
রাজ্যে বেজে গিয়েছে ২০২৬ সালের বিধানসভা নির্বাচনের দামামা। এই আবহে সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে বেশ ভাইরাল হয়েছে তিনটি ছবির সমন্বয়ে তৈরি একটি কোলাজ। যেখানে প্রথম ছবিটিতে নিজের ক্ষতবিক্ষত জিভ বার করে রয়েছেন এক যুবক। পাশাপাশি, দ্বিতীয় ছবিতে মুখে কালো রঙের মাস্ক পরিহিত এক ছাত্রীকে দেখা যাচ্ছে। অন্যদিকে, তৃতীয় ছবিতে এক ছাত্রীকে জড়িয়ে ধরে রয়েছে এক যুবক। এই তিনটি ছবির সমন্বয়ে তৈরি একটি কোলাজটি শেয়ার করে দাবি করা হচ্ছে, স্কুল থেকে বাড়ি ফেরার সময় এক হিন্দু ছাত্রীকে জোর করে চুমু খাওয়ায় এক মুসলিম যুবকের জিভ কেটে নিয়েছে মেয়েটির দাদা।
উদাহরণস্বরূপ, ভাইরাল ছবিটি শেয়ার করে এক ফেসবুক ব্যবহারকারী লিখেছেন, “স্কুল থেকে বাড়ি ফিরছিল এক হিন্দু ছাত্রী… পথে এক মুসলিম যুবক জোর করে তাকে ধরে চুমু খায়! 😡 ভয় আর লজ্জায় কাঁপতে কাঁপতে ছাত্রী ঘটনাটা জানায় তার ভাইকে… এরপর যা ঘটলো, তা আরও ভয়ংকর— ভাই গিয়ে অভিযুক্তকে ধরে তার জিভ কেটে দেয়! 2026 এর ভোট এ পশ্চিমবাংলায় bjp না জিতলে বাংলার মা বোনদের সঙ্গেও এই একই ঘটনা ঘটবে। কারণ পিসি বাংলাকে পশ্চিম বাংলাদেশ বানাবে। তাই সবাই বিজেপি আর মোদি জি কে ভোট দিন।”
আজতক ফ্যাক্ট চেক অনুসন্ধান করে দেখেছে যে, ভাইরাল ছবির যুবক মুসলিম নয় বরং হিন্দু এবং তিনি উত্তর প্রদেশের গাজীয়াবাদের বাসিন্দা বিপুল কুমার। ২০২৬ সালের ১৯ জানুয়ারি পারিবারিক বিবাদের সময় বিপুলের নিজের স্ত্রী তার জিভ কামড়ে ছিঁড়ে ফেলেন। অন্যদিকে, কোলাজে ব্যবহৃত অন্য ছবি দুটি ভিন্ন সোশ্যাল মিডিয়া রিলের স্ক্রিনশট থেকে নেওয়া হয়েছে।
সত্য উন্মোচন
সম্প্রতি কোনও মুসলিম যুবকের তরফে হিন্দু স্কুল ছাত্রীকে জোর করে চুমা খাওয়া হলে এবং পরবর্তীতে নির্যাতার ভাই বা দাদার তরফে অভিযুক্তের জিভ কেটে নেওয়া হলে সেই সংক্রান্ত খবর অবশ্যই প্রথম শ্রেণির সংবাদমাধ্যমে প্রকাশিত হবে। কিন্তু আমরা আমাদের অনুসন্ধানে এমন কোনও নির্ভরযোগ্য তথ্য বা প্রতিবেদন খুঁজে পাইনি যা থেকে এর সত্যতা প্রমাণ হয়। এর থেকে সন্দেহ তৈরি হয় ভাইরাল কোলাজে ব্যবহৃত ছবি তিনটি অন্য কোনও ঘটনার হতেও পারে।
