
সুরাজউদ্দিন মণ্ডল: করোনা মহামারীর কারণে দীর্ঘ চার বছর স্থগিত ছিল জওহরলাল নেহরু বিশ্ববিদ্যালয়ের ছাত্র সংসদ নির্বাচন। অবশেষে গত ২২ মার্চ অনুষ্ঠিত হয় সেই নির্বাচন। বাম, কংগ্রেস ও এবিভিপি সহ বিভিন্ন রাজনৈতিক দলের ছাত্র সংগঠনগুলি অংশ নিয়েছিল এবারের ভোটে। সভাপতি, সহ-সভাপতি, সাধারণ সম্পাদক এবং যুগ্ম সাধারণ সম্পাদক এই চারটি পদের জন্য ভোটদান করেন পড়ুয়ারা।
এরই মধ্যে সোশ্যাল মিডিয়ায় ভাইরাল হচ্ছে জওহরলাল নেহরু বিশ্ববিদ্যালয়ের ছাত্র সংসদ নির্বাচনকে কেন্দ্র করে একটি বিশেষ ধরনের পোস্ট। যেখানে দাবি করা হচ্ছে, স্বাধীনতার পর এই প্রথম জেএনইউকে গেরুয়া করে ইতিহাস গড়েছে এবিভিপি। সরাসরি উল্লেখ না করা হলেও, পোস্টগুলিতে এমনটাই ইঙ্গিত করা হয়েছে যে, এবছর অনুষ্ঠিত জওহরলাল নেহরু বিশ্ববিদ্যালয়ের ছাত্র সংসদ নির্বাচনে জয়ী হয়েছে এবিভিপি।
উদাহরণস্বরূপ, জেএনইউ-এর ছাত্র সংসদ নির্বাচনের ফল নিয়ে এক ফেসবুক ব্যবহারকারী নিজের ওয়ালে লিখেছেন, ইতিহাস গড়ল ABVP। স্বাধীনতার পর প্রথমবার JNU হলো গেরুয়া।
অপর এক ফেসবুক ব্যবহারকারী লিখেছেন, “ইতিহাস গড়ল ABVP। স্বাধীনতার পর প্রথমবার JNU হলো গেরুয়া। জয় রাষ্ট্রবাদ।”
অপর আর এক ফেসবুক ব্যবহারকারী লিখেছেন, ইতিহাস গড়ল ABVP। স্বাধীনতার পর প্রথমবার বামপন্থীদের গড় JNU হলো গেরুয়াময়। এমনই একটি পোস্টের আর্কাইভ এখানে দেখা যাবে।
ইন্ডিয়া টুডে ফ্যাক্ট চেক অনুসন্ধান করে দেখেছে যে দাবিটি ভুয়ো। এবারের জওহরলাল নেহরু বিশ্ববিদ্যালয়ের ছাত্র সংসদ নির্বাচনে ৪টি আসনেই এবিভিপি-কে পরাজিত করে জয়ী হয়েছে বাম ছাত্রজোট।
কীভাবে জানা গেল সত্য?
জওহরলাল নেহরু বিশ্ববিদ্যালয়ের ছাত্র সংসদ নির্বাচন সংক্রান্ত তথ্য জানতে ইন্ডিয়া টুডের তরফে কিওয়ার্ড সার্চ করা হয়। সেই সার্চে আমরা এমন কোনও নির্ভরযোগ্য তথ্য বা প্রতিবেদন খুঁজে পাইনি যা থেকে প্রমাণ হয় জেএনইউ-এর ছাত্র সাংসদ নির্বাচনে জয়ী হয়েছে এবিভিপি।
তবে আমাদের কিওয়ার্ড সার্চে বাংলা, ইংরাজি ও হিন্দি ভাষায় একাধিক সংবাদমাধ্যমের এমন প্রতিবেদন খুঁজে পাই যেখানে উল্লেখ করা হয়েছে যে এবারের নির্বাচনে ৪টি আসনই দখল করেছে বামেদের ছাত্রজোট। অর্থাৎ সেই তথ্য অনুযায়ী ২০২৪ সালের ২২ মার্চ জওহরলাল নেহরু বিশ্ববিদ্যালয়ের ছাত্র সংসদ নির্বাচনে সভাপতি, সহ-সভাপতি, সাধারণ সম্পাদক এবং যুগ্ম সাধারণ সম্পাদক সবকটি আসনেই জয়ী হয়েছে বামেরা। এবং প্রতিটি আসনে দ্বিতীয় স্থান লাভ করেছে এবিভিপি।
আমরা এই একই তথ্য গত ২৪ মার্চ ‘এএনআই’-এর অফিশিয়াল ‘এক্স’ হ্যান্ডেলেও দেখতে পাই। সেখানে দেখা যাচ্ছে সাংবাদিক সম্মেলন করে ছাত্র সংসদ নির্বাচনের ফল ঘোষণা করছেন জওহরলাল নেহরু বিশ্ববিদ্যালয়ের নির্বাচন কমিটির চেয়ারম্যান শৈলেন্দ্র কুমার। তাঁর দেওয়া তথ্য অনুযায়ী, ২৫৯৮ ভোট পেয়ে সভাপতি পদে ৯২২ ভোটে জয়লাভ করেছেন বাম প্রার্থী ধনঞ্জয়। তাঁর বিরুদ্ধে দাঁড়িয়ে এবিভিপি-র উমেশ চন্দ্র আজমীরা পেয়েছেন ১৬৭৬টি ভোট।
৯২৭ ভোটে সহ-সভাপতি পদে জয়ী হয়েছেন বাংলার ছেলে অভিজিৎ ঘোষ। তিনি পেয়েছেন ২৪০৯ ভোট। তাঁর বিরুদ্ধে দাঁড়িয়ে এবিভিপি-র দীপিকা শর্মা পেয়েছেন ১৪৮২ ভোট।
অন্যদিকে ৯২৬ ভোটে সাধারণ সম্পাদক পদে জয়ী হয়েছেন প্রিয়াংশী আর্য। তিনি পেয়েছেন ২৮৮৭ ভোট এবং তাঁর বিরুদ্ধে ১৯৬১ ভোট পেয়ে দ্বিতীয় হয়েছেন এবিভিপির অর্জুন আনন্দ।
এবং যুগ্ম সম্পাদক পদে ৫০৮ ভোটে জয়লাভ করেছেন মহম্মদ সাজিদ। তিনি পেয়েছেন ২৫৭৪ ভোট। তাঁর বিরুদ্ধে এবিভিপির গোবিন্দ ডাঙ্গি পেয়েছেন ২০৬৬ ভোট।
এর থেকেই প্রমাণ হয় যে জওহরলাল নেহরু বিশ্ববিদ্যালয়ের ছাত্র সংসদ নির্বাচনে কোনও গেরুয়া ঝড় হয়নি। বরং চারটি আসনেই জয়লাভ করে বাম ছাত্র সংগঠনগুলি জেএনইউ-তে এবারও লাল ঝড় অব্যাহত রাখতে সক্ষম হয়েছে। একটা বিষয় উল্লেখ্য গণনার শুরুর দিকে প্রতিটি আসনেই এগিয়ে থাকলেও শেষ পর্যন্ত সেই ট্রেন্ড ধরে রাখতে পারেনি এবিভিপি। তবে গণনা শেষে তারা সব আসনে দ্বিতীয় স্থানে উঠে এসেছে।
স্বাধীনতার পর এই প্রথম জওহরলাল নেহরু বিশ্ববিদ্যালয়কে গেরুয়া করে ইতিহাস তৈরি করেছে এবিভিপি।
জওহরলাল নেহরু বিশ্ববিদ্যালয়ের ছাত্র সংসদ নির্বাচনে কোনও আসন পাইনি এবিভিপি। চারটি আসনেই জয়লাভ করেছে বাম ছাত্রজোট।