
স্পেশাল চাইল্ড বলতে আপনি কী বোঝেন? সেরিব্রাল পালসি, ডাউন সিন্ড্রোম, ডিসলেক্সিয়া, ইমোশনাল ডিসঅর্ডার, মূক-বধির, দৃষ্টিশক্তি কম ইত্যাদি নানা সমস্যার নাম ভিড় করে মগজে। সমস্যাটা ঠিক এইখানেই। স্পেশাল দাগিয়ে দিয়ে সমাজ থেকে আলাদা করা। শিশুরা তো শিশুই। সেখানে স্পেশাল, জেনারেল আবার কী! সমাজের এই বিভেদের মানসিকতা দূর করতেই এক সাহসী কর্মযজ্ঞে নেমেছে নিউটাউন ডে কেয়ার (Newtown Daycare a Preschool & Day Care)। এখানে সবাই স্পেশাল। আবার কেউই স্পেশাল নয়। দিনের শেষে সবাই এক। শিশুদের কোনও বিভেদ নেই। সবাই মিলেমিশে।
একসঙ্গে পড়াশোনা, খেলা, খাওয়াদাওয়া-হইচই
নিউটাউন ডেকেয়ারে স্পেশাল শিশু ও নর্মাল শিশুরা একসঙ্গে পড়াশোনা, খাওয়াদাওয়া-হইচই, আনন্দে দিন কেটে যায় ওদের। ২০২৩ সালে শুরু হয় এই প্রতিষ্ঠানের যাত্রা। বর্তমানে দেড়শো শিশুর আনন্দে দিন কাটে একছাদের তলায়। নিউটাউনের CE ব্লকে সাড়ে ৮ হাজার বর্গফুটের বাড়ি। সবাই একটি পরিবারের মতো বাস করেন। আনন্দে দিন কাটে শিশুদেরও। বিশেষ ভাবে সক্ষম বা স্পেশাল চাইল্ডদের পাশাপাশি সাধারণ বা নিউরোটিপিক্যাল শিশুদেরও দেখভাল করা হয় দিনভর। নিউরোটিপিক্যাল বলতে সেই সব শিশুদের বোঝানো হয়, যাদের মানসিক ও স্নায়বিক বিকাশ বয়স অনুযায়ী স্বাভাবিক। যাদের আমরা সাধারণ কথায় ‘নর্মাল’ শিশু বলি। কারও অটিজম আছে, কারও ডাউন সিন্ড্রোম, আবার কারও সামাজিক দক্ষতা কম বা বুদ্ধিবৃত্তিক সমস্যা রয়েছে। এখানে প্রি-স্কুলে ভর্তি নেওয়া হয় দেড় বছর বয়স থেকে। আর ডেকেয়ারে ছয় মাস বয়সি শিশুরাও আসে।
মা-বাবারা এখানে সন্তানকে নিশ্চিন্তে রাখছেন
শুধু কলকাতা নয়, হাওড়া, মালদা সহ বিভিন্ন জেলার মা-বাবারা এখানে সন্তানকে নিশ্চিন্তে রাখছেন। এমনকী ভুটান থেকেও শিশুকে ভর্তি করা হয়েছে। কীভাবে শুরু হয়েছিল এই প্রতিষ্ঠান? নিউটাউন ডেকেয়ারের ট্রাস্টি সুদীপ কুণ্ডু জানালেন, 'নর্মাল শিশুদের ডে কেয়ার অনেক রয়েছে। কিন্তু স্পেশাল চাইল্ডদের জন্য কোনও ডে কেয়ার নেই। এখানে স্পিচ থেরাপি, অকুপেশনাল থেরাপি এবং আচরণগত সমস্যার জন্য আলাদা আলাদা বিশেষজ্ঞ রয়েছেন। ফলে ক্লাস শেষ হওয়ার পর শিশুদের আবার অন্য কোথাও নিয়ে যেতে হয় না। বিশেষভাবে সক্ষম শিশুদের মায়েদের অনেক সময়ই কাজ ছেড়ে দিতে হয়, কারণ বাইরে থেকে আনা আয়ার উপর ভরসা করা কঠিন হয়ে যায়। কিন্তু এখানে সিসিটিভি নজরদারি রয়েছে, ফলে বাবা–মায়েরা যে কোনও সময় মোবাইলের মাধ্যমে নিজের সন্তানের দিকে নজর রাখতে পারেন।'
সকাল সাড়ে ৮টা থেকে সন্ধে ৭টা পর্যন্ত নিরলস সেবা
নিউটাউন ডেকেয়ার-এর মার্কেটিং অ্যান্ড অপারেশনস প্রধান ইন্দ্রাক্ষী সারঙ্গীর কথায়, 'স্পেশাল চাইল্ড বলে সমাজে শিশুদের মধ্যে যে বিভেদ টানে, আমরা সেই বিভেদটাই ঘুচিয়ে দিয়েছি। এখানে সব শিশু একসঙ্গে থাকে, পড়াশোনা করে, খাওয়াদাওয়া করে। অনেক সময় কোনও শিশু হাইপার হয়ে গেলে, আমরা ভীষণ ঠান্ডা মাথায়, আমাদের অত্যন্ত দক্ষ ও অভিজ্ঞ টিচাররা ওই শিশুকে আইসোলেট করে শান্ত করি। খুব প্রয়োজন না হলে, মা-বাবাকে ফোন করা হয় না। আমাদের মূল দায়িত্ব হল, মা-বাবা সন্তানকে সকালে যখন এখানে দিয়ে যাবেন, সন্ধ্যায় একদম শান্তিপূর্ণ ভাবে নিয়ে যাবেন। কোনও ঝক্কিঝামেলা পোহাতে হবে না।' সকাল সাড়ে ৮টা থেকে সন্ধে ৭টা পর্যন্ত নিরলস সেবা চলে এই প্রতিষ্ঠানে।
এডিএইচডি (অ্যাটেনশন ডেফিসিট হাইপারঅ্যাকটিভিটি ডিসঅর্ডার) বা ক্রনিক এপিলেপ্সিতে ভোগা শিশুদের অনেক স্কুলই ভর্তি নিতে চায় না। ফলে ছোটবেলাতেই অনেক অভিভাবকের মনে ভয় তৈরি হয়। সেই সব চিন্তা থেকে মুক্তির নাম Newtown Daycare a Preschool & Day Care। ব্রেক ফাস্ট থেকে লাঞ্চ, একেবারে বাড়ির খাবার পায় শিশুরা। ইন্দ্রাক্ষীর কথায়, 'একটি শিশু বাড়িতে সুজি খেতে চায় না। পোহা খেতে চায় না। অথচ এখানে একেবারে সহজ ভাবে আমাদের দিদিরা যে রান্না করেন, বাচ্চা দিব্যি খেয়ে নেয়।'