তাই এরপর ভাইরাল দাবি ও ছবিগুলির সত্যতা জানতে প্রথমে কোলাজে ব্যবহৃত যুবকের ছবিটি নিয়ে সেগুলি গুগুল লেন্সে অনুসন্ধান চালানো হয়। তখন এই একই ছবি-সহ ২০২৬ সালের ২১ জানুয়ারি Dainik Bhaskar ও Amar Ujala-সহ একাধিক সংবাদমাধ্যমে এই সংক্রান্ত বিস্তারিত প্রতিবেদন পাওয়া যায়। সেই সব প্রতিবেদন থেকে জানা যায়, ছবির যুবকের নাম বিপুল কুমার এবং সে উত্তর প্রদেশের গাজীয়াবাদ জেলার মোদিনগর শহরের সঞ্জয়পুর কলোনির বাসিন্দা। ২০২৬ সালের ১৯ জানুয়ারি পারিবারিক বিবাদের সময় বিপুলের স্ত্রী ঈশা ক্ষিপ্ত হয়ে বিপুলের জিভ কামড়ে ছিঁড়ে ফেলেন। এই ঘটনায় অভিযুক্ত স্ত্রী ঈশাকে গ্রেফতার করে পুলিশ। অন্যদিকে বিপুলকে চিকিৎসার জন্য স্থানীয় হাসপাতালে পাঠানো হয়।
পাশাপাশি, এরপর ভাইরাল কোলাজে ব্যবহৃত অন্য ছবি দুটি নিয়ে অনুসন্ধান চালালে ২০২১ সালের ২৭ এপ্রিল একটি ফেসবুক প্রোফাইলে একটি রিল পাওয়া যায়। সেই ভিডিও-র সঙ্গে মুখে মাস্ক পরিহিত ছাত্রীর ছবির হুবহু মিল পাওয়া যায়। যা থেকে স্পষ্ট হয়ে যায়, এই ভিডিও থেকে স্ক্রিনশট নিয়ে তার ছবিটি কোলাজে ব্যবহার করা হয়েছে। সেই রিলে কোনও চুমু খাওয়ার দৃশ্য নেই। পাশাপাশি, প্রোফাইলটিতে ওই একই ছাত্রীর এই ধরণের আরও একাধাকি রিলও পাওয়া যায়। অন্যদিকে, কোলাজের তৃতীয় ছবি অর্থাৎ এক যুবকের তরফে এক ছাত্রীকে জড়িয়ে ধরে রাখার ছবিটি নিয়ে অনুসন্ধান চালালে একাধিক সোশ্যাল মিডিয়া হ্যান্ডেলে এই সংক্রান্ত অন্য একটি রিল পাওয়া যায়। রিলটি ভালো করে পর্যবেক্ষণ করলে স্পষ্ট হয়ে যায় তৃতীয় ছবিটি ওই রিলের একটি স্ক্রিনশট। (তবে রিলটি আপত্তিকর হওয়ার জন্য আমরা সেটির লিঙ্ক এই প্রতিবেদনে ব্যবহার করলাম না)।
এর থেকে প্রমাণ হয় যে, মিথ্যে সাম্প্রদায়িকতার রং লাগিয়ে এবং পশ্চিমবঙ্গের বিধানসভা নির্বাচনের সঙ্গে সম্পর্ক জুড়ে শেয়ার করা হচ্ছে উত্তর প্রদেশের স্বামী-স্ত্রীর বিবাদের ছবি।
ছবিতে দেখা যাচ্ছে, স্কুল থেকে বাড়ি ফেরার সময় এক হিন্দু ছাত্রীকে জোর করে চুমু খাওয়ায় এক মুসলিম যুবকের জিভ কেটে নিয়েছে মেয়েটির দাদা।
ভাইরাল ছবির যুবক মুসলিম নয় বরং হিন্দু এবং তিনি উত্তর প্রদেশের গাজীয়াবাদের বাসিন্দা বিপুল কুমার। ২০২৬ সালের ১৯ জানুয়ারি পারিবারিক বিবাদের সময় বিপুলের স্ত্রী তার জিভ কামড়ে ছিঁড়ে ফেলেন।