূচনা?
বিশেষজ্ঞরা বলছেন, আইটি-র চেহারা বদলাবে। AI ব্যবহারে দক্ষ ও বিশেষজ্ঞদের গুরুত্ব বাড়বে। কিন্তু প্রযুক্তির ইতিহাস বলছে, এহেন একেকটি শিল্প বিপ্লবে দীর্ঘমেয়াদে ভালই হয়েছে। সাময়িকভাবে কাজ কমলেও, প্রচুর নতুন Job Role তৈরি হয়েছে।
বাম জমানায় ঠিক একইভাবে কম্পিউটারের ব্যবহার নিয়ে অনেকে শঙ্কায় ভুগেছিলেন। হাতেকলমে কাজ কমে যাবে বলে রব উঠেছিল। কম্পিউটারের বিরুদ্ধে আন্দোলনও হয়েছে এদেশে। আর আজ কম্পিউটার ছাড়া বেশিরভাগ অফিসই অচল। AI-এর ব্যাপারটাও কি তেমনই হবে?
সেই প্রশ্নই এখন ভাবাচ্ছে বাংলার তরুণ প্রজন্মকে। বিশেষজ্ঞরা বলছেন, সামনে একটাই পথ। ভয় নয়, প্রস্তুতি নিতে হবে। AI-কে প্রতিপক্ষ নয়, হাতিয়ার হিসেবে ব্যবহার করতে শেখাই এখন সময়ের দাবি।
IT সেক্টরের স্বর্ণযুগ শেষ কি না, তার উত্তর সময় দেবে। তবে বদলের ঘণ্টা যে বেজে গিয়েছে, সে বিষয়ে কোনও সন্দেহ নেই।