
সেই শুক্রবার থেকে SIR-এর প্রতিবাদে ধর্না চালিয়ে যাচ্ছেন তৃণমূল নেত্রী মমতা বন্দ্যোপাধ্যায়। একটানা অবস্থান মঞ্চেই বসে রয়েছেন তিনি। সঙ্গে রয়েছেন দলের বিধায়ক, সাংসদ, নেতা ও কর্মীরা। SIR ইস্যুতে যে ধর্না অবস্থান করছিলেন, মঙ্গলবার সন্ধেবেলা তা তুলে নিলেন মমতা বন্দ্যোপাধ্যায়। এদিন বিকেলে ধর্নামঞ্চে এসে ফের একবার তাঁকে ধর্না-অবস্থান তুলে নেওয়ার অনুরোধ করেন অভিষেক বন্দ্যোপাধ্যায়। সেই অনুরোধ মেনেই কার্যত ধর্না তুলে নিলেন মমতা বন্দ্যোপাধ্যায়। ধর্নামঞ্চে মমতা বলেন, যে হেতু অনেকটা বিচার পাওয়া গিয়েছে, আমরা পাঁচদিন রাস্তায় আছি। অভিষেক সবার মতামত নিয়েছেন। অভিষেকের প্রস্তাবে আমরা আজকে ধর্না তুলে নিচ্ছি।
মমতা কী বললেন?
এদিন প্রথমে বক্তব্য রাখতে গিয়ে অভিষেক বন্দ্যোপাধ্যায় বলেন, 'ইচ্ছাকৃত ভাবে নির্বাচন পিছোনোর জন্য চেষ্টা করছে জ্ঞানেশ কুমারের নেতৃত্বে নির্বাচন কমিশন। ১৫ দিনের কাজকে তিন-চার লাগাতে চাইছে। সুপ্রিম কোর্ট শুধু আবেদন করার জায়গা নেই। সুপ্রিম কোর্ট এটাও বলেছে, আমরা বাংলার কেসকে স্পেশাল কেস হিসাবে বিবেচনা করব। নির্বাচনের এক দিন আগে পর্যন্ত ভোটার তালিকায় ভোটারের নাম তোলার জন্য সুপ্রিম কোর্ট আছে।' এরপরেই অভিষেক বন্দ্যোপাধ্যায় প্রথমে আর্জি জানান, 'দিদি আজ আপনার দাবিকে সুপ্রিম কোর্ট মান্যতা দিয়েছে। এটাই আপনার লড়াই এর জয়। আপনার শরীর সুস্থ রাখতে হবে। সবার কাছে পৌঁছতে হবে। দলনেত্রীকে অনুরোধ করব, আমি সবার হয়ে দিদিকে অনুরোধ করব, পাঁচ দিন রাস্তায় বসে রয়েছে। জ্ঞানেশ কুমার ল্যাজ গুটিয়ে পালিয়েছেন। তাই আপনি আজ এই কর্মসূচি সমাপ্ত করুন। ৮০ হাজার বুথে ওদেরকে নিঃস্ব করতে হবে।' এরপরেই বক্তব্য রাখতে গিয়ে মমতা বন্দ্যোপাধ্যায় বলেন, 'নির্বাচন ঘোষণা হওয়ার পরেও সুপ্রিম কোর্টের হাতে মামলা থাকবে। আমার পিটিশনটি এখনও আছে। এখন নির্বাচন ঘোষণা করে দিলেও ভাববেন না যে আপনার সুযোগ নেই। ওরা বলেছেন, ভোটের আগের দিন পর্যন্ত যদি কারও নাম বাদ গিয়ে থাকে, আমাদের কাছে আসবেন। আমরা স্পেশাল কেস হিসাবে এটি দেখব।' মমতা আরও বলেন, '২৫ তারিখ মামলার পরবর্তী শুনানি রয়েছে। কিন্তু ১৫-১৬ তারিখ ভোট ঘোষণা হয়ে গেলেও এটা খেলা শেষ হবে না। খেলাটা সুপ্রিম কোর্টের হাতে রয়ে গেল। আমরা এখন দেখব। আমাদের পিটিশন অনুযায়ী নির্দেশগুলি হয়েছে। পর্যবেক্ষণগুলিও আমরা জেনেছি।'
অতীত মনে করালেন মমতা
টানা পাঁচ দিনের ধর্না তুলে নেওয়ার আগে এদিন ফের একবার নির্বাচন কমিশন ও কেন্দ্রের বিজেপি সরকারকে আক্রমণ শানান মমতা বন্দ্যোপাধ্যায়। ভোটার তালিকায় নাম বাদের বিতর্ক যে শুধু রাজপথের আন্দোলনে সীমাবদ্ধ থাকবে না, বরং তা আইনি লড়াইয়ের মাধ্যমে শেষ পর্যন্ত নিয়ে যাওয়া হবে, এদিন সেই বার্তাই স্পষ্ট করে দিয়েছেন মুখ্যমন্ত্রী। তাঁর সাফ কথা, '১৫-১৬ তারিখ ভোট ঘোষণা হয়ে গেলেও খেলা শেষ হবে না। খেলাটা সুপ্রিম কোর্টের হাতে রয়ে গেল।' ভোটারদের আশ্বস্ত করে মমতা এদিন বলেন, নির্বাচন ঘোষণা হয়ে গেলেও ভয়ের কিছু নেই। যাঁদের নাম অন্যায়ভাবে বাদ গিয়েছে, তাঁদের পাশে দল ও আদালত— দুই-ই আছে। তাঁর কথায়,'এখন নির্বাচন ঘোষণা করে দিলেও ভাববেন না যে আপনার সুযোগ নেই। ওরা (আদালত) বলেছে, ভোটের আগের দিন পর্যন্ত যদি কারও নাম বাদ গিয়ে থাকে, আমাদের কাছে আসবেন। আমরা ‘স্পেশ্যাল কেস’ হিসেবে এটি দেখব।' এরপরই গ্যাসের দাম বৃদ্ধি থেকে শুরু করে একাধিক ইস্যুতে কেন্দ্র ও কমিশনকে আক্রমণ করেন তিনি। বলেন, 'ইচ্ছাকৃত ভাবে নির্বাচন পিছোনোর জন্য চেষ্টা করছে নির্বাচন কমিশন।' এরপরই সাময়িকভাবে ধর্না প্রত্যাহারের সিদ্ধান্ত ঘোষণা করেন মমতা। তিনি বলেন, 'এবার আমরা বিচারের অপেক্ষায়। মানুষ অধিকার পাবেন। যে দরজাটা বন্ধ হয়ে গিয়েছিল, সেটা খুলছে। এবার দেখা যাক কী হয়।' সেইসঙ্গে অতীতে সিঙ্গুর আন্দোলনের সময় ধর্নার কথাও মনে করিয়ে দেন মমতা বন্দ্যোপাধ্যায়।
সিঙ্গুরের কথা মমতার কন্ঠে
মমতা বন্দ্যোপাধ্যায় বলেন, 'অনেকটা বিচার পাওয়া গিয়েছে। যার জন্য আমরা পাঁচ দিন রাস্তায় বসে আছি। অভিষেক সভার সকলের মতামত নিয়েছে। বিচারের দরজা যখন উন্মুক্ত হয়েছে। পাঁচ দিন তো আমরা রাস্তায় আছি। আমি দরকার হলে ৫০ দিনও থাকতে পারি। অভিষেকের যে প্রস্তাব, আমরা কি ধর্নাটি আজকের মতো তুলে নিতে পারি?' মুখ্যমন্ত্রীর প্রশ্নের পর সকলে সমস্বরে ‘হ্যাঁ’ বলেন। এর পরে ধর্নাস্থলের আশপাশের দোকানদার, বিক্রেতা, হোটেল এবং অন্য বাণিজ্যিক সংস্থাগুলির উদ্দেশে মমতা বলেন, 'আপনাদের আমরা এই ক’দিন ব্যস্ত হয়েছি। হয়ত কখনও কখনও আপনাদের কান ঝালাপালা হয়েছে। আমারও সারা রাত কান ঝালাপালা হয়েছে। বিভিন্ন শব্দে, বিভিন্ন আওয়াজে। ওটা আমার কাছে ম্যাটার নয়। আমি সিঙ্গুরের ব্যাপারে পণ করে এখানে ২৬ দিন অনশনও করে গিয়েছিলাম। দেখুন কী ভাবে ইতিহাস মিলিয়ে দিয়েছে। সিঙ্গুরের সময়ে যে লোকটা জোর করে চাষিদের জমি অধিগ্রহণ করেছিলেন, সেই লোকটাকেই আজ নির্বাচন কমিশন এখানে ডেপুটি ইলেকশন কমিশন না কী যেন একটা পোস্ট দিয়ে পাঠিয়েছে।' মমতা আরও বলেন, 'সিঙ্গুর-নন্দীগ্রাম আন্দোলনে তৃণমূলের জয়যাত্রা এখানের মঞ্চ থেকেই শুরু হয়েছিল। আগামী দিনেও জেনে রাখবেন, ইতিহাসের কিন্তু পুনরাবৃত্তি হয়। আমরা দেখলাম, মা কালীও আমাদের সঙ্গ দিলেন। মায়ের আশীর্বাদ থেকে বঞ্চিত হলেন কেউ কেউ। বুঝতে পারছেন, মা-ও কিন্তু ভালবাসেন মানবিকতা, মনুষ্যত্ব এবং সকলকে নিয়ে একসঙ্গে বাস করা।' মমতা বন্দ্যোপাধ্যায় মঞ্চ থেকেই জানান, এরপর প্রাক্তন রাজ্যপাল সিভি আনন্দ বোসের সঙ্গে দেখা করতে যাবেন তিনি। সবশেষে আমজনতাকে নিশ্চিতে থাকার কথাই বললেন মমতা বন্দ্যোপাধ্যায়